মিষ্টি।
দাও একটু দই খাই। এক কাজ কর, দইয়ের সঙ্গে একটা কালোজাম দাও।
তিনি খুব আরাম করে দই-কালোজাম খেলেন। চা সিগারেট খেলেন। পুলিশের দুশ্চিন্তা তার মাথা থেকে চলে গেল। তাঁর এখন শেষ সময়। শেষ সময়ে দুশ্চিন্তা করে লাভ কী! তিনি কোনো অন্যায় করেন নি। পুলিশ তাকে নিয়ে জেলে ঢোকাতে পারবে না। যে কটা দিন আছেন–সুখে শাস্তিতে পার করে দিতে পারলেই হলো।
রকিব কী ব্যামেলা পাকিয়েছে কে জানে? কামেলা যদি পাকিয়েই থাকে তার ভাইরা বুঝবে। তিনি কে? তিনি কেউ না।
আশরাফুজ্জামান সাহেব আরেক কাপ চা দিতে বললেন। প্রথম চা-টা সিগারেট ছাড়া খেয়েছেন। দ্বিতীয় কাপ সিগারেট দিয়ে খাওয়া। ইস্কান্দরের হোটেলে দুপুরে তেহারি রান্না হয়। আজ তেহারি খেতে ইচ্ছা করছে। গরম হাঁড়ি নামলেই খেয়ে ফেলতে হবে। দেরি করলে নিচে তেল জমে যায়। তেল খাওয়াটা ঠিক না।
ইস্কান্দর।
জ্বি।
আজ তোমার এখানে তেহরি খাব।
জ্বি আচ্ছা।
মুখের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। ভালোমন্দ খেতে ইচ্ছা করে। তোমার তেহারিটা ভালো হয়। বাবুর্চি ভালো। নাম কী বাবুর্চির?
ইস্কান্দর জবাব দিল না। সে জেনে গেছে বুড়োদের সব কথার জবাব দিতে হয় না। একটা পর্যায়ে কথা বলা বন্ধ করে দিতে হয়।
ইস্কান্দর।
জ্বি।
দেশে রাজনীতির হালচাল কী?
জানি না।
মিলিটারি ছাড়া আমাদের গতি নাই ইস্কান্দর। লেফট রাইট না করালে দেশটার কিছু হবে না। দেখি তোমার পিচ্চিটারে ডাক তো–একটা খবরের কাগজ আনিব।
বাসায় খবরের কাগজ আছে। তারপরেও আলাদা করে কাগজ পড়ার অন্য রকম মজা। বাসার কাগজ পড়ায় সেই মজা নেই। আশরাফুজ্জামান সাহেব মাঝে মাঝে নিজের টাকায় কাগজ কেনেন। পড়া হয়ে গেলে সেই কাগজ যত্ন করে জমা করে রাখেন। অনেকগুলো কাগজ জমেছে। বিক্রি করে কিছু টাকা পাওয়া যাবে। খবরের কাগজ কত দরে বিক্রি হয় কে জানে!
ইস্কান্দর।
জ্বি।
পুরনো খবরের কাগজের দর কত জান? কী দরে বিক্রি হয়?
জানি না।
দেখি আরেক কাপ চা দিতে বল। দুধ বেশি করে দিবে।
খবরের কাগজ শেষ করতে তাঁর এক ঘণ্টার মতো লাগল। টাকা পুরোপুরি উসুল করলেন। কোনো কিছুই বাদ দিলেন না। এরশাদ সাহেবের একটা কবিতা ছাপা হয়েছে। নদী-পাখি-আকাশ বিষয়ক। সেই কবিতা তিনি পড়ে ফেললেন। নদী-পাখি এবং আকাশ নামক বস্তুগুলোর প্রতি তার মমতা দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন কি না বোঝা গেল না।
আশরাফুজ্জামান সাহেব পত্রিক ভাজ করে বগলে নিয়ে নিলেন। তেহারি রান্না হতে এখনো দেরি আছে। আজ ছুটির দিন বাসায় লোকজন নেই। বউমা তার ভাইয়ের বাসায়। খালি বাসায় চুপচাপ বসে থাকার অর্থ হয় না। বড় মেয়ের বাসা থেকে কি একবার ঘুরে আসবেন? তাঁর স্ত্রী বর্তমানে বড় মেয়ের বাসায় আছেন। স্ত্রীর সঙ্গেও দেখা হলো। স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়াটা অবশ্য তত জরুরি না। বড় মেয়ের কাছে গেলে একটা লাভ অবশ্য হয়। বড় মেয়ে মাঝেমধ্যেই তাক্লে কিছু টাকা-পয়সা দেয়। বেশি না, সামান্যই। কখনো একশ’ টাকার দুটো নোট। কখনো পঞ্চাশ টাকার তিনটা নোট। তার স্বামী যখন আশপাশে থাকে না তখন চট করে নোট কটা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে দিলে বলে—বাবা রেখে দিন।
চাচা স্নামালিকুম।
আশরাফুজ্জামান সাহেব চমকে তাকালেন। লম্বা একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। মুখভর্তি হাসি। এমন আনন্দিত মুখের কোনো ছেলেকে তিনি ইদানীংকালে দেখেছেন বলে মনে পড়ে না।
চাচা আমাকে চিনতে পারেন নি, তাই না?
না চিনতে পারি নি।
আমি লিটন।
ও আচ্ছা লিটন। ভালো খুব ভালো।
আমি হাসানের বন্ধু। স্কুলে পড়েছি। ওর সঙ্গে।
ভালো ভালো। খুব ভালো।
হাসানের খোজে বাসায় গিয়েছিলাম–দেখি বাসায় কেউ নেই।
হাসান কোথায় গেছে জানি না। বউমা গেছে তার ভাইয়ের বাসায়।
হঠাৎ করে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। চাচা। আজ সন্ধ্যাবেলায় বিয়ে। অনুষ্ঠান টনুষ্ঠান কিছু না— কাজি ডেকে বিয়ে। হাসানকে খবরটা দিতে এসেছিলাম।
আমি বলে দেব।
চাচা আমার নাম মনে থাকবে তো? লিটন। লিটন বললেই হবে।
আমি বলব। আশরাফুজ্জামান হাঁটছেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে লিটনও ঘটছে। ভালো যন্ত্রণা হলো দেখি।
আমি পরশুদিন সকালে মালয়েশিয়া চলে যাচ্ছি। আদম বেপারিকে ধরে ব্যবস্থা হয়েছে। দেশে কিছু হচ্ছিল না। খুব কষ্টে ছিলাম চাচা–এখন মনে হয় আল্লা মুখ তুলে চেয়েছেন।
ভালো খুব ভালো।
হাসান আমার কাছে দুই হাজার টাকাও পায়। এক হাজার টাকা নিয়ে এসেছি। আপনার কাছে দিয়ে যাই।
আচ্ছা দাও।
ইচ্ছা ছিল সবার সব ঋণ শোধ করে যাব। সম্ভব হয় নাই। এখন বিদেশ থেকে পাঠাব।
ভালো খুব ভালো। ঋণ রাখতে নেই।
মালয়েশিয়ায় গুছিয়ে বসে ইনশাল্লাহ হাসানকেও নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করব।
আশরাফুজ্জামান লিটনের টাকাটা রাখলেন। তাঁর হেঁটে হেঁটে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল–এখন রিকশা নিয়ে ফেললেন। পকেটে টাকা আছে রিকশায় ঘোরাফেরা করা যায়।
চাচা।
বল বাবা।
কাল সকালে চলে যাচ্ছি তো–তাই তাড়াহুড়া কবে বিয়ে। আগেভাগে কাউকে কিছু বলতে পারি নি। হাসানকে আপনি অবশ্যই পাঠিয়ে দেবেন।
অবশ্যই পাঠাব।
আমার জন্যে একটু দোয়া করবেন। চাচা।
অবশ্যই দোয়া করব।
লিটন পা ছুঁয়ে সালাম করল। আশরাফুজ্জামান সাহেব চোখ বন্ধ করে খানিকক্ষণ বিড়বিড় করলেন।
রিকশা চলছে। তিনি হুড ধরে আনন্দিত ভঙ্গিতে বসে আছেন। লিটনের টাকাটা পেয়ে ভালো লাগছে। হাত একেবাবে খালি হয়ে গিয়েছিলো। কিছু টাকা চলে এল। টাকার কথা, লিটনের বিয়ের কথা হাসানকে বলার। তিনি কোনো কারণ দেখছেন না। তিনি বুড়ো মানুষ এইসব কথা ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক।
