রিকশাওয়ালা বললেন, কই যাইবেন চাচা মিয়া?
চল রমনা থানায় চল।
রমনা থানার ঝামেলাটা চুকিয়ে আসা ভালো। তিনি রিকশার হুড ফেলে দিলেন। গায়ে রোদ লাওক। রোদে ভাইটামিন সি না ডি কী যেন আছে। বৃদ্ধ বয়সে শরীবে সব রকম ভাইটামিন দরকার–এ, বি, সি, ডি, ই, এফ, জি, এইচ, আই, জে, …। রমনা থানার যার সঙ্গে কথা বলবেন তার নাম হচ্ছে–আব্দুল খালেক। হাসানেব বন্ধুব নাম লিটন। বয়স হলেও স্মৃতিশক্তি এখনো ভালো আছে। মাথায় রোদ লাগছে। তিনি রিকশার হুড তুললেন না। বগলে রাখা খবরের কাগজটা মাথার ওপর ধরলেন। আব্দুল খালেকের সঙ্গে কথা বলে বড় মেয়ের বাসায় যাবেন। আজ দিনটা শুভ, বড় মেয়েও হয়ত নতুন পাঁচশ টাকার একটা নোট পকেট ঢুকিয়ে দেবে। যখন টাকা আসতে থাকে তখন আসতেই থাকে। এটা হলো টাকার ধর্ম।
আব্দুল খালেক হাসিমুখে বললেন, ও আপনি এসেছেন? আপনার রোগী কেমন?
আশরাফুজ্জামান চিন্তিত মুখে বললেন, ভালো না। মনে হয় সময় হয়ে গেছে।
বয়স কত?
বয়স অল্প–৪৫/৪৬ হবে।
চা খাবেন?
জ্বি না, বাসায় গিয়ে ভাত খাব। আমার নিজেব শরীরও ভালো না। আপনি কী জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলেন জিজ্ঞেস করুন।
আপনার ছোট ছেলের নাম রকিব?
জ্বি।
ও কী করে না করে তা কি আপনি জানেন?
পড়াশোনা করে–ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে।
পড়াশোনা ছাড়া আর কী করে জানেন?
জানি না।
আপনার সঙ্গে যোগাযোগ কেমন?
যোগাযোগ নেই। ছেলেমেয়ে কারো সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই। বাপ বুড়ো হলে যা হয়।
সিগারেট খাবেন?
দেন, একটা খাই।
আব্দুল খালেক সিগারেটের প্যাকেট বের করে এগিয়ে দিলেন। লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিলেন। তারপর নিজের চেয়ার আরো কাছে টেনে এনে গলা নিচু করে বললেন–আপনার এই ছেলে ভালো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছে। চকবাজারের একজন রবারের ব্যবসায়ীকে সে এবং তার কয়েক বন্ধু মিলে ধরে নিয়ে গেছে। তিন লাখ টাকা দিলে ছেড়ে দেবে। এই হলো ঘটনা। তারা ওই ভদ্রলোককে প্রথম দিন রেখেছে শহীদুল্লাহ হলে— এখন অন্য কোথায় যেন ট্রান্সফার করেছে। আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।
আশরাফুজ্জামান সাহেব তাকিয়ে রইলেন। কিছু বললেন না। তিনি খুব যে বিক্ষিত হয়েছেন তাকে দেখে তাও মনে হলো না।
ব্যবসায়ী ভদ্রলোককে তারা যদি মেরে টেরে ফেলে তাহলে অবস্থা খারাপ হবে। এই কথাটা আপনার ছেলেকে জানানো দরকার। যদি সে বাসায় আসে, বাসার কারো সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাকে ব্যাপারটা বলবেন।
জ্বি বলব।
আমার যা বলার বলেছি–এখন আপনি চলে যেতে পারেন।
জ্বি আচ্ছা।
আপনাকে থানায় এনে কষ্ট দিয়েছি, কিছু মনে করবেন না।
জ্বি না।
সময় খারাপ–অপরাধ করে ছেলেমেয়ে, আমরা বাবা-মাকে জেরা করি। আমাদেরও খারাপ লাগে।
আশরাফুজ্জামান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মনটা খারাপ হয়েছে। তবে এই মন খারাপ ভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে হচ্ছে না। এই বয়সে ছেলেপুলেদের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানো অর্থহীন। অল্প যে কদিন আছেন নিশ্চিন্তু মনে থাকতে চান। তিনি রাস্তায় নেমে রিকশা নিলেন। বড় মেয়ের বাসায় যাবেন। আজ দুপুরে তেহারি মনে হয় খাওয়া হবে না। বড় মেয়ের বাসায় গেলে না খেয়ে আসা যায় না। খেয়ে আসতে হয়। ইদানীং ঘরের খাওয়া তার মুখে রুচে না–তবু ভাব করতে হয় যেন অমৃত খাচ্ছেন।
তিনি বাসায় ফিরলেন রাত আটটায়। ঘরে ঢুকে একটা মজার দৃশ্য দেখলেন—তার ছোট ছেলে রকিব এসেছে। সে ঘোড়া সেজেছে। টগর এবং পলাশ দুজন তার পিঠে চেপে আছে। তারা হাঁট হাঁট করছে এবং ঘোড়া লাফিয়ে লাফিয়ে বারান্দার এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাচ্ছে–মাঝে মাঝে চিঁহি করে বিকট চিৎকার দিচ্ছে।
বাবাকে দেখে রকিব হাসি মুখে বলল, বাবা কেমন আছ?
ভালো। তুই কখন এসেছিস?
এই তো কিছুক্ষণ আগে।
টগর, আনন্দিত গলায় বলল, দাদুভাই ছোট চাচা আজ আমাদের সবাইকে চাইনিজ খাওয়াবে। তাড়াতাড়ি কাপড় পর।
আশরাফুজ্জামান বললেন, সত্যি নাকি রে?
রবিক বলল, হ্যাঁ সত্যি। তোমার জন্যেই দেরি করছি। কাপড় পরে নাও।
চাইনিজ খাওয়াবি টাকা পেলি কোথায়?
খেলাধুলার জন্যে একটা স্কলারশিপ পেয়েছি।
ভালো খুব ভালো।
আশরাফুজ্জামান খুশি মনে কাপড় বদলোত গেলেন। অনেকদিন চাইনিজ খাওয়া হয় না। থাই সুপ তাঁর খুব পছন্দের জিনিস। বৃদ্ধ বয়সে সুপ জাতীয় খাবারই ভালো। সহজপাচ্য, খেতেও সুস্বাদু।
সবাই চাইনিজ খেতে গেল। শুধু যে এ বাড়ির সবাই তাই না, রকিব তার বড় বোনকেও বলে এসেছিল। সেও চলে এল। হাসানের মা রাগ করে এতদিন মেয়ের বাড়িতে ছিলেন। তিনিও এলেন। শুধু হাসান গেল না। তার শরীর ভালো না। সন্ধ্যা থেকে মাথা ঘোরাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে থাকলে মাথা ঘোরায় না। চোখ মেললেই মাথা ঘোরে। একজন ডাক্তার মনে হয় দেখানো দরকার।
বাসা খালি হয়ে যাবার পর হাসানের মন কেমন করতে লাগল। বেশি রকম একলা লাগছে। সবার সঙ্গে গেলেই হত। কিছু না খেয়ে বসে থাকলেও হতো। বাসার সবার একসঙ্গে হওয়া একটা বড় ঘটনা। অনেকদিন পর এই ঘটনা ঘটছে শুধু সে বাদ পড়ল।
হাসান বিছানা থেকে নামল। একা একা শুয়ে থাকতে অসহ্য লাগছে। রেস্টুরেন্টের ঠিকানা জানা থাকলে সেখানে চলে যেত। ঠিকানা জানা নেই। হাসান রওয়ানা হলো তিতলীদের বাসার দিকে। অসুস্থ অবস্থাতেই প্ৰিয়জনদের বেশি দেখতে ইচ্ছে করে। তিতলীকে কেন জানি খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। হাসান তিতলীদের বাড়ির গেট পর্যন্ত গেল। গেটের ভেতর ঢুকাল না। এত ঘনঘন ওই বাড়িতে যাওয়া ঠিক না। তিতলীর বাবা নিশ্চয়ই রাগ করবেন। সেই রাগ তিনি হাসানের ওপর দেখাবেন না, দেখাবেন তিতলীর ওপর। তার কারণে তিতলী বকা খাবে এটা ঠিক না।
