শরিফা ঘটনোটা তার স্বামীকে বলতে পারছে না। তার ধারণা ঘটনা শুনলেই তার স্বামী খুব রাগ করবেন। স্বামীর কাছ থেকে ধমক বা কড়া কথা শুনতে তার একেবারেই ভালো লাগে না। একবার ধমক, শুনলে তার কয়েকদিন মন খারাপ থাকে। শরিফা আজ সারাদিনই একমনে পাঠ করেছে— ‘ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন।’ কারো মৃত্যুসংবাদ শুনলে এই দোয়া পাঠ করতে হয়, আবার কিছু হারিয়ে গেলে এই দোয়া পড়লে হারানো বস্তু ফিরে আসে। এই দোয়া পড়ে সে একবার তার হারিয়ে যাওয়া সোনার নাকফুল খুঁজে পেয়েছিল। উঠান ঝাড়ু দিতে সে শলার ঝাড়ু নিয়ে উঠানে গেছে। হঠাৎ দেখে রোদ পড়ে ঝাড়ুর ভেতর কী যেন ঝকমক করে উঠল। নাকফুল ঝাড়ুর শলায় আটকে ছিল।
রাতে খেতে বসে করিম বললেন, তোমার কি শরীর খারাপ? চোখ-মুখ শুকনা। জ্বর উঠেছে?
শরিফা বলল, শরীর ঠিক আছে।
কোনো বিষয় নিয়া কি চিন্তাযুক্ত?
আপনারে নিয়া চিন্তাযুক্ত।
করিম ভুরু কুঁচকে বললেন, আমারে নিয়া কী চিন্তা?
শরিফা বলল, জিন খোররম যে আপনারে ত্যক্ত করতেছে এই নিয়া চিন্তা।
করিম বললেন, এইসব নিয়া তুমি চিন্তা করব না। আমার সমস্যা আমি সমাধান করব। এর মধ্যে সমাধান কিছুটা হয়েছে— মসজিদ থেকে বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা বন্ধন দিয়েছি। ভূত-প্ৰেত-জিন-পরী এইটুক রাস্তায় আর আসবে না।
বন্ধন দেওনের পরে তার আর দেখা পান নাই?
দুই দিন দেখেছি- জংলায় হাঁটতেছে, রাস্তায় উঠতে পরে নাই। চেষ্টা নিয়েছে, পারে নাই।
শরিফা বলল, একবার বন্ধন দিলে কতদিন থাকে?
চন্দ্র তারিখ হিসাবে থাকে। শুক্লপক্ষের প্রথম দিনে বন্ধন দিলে পূর্ণিমা পর্যন্ত থাকে। যাই হোক, কথা চালাচালি বন্ধ। খাওয়া হলো ইবাদত। ইবাদতের সময় कशी बळी यांट्र না।
শরিফা বলল, ইবাদতের জন্য পুণ্য আছে না?
করিম বললেন, অবশ্যই আছে।
শরিফা বলল, যে শুকনা মরিচভর্তা দিয়া ভাত খাইতেছে তার পুণ্য বেশি, না-কি যে দশ পদ পোলাও-কোৰ্মা খাইতেছে তার পুণ্য বেশি?
করিম বললেন, মরিচভর্তা দিয়া যে খাইতেছে তার পুণ্য অনেক অনেক বেশি।
শরিফা বলল, আমার মনে হয় যে দশ পদ দিয়া খাইতেছে তার পুণ্য বেশি। আরাম কইরা মনের আনন্দে সে খাইতেছে। বইলাই পুণ্য বেশি। শুকনা মরিচভর্তা দিয়া যে খাইতেছে সে বোজার হইয়া খাইতেছে। ‘
করিম বিরক্ত হয়ে বললেন, যা জানো না তা নিয়া বাহাস করব না।
আচ্ছা আর করব না।
বারান্দায় পাটি দেও, জায়নামাজ দেও। আজ রাতে ঘুমাব না। সারারাত ইবাদত বন্দেগি করে কাটাব। ফজরের নামাজ শেষ করে ঘুমাতে যাব।
কেন?
করিম বিরক্ত হয়ে বললেন, কেন কী? ইবাদত বন্দেগি করে রাত কাটানোর মধ্যে কোনো কেন নাই। ইবাদত বন্দেগি না করার মধ্যে কেন আছে।
রাত মন্দ হয় নাই। বাজারের কোলাহল বন্ধ হয়েছে। রাত বারোটায় গোয়ালন্দ থেকে শেষ লঞ্চ আসে। সেটাও চলে এসেছে। করিম বারান্দায় জায়নামাজে বসে আছেন। তার হাতে তসবি; জায়নামাজের এক কোনায় কেরোসিনের কুপি। কুপির লাল আলো করিমের মুখে পড়েছে। করিমকে ভীত দেখাচ্ছে। তিনি বারবারই এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। আজ একটা বিশেষ রাত। তিনি মজুকে একশ’ টাকা দিয়েছেন। মজু বলেছে, সে যেভাবেই হোক আজ রাতেই কার্য সমাধা করে খবর দিয়ে যাবে। তখন তাকে আরো পঁচিশ টাকা দিতে হবে। করিমের পাঞ্জাবির পকেটে পঁচিশ টাকা আছে।
মজু এখনো আসছে না। সে কখন কাৰ্য সমাধা করবে তাও তাঁকে বলে নি। এখন মনে হচ্ছে কাৰ্য সমাধা হবে শেষরাতে। দরজায় খুঁট করে শব্দ হলো। করিম বিরক্ত হয়ে তাকালেন।
শরিফা ক্ষীণ গলায় বলল, আপনি কি সত্য সত্যই সারারাত জাগবেন?
দরজার ফাক দিয়ে শরিফাকে দেখা যাচ্ছে। করিম অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। রাগী গলায় বললেন, ঘুমাইতে যাও, ইবাদত বন্দেগি করতেছি। এই সময় ত্যক্ত করবা না।
শরিফা ঘুমুতে গেল। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে না। আসা পর্যন্ত সে একমনে হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার দোয়া পড়তে লাগল। ভাইজানের দেয়া একশ’টা টাকায় কত কিছুই সে কিনতে পারত।
লাবুস তার বোনের সব ব্যবস্থা ভালোমতোই করেছে। বাগদি পাড়ার এক মেয়েকে আনিয়েছে। তার বয়স ষোল-সতেরো। নাম কালী। কালীর নিজের একমাস বয়েসি মেয়ে গতকাল মারা গেছে। মৃত সন্তানের শোকে সে কাতর। পুষ্পরাণীকে সে লাবুসের হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে নিল। বিস্মিত গলায় বলল, হা ভগবান, আমার তুলসির চেহারার মতো চেহারা। হেই মুখ হেই চউখ। একটাই বেশিকম- তুলসি ছিল কালা, আর এ চাঁদের মতো ফকফইক্যা।
চুকচুক করে দুধ খাচ্ছে। কালীর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। এই অশ্রু আনন্দের कों (दानन्दू (द यक्षद?
মাওলানা ইদরিস লাবুসের কাছে হিন্দু মেয়ের বুকের দুধ খাওয়া নিয়ে ক্ষীণ আপত্তি তুললেন। লাবুস বলল, দুধের কোনো হিন্দু-মুসলমান নাই। হিন্দুমুসলমান মানুষের চিন্তায়। দুধের চিন্তার শক্তি নাই।
লাবুসের কথায় মাওলানা হ’কচাকিয়ে গেলেন। ধর্ম নিয়ে এইভাবে তিনি কোনোদিন চিন্তা করেন নি। এই দিকে চিন্তা করা যেতে পারে।
পাকা দালানের দক্ষিণের সর্বশেষ ঘরটায় মাওলানার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। খাটে জাজিমের বিছানা। বিছানায় ফুলতোলা চাদর। খাটের পাশের টেবিলে কাঁসার জগভর্তি পানি, একটা কাঁসার গ্রাস। সবই ঝকঝকি করছে।
হাদিস উদ্দিন মাওলানাকে খুবই খাতির-যত্ন করছে। গোসলের জন্যে গরম পানি করে দিয়েছে। মাওলানার সঙ্গে সে কলঘরে সাবান এবং ‘ফোড়ল’ নিয়ে ঢুকেছে, গায়ে সাবান ডলে দিবে।
