ফেরার পথে হাসান ঠিক করে ফেলল। পরের বার যখন হিশামুদিন সাহেবের সঙ্গে দেখা হবে তখন সে অবশ্যই একটা চাকরির কথা তাকে বলবে। তাকে বলতেই হবে। এইভাবে থাকা আর যায় না।
একটা মোটামুটি ভদ্র চাকরি হলে সে তিতলীর মাকে বলতে পারে–খালা আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।
না, তার পক্ষে এটা সরাসরি বলা অসম্ভব। সে ভাবিকে দিয়ে বলবে। হিশামুদ্দিন সাহেব যেদিন তাকে চাকরি দেবেন। সেদিনই সে ভাবিকে পাঠাবে। অবশ্যই, অবশ্যই, অবশ্যই, অবশ্যই।
হাসান কেমন আছ?
জ্বি স্যার ভালো।
চোখ লাল কেন?
হাসান জবাব দিতে পারল না। তার যে চোখ লাল এই ব্যাপারটা সে জানে না। ঘর থেকে বেরোবার সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়েছে। তখন চোখের দিকে তাকায় নি। আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাস তার নেই।
হিশামুদিন সাহেব বললেন, রাতে ঘুম হয় নি?
জ্বি স্যার হয়েছে।
তোমার কি অনিদ্রা রোগ আছে?
জ্বি না।
তুমি তাহলে মানুষ হিসেবে খুব আধুনিক নও। অনিদ্রা হচ্ছে আধুনিক মানুষের রোগ।
হাসান চুপ করে রইল। হিশামুদিন সাহেবের সঙ্গে সমান তালে গল্প করার মতো অবস্থা তার না। হিশামুদিন সাহেব প্রশ্ন করলে সে জবাব দেবে। যতদূর সম্ভব কম কথায় জবাব দেবে। তবে আজ সে তার চাকরির কথাটা বলবে। যে ভাবেই হোক বলবে।
বিয়ে কর নি তো?
জ্বি না।
বিয়ের কথা ভাবছ না?
হাসান জবাব দিল না। একবার ভাবল এখনই সময়। এখনি বলা দরকার, স্যার চাকরি বাকরি নেই, বিয়ে করলে স্ত্রীকে খাওয়াব কী? এই কথায় দ্রবীভূত হয়ে হিশামুদ্দিন সাহেব তাঁর বিশাল কোম্পানিতে কোনো একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। তবে বাস্তব আশার পথ ধরে চলে না–বাস্তব চলে নিরাশার এবড়ো খেবড়ো পথে। তার কথায় হিশামুদ্দিন সাহেব দ্রবীভূত হবেন এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এ জাতীয় মানুষকে অন্যরা দ্রবীভূত করতে পারে না। তবে চাকরির কথাটা আজ বলতেই হবে। এখন না হলেও কিছুক্ষণ পরে বলবে।
হাসান।
জ্বি স্যার।
তোমার কি পছন্দের কেউ আছে যাকে বিয়ে করতে চাও।
হাসান লজ্জিত গলায় বলল, আছে স্যার।
তার নাম কী?
তিতলী।
হাসান খুবই অবাক হচ্ছে। হিশামুদ্দিন সাহেব এ জাতীয় হালকা প্রশ্ন কেন করছেন সে বুঝতে পারছে না। তার পছন্দের কেউ আছে কি না তা দিয়ে হিশামুদ্দিন সাহেবের কিছু যায় আসে না।
তিতলী নামের অর্থ কী?
প্ৰজাপ্রতি।
প্ৰজাপতি তো সুন্দর নাম।
হিশামুদিন সাহেব দেয়ালে ঠেস দিয়ে চোখ বন্ধ করে বললেন–এস শুরু করি।
হাসান অপেক্ষা করছে, হিশামুদিন সাহেব কিছুই বলছেন না। মানুষটা কি ঘুমিয়ে পড়ছে? ভাবভঙ্গি ঘুমিয়ে পড়ার মতোই। এস শুরু করি বলে দেয়ালে ঠেস দিয়ে কেউ ঘুমিয়ে পড়ে না। হিশামুদিন সাহেবের মতো মানুষ তো বটেই। হাসান বুঝতে পারছে না। খুক খুক করে কেশে সে দৃষ্টি আকর্ষণ করবে কি না। সেটা ঠিক হবে না। অনেক ওপরের লেভেলের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কাশি কোনো পদ্ধতি হতে পারে না। হাত উঠানো যায়। হাত উঠালে। লাভ হবে না, হিশামুদিন সাহেব চোখ বন্ধ করে আছেন–কিছু দেখবেন না।
হাসান।
জ্বি স্যার।
কী বলবি গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করছিলাম। তুমি যদি জীবনের গল্প শুরু কর তখন দেখবে গোছানো খুব কঠিন। সিস্টেমেটিকালি সব মনেও আসে না। তুচ্ছ ঘটনা আগে মনে পড়ে। অনেক বড় বড় ঘটনা মনেই পড়ে না। ধারাবাহিকতা থাকে না। ধারাবাহিকভাবে মানুষ তার সমস্ত ঘটনা পানিতে ডুবে মরার সময় দেখতে পায় বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। তাও ঠিক না। আমি পানিতে ডুবে মরতে বসেছিলাম। আমি কিছুই দেখি নি। চোখের সামনে শুধু হলুদ আর লাল আলো দেখেছি। তুমি কি কখনো পানিতে ডুবেছ?
জ্বি না স্যার?
সাঁতার জান?
জ্বি না।
আমার পানিতে ডোবার ঘটনাটা বলব, না বাবার জেল থেকে ফিরে আসার গল্পটা আগে বলব বুঝতে পারছি না।
আপনার বাবার ফিরে আসার গল্পটা বলুন।
বাবার নাম কি তোমাকে বলেছি?
জ্বি না।
উনার নাম আজহারউদ্দিন খাঁ। আমরা খাঁ বংশ। খুবই উচ্চ বংশ। যাই হোক আমাদের উচ্চ বংশীয় বাবা দু মাসের জেল খেটে হাসিমুখে একদিন বাসায় ফিরলেন। তার হাতে চারটা কিদবেল। জেলখানার গাছের কদবেল। জেলার সাহেবকে বলেটলে কীভাবে জানি নিয়ে এসেছেন। মানুষকে মুগ্ধ এবং খুশি করার আর্ট বাবা খুব ভালো জানতেন। যে-কোনো মানুষের সঙ্গে বাবা যদি কিছুক্ষণ কথা বলেন তার ধারণা হবে বাবা অসাধারণ একজন মানুষ। বাবা বাসায় ফিরলেন। নিজের হাতে কন্দবেলের ভর্তা বানালেন। কন্দবেলের ভর্তা কখনো খেয়েছ হাসান?
জ্বি না স্যার।
ঠিকমতো বানাতে পারলে অতি উপাদেয় একটা জিনিস। চিনি দিয়ে টক কমাতে হয়। কাচামরিচ দিয়ে ঝাল ভাব আনতে হয়। লবণও দিতে হয়। চিনি ও লবণের অনুপাতের ওপর স্বাদ নির্ভর করে। বাবা ছিলেন। কদবেল ভর্তার বিশেষজ্ঞ। আমরা বিপুল আনন্দে কদবেলের ভর্তা খেলাম। বাবা হাসিমুখে জেলখানার শিল্প করতে লাগলেন। স্বাক্ষর সব গল্প। গল্প শুনলে যে কেউ বাকি জীবনটা জেলখানায় কাটিয়ে দিতে চাইবে।
বাবা তাঁর জেল জীবনের স্মৃতির উপসংহার টানলেন এই বলে যে, প্রতিটি মানুষের জীবনে জেলের অভিজ্ঞতা দরকার আছে। বাবার গল্প শুনে আমি ঠিক করে ফেললাম জীবনের একটি অংশ যে করেই হোক আমাকে জেলে কাটাতে হবে।
