হিশামুদিন সাহেব চুপ করলেন। হাসান মনে মনে কয়েকবার আওড়াল আজহারউদ্দিন। নামটা যেন মনে থাকে। হিশামুদ্দিন সাহেবের স্বভাব হলো কোনো নাম তিনি বারবার বলেন না। এক-দুবার বলেন। আজহারউদ্দিন নামটা তিনি আরো বলবেন। বলে মনে হয় না।
হাসান।
জ্বি স্যার।
গল্প বলার সময় তোমার মনে যদি কোনো প্রশ্ন আসে–তুমি যদি কিছু জানতে চাও জিজ্ঞেস করো। চুপ করে থেকে না। প্রশ্ন করলে আমার মনে হবে তুমি আগ্রহ করে শুনছ।
স্যার আমি খুব আগ্রহ করেই শুনছি।
কেন?
হাসান জবাব দিতে পারল না। হিশামুদিন বললেন, আমি যে সব গল্প বলছি তা খুবই সাধারণ গল্প। কিন্তু তুমি আগ্রহ করে শুনছ কারণ যিনি গল্প বলছেন তিনি অসম্ভব বিত্তবান একজন মানুষ। তিনি যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। পরাজিত মানুষের গল্প আমাদের শুনতে ভালো লাগে না। বিজয়ী মানুষের গল্প আমরা আগ্রহ নিয়ে শুনি। চেঙ্গিস খাঁর গল্প আমরা পড়ি কারণ তিনি জয়ী। যে সব রাজাদের তিনি পরাজিত করেছেন–যারা ধ্বংস হয়ে গেছে–তাদের গল্প আমরা পড়ি না। ঠিক বলছি হাসান?
জ্বি স্যার।
বাবার গল্পে চলে যাই। বাবা জেল থেকে ফেরার পর আমরা খুব কষ্টে পড়লাম। আসল কষ্ট–ভাতের কষ্ট। তিনি যে কদিন জেলে ছিলেন সেই কদিন ভাতের কষ্ট আমাদের ছিল না। দুবেলা ভাত খেতে পেরেছি। আমাদের বড় বোন পুষ্প ব্যবস্থা করেছেন। কী করে করেছেন আমরা জানি না-কিন্তু করেছেন। বাবা ফেরার পর দায়িত্ব তার হাতে চলে গেলে তিনি অকূল সমুদ্রে পড়লেন। জেলখাটা দাগি লোক কাজেই কোথাও চাকরি জোটাতে পারছেন না। সারাদিন চাকরির সন্ধানে ঘোরেন।
রাত আটটার-নাটার দিকে বাসায় ফেরেন। খাবার নিয়ে ফেরেন। আমরা রাতে একবেলা খাই–তবে পেট ভরে খাই। বাবা খাবার আনতেন হোটেল থেকে। তুমি জান কি না জানি না ভালো চালু হোটেলে উৎকৃষ্ট খাবার প্রচুর জমে যায়। হোটেল মালিকরা সেইসব খাবার ফেলে না। একত্রে জমা করে রাখে। গরিব-দুঃখীদেরকে দিয়ে দেয়। বাবা একটা হোটেলের সঙ্গে ব্যবস্থা করেছিলেন। রাত আটটার দিকে প্যাকেটিভর্তি খাবার নিয়ে আসতেন। সবকিছু একসঙ্গে মেশানো বলে অদ্ভুত স্বাদ। মাছ, গোশত, ভাজি, বিরিয়ানি, খিচুড়ি–সবকিছুর অদ্ভুত মিশ্রণ!
স্যার খেতে কেমন?
প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে যা খাওয়া যায়। তাই অমৃতের মতো লাগে– তবে ওই খাবারটা ভালো ছিল। আমরা সবাই খুব আগ্রহ করে খেতাম। শুধু আমার মেঝো বোন খেতেন না। আমার মেঝো বোন ছিলেন বিদ্রোহী টাইপের। তিনি বিদ্রোহ করে ফেলেন, কঠিন গলায় বললেন, মানুষের এঁটো খাবার আমি খাব না। মরে গেলেও না। বাবা তাকে নানা যুক্তি দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করলেন–‘সবকিছু এঁটো হয়। কিন্তু খাবার কখনো এঁটো হয় না।’ মেঝো বোন বাবার যুক্তির ধার দিয়েও গেলেন না। তিনি চোখমুখ শক্ত করে বললেন, আমি ঐটা খাবার খাই না। তার জন্যে চিড়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। সে শুকনো চিড়া চিবিয়ে পানি খেত।
আমার মেঝো বোন খুব রূপবতী ছিলেন। আমরা সবাই দেখতে মোটামুটি ভালো ছিলাম-মেঝো বোন ছিলেন সেই ভালোর মধ্যেও ভালো। খুব হাসিখুশি ছিলেন। অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে আশপাশের মানুষদের চমকে দিতে ভালোবাসতেন। যেমন তাঁর একটা কথা ছিল–একটা পোকা আছে আমার খুব প্রিয়। আমি সেই পোকা কী যে পছন্দ করি! পোকাটার নাম চিংড়ি মাছ।
আপনার সেই বোনের নাম কী স্যার?
হিশামুদ্দিন ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন—তার নাম আমি তোমাকে বলব না। ওই নামটা অজানাই থাকুক। হাসান আজ আর কথা বলব না। কেমন যেন মাধা ধরে গেছে। আগামী সপ্তাহে আবার দেখা হবে।
জ্বি আচ্ছা স্যার।
তোমাকে টাকা-পয়সা ঠিকমতো দিচ্ছে তো?
জ্বি সার।
আচ্ছা ঠিক আছে।
হাসান তার কথা বলতে পারল না। হিশামুদ্দিন সাহেব যেখানে তাঁর গল্প থামিয়েছেন সেখানে হুট করে চাকরি চাওয়া যায় না।
হিশামুদ্দিন উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কেমন জানি অস্বস্তি লাগছে। বুকে চাপ ব্যথা বোধ হচ্ছে। লক্ষণগুলো পরিচিত। আবার ঠিক পরিচিতও নয়। শরীর খারাপের একটা লক্ষণের সঙ্গে অন্যটায় তেমন মিল থাকে না।
হিশামুদ্দিন নিজের শোবার ঘরে ঢুকলেন। বিছানায় কি খানিকক্ষণ শুয়ে থাকবেন? তার প্রয়োজন আছে বলে মনে হচ্ছে না। বুকের ব্যাখােটা কমে গেছে। তবে মাথার যন্ত্রণাটা বাড়ছে। মনে হয় চোখ সম্পর্কিত কোনো সমস্যা। কাল অনেক রাত জেগে কাগজপত্র দেখেছেন–চোখের ওপর চাপ পড়েছে। চশমাটা বদলানো দরকার, বদলানো হচ্ছে না। তাঁর পানির পিপাসা হচ্ছে। পানি দেবার জন্যে কাউকে বলতে হয়–এই পরিশ্রমটুকু করতে ইচ্ছা করছে না। খাটের পাশে কলিংবেলের সুইচ আছে, সুইচে হাত পড়লেই কেউ একজন ছুটে আসবে। তিনি বসেছেন সোফায়–কলিংবেলটা মনে হচ্ছে অনেক দূরে।
চিত্ৰলেখার সঙ্গে কথা বললে কেমন হয়? মেরিল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান যেন কত? এই তথ্য তার জানা, তারপরেও চিত্ৰলেখার সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিবার নতুন করে জানতে হয়। দিনের শুরুতেই তিনি জানেন আজ কত তারিখ। তারপরেও প্রতিটি সিগনেচারের সময় তাঁকে জিজ্ঞেস করতে হয়–আজ কত তারিখ।
বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সময়ের ব্যবধান কত? আট ঘণ্টা? রাত দুটোর সময়ে মেয়েকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার কোনো অর্থ হয় না। হিশামুদ্দিন সোফা থেকে উঠে খাটের দিকে গেলেন। খাটে হেলান দিয়ে সুইচ টিপলেন। মোতালেব উদ্বিগ্নমুখে ছুটে এলো। ঘরে ঢুকল না। দরজার পরদা সরিয়ে উঁকি দিল। হিশামুদিন সাহেব ঠিক বুঝতে পারলেন না, কী জন্যে মোতালেবকে ডেকেছেন। পানি দেবার জন্যে, নাকি কটা বাজে জানার জন্যে। তাঁর শোবার ঘরে কোনো ঘড়ি নেই। ঘড়ির শব্দে তাঁর অস্বস্তি বোধ হয়। সময় জানার জন্যে তাকে কাউকে না কাউকে জিজ্ঞেস করতে হয়।
