তার কি ক্ষিধে লেগেছে? ফিডিং বোতল মুখে ধরলে কি খাবে? দুধ কি বিছানায় শুইয়েই মুখে ধরবেন? না-কি আগে তাকে কোলে নিয়ে মুখে ধরবেন? কচি শিশুরা মাছের মতো পিচ্ছিল হয় বলে তার ধারণা। কোলে নিতে গেলে পিছলে পড়ে যাবে না তো! তিনি তাঁর এই দীর্ঘজীবনে কখনো কোনো শিশু কোলে নিয়েছেন এরকম মনে করতে পারলেন না। আহারে, বেচারা হাত-পা নেড়ে কী কান্নাই না। কাঁদছে!
মাওলানা বিসমিল্লাহ বলে অনেক আয়োজন করে শিশু কোলে নিলেন। তার মুখের সামনে ফিডিং বোতল ধরামাত্রই তার কান্না থামলো। সে চুকচুক করে দুধ টানছে। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। ঘুমিয়ে পড়ছে না-কি? সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়লে দুধ খাওয়ানো কি বন্ধ করে দেবেন? সেটাই তো যুক্তিযুক্ত। ঘুমের মধ্যে কেউ খাদ্য গ্রহণ করে না। মানবসন্তান কেন করবে?
পবিত্ৰ কোরান পাঠ করার সময় মাওলানা যেভাবে দোলেন এখনো তিনি মনের অজান্তে সেভাবেই দুলছেন। শিশুটির দিকে তাকিয়ে মিল দিয়ে দিয়ে বিচিত্র সব কথা বলে যাচ্ছেন–
এই বাবু!
দুধ খারু?
মজা পাবু?
কই যারু?
এই বাবু!
তুমি হাবু।
এবং হাবা
মজা পাবা
কই যাবা?
বলে বাঘ।
ও আল্লা
বাবুর কী রাগ!
মাওলানার কথাবার্তা মনে হয় শিশুটির পছন্দ হচ্ছে। দুধ খেতে খেতেই সে হাসল। মাওলানা অস্পষ্ট গলায় বললেন, আহারে! আহারে! মাওলানার চোখ অশ্রুসিক্ত হলো। তিনি গভীর আবেগে বললেন, হে রাব্ববুল আলামিন, হে গাফুরুর রাহিম! তোমার প্রতি নাদান বান্দা ইদরিসের সালাম।
সন্ধ্যার মধ্যে অনেকেই জেনে গেল জুলেখা তার কন্যাসন্তানকে মাওলানার বাড়িতে ফেলে চলে গেছে। মাওলানা মহাবিপদে পড়েছেন। মাওলানা নিজে থাকেন। একবেলা খেয়ে। সেই খাওয়াও সবদিন জোটে না। বাচ্চাটাকে খাওয়াবেন কী?
কয়েকজন আগ্রহ করে বাচ্চা দেখতে গেল। দূর থেকে দেখল, কাছে গোল না, কোলেও নিল না। এই শিশু অপরূপ রূপবতী হলেও সে মূর্তিমান পাপ ছাড়া কিছু না। তাকে দূর থেকে দেখা যায়, কোলে নেয়া যায় না।
জুলেখা এক বোতল দুধ রেখে গিয়েছিল। সন্ধ্যার আগেই সেই দুধ শেষ হয়ে গেল। বাচ্চা কাঁদতে শুরু করল। তার জন্যে খাবার কীভাবে জোগাড় করবেন। মাওলানা ভেবে পেলেন না। তাকে বাড়িতে রেখে খাবারের সন্ধানে কোথাও যাওয়া যাবে না। তিনি যেখানেই যান, তাকে কোলে নিয়েই যেতে হবে। বাচ্চাটার জন্যে কাঁথা দরকার, কাপড় দরকার। সেসবইবা কোথায় পাবেন? বাচ্চ ঘনঘন পিসাব করছে। কাপড় বদলাতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে মাওলানা তাকে নিজের একটা পাঞ্জাবি দিয়ে জড়িয়ে রেখেছেন। বাবু সেই পাঞ্জাবিও ভিজিয়ে ফেলেছে। মাওলানা অস্থির বোধ করলেন। সর্বপ্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব পরম করুণাময় আল্লাহপাকের। নিম্নশ্রেণীর প্রাণের জন্যে তা একশ’ ভাগ সত্যি। প্রতিটি পিপড়ার খাবারের ব্যবস্থা তিনি করে রেখেছেন। মানুষকে তিনি অস্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে পাঠিয়েছেন বলে তার খাবার তাকেই সংগ্ৰহ করতে হয়।
ক্ষুধায় অস্থির হয়ে শিশু খুবই কাঁদছে। মাওলানার চোখ দিয়েও পানি পড়ছে। তার মন বলছে, আল্লাহপাক তাঁকে জটিল এক পরীক্ষায় ফেলেছেন। এই পরীক্ষা থেকে তিনি কীভাবে পরিত্রাণ পাবেন বুঝতে পারছেন না। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়েই তাকে বের হতে হবে। দেরি করা যাবে না।
উঠানে লণ্ঠন হাতে কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে। ইদরিস বাচ্চা কোলে নিয়ে বারান্দায় এসে দেখেন লাবুস।
লাবুস বলল, বোনকে দেখতে এসেছি। তার নাম কী?
মাওলানা বললেন, নাম জানি না। তার মা কী নাম রেখেছে বলে যায় নাই। তবে তার ইচ্ছা ছিল মেয়ে হলে নাম রাখবে মীরা।
লাবুস বলল, বোনকে আমার কোলে দিন।
বাচ্চা কাঁদছিল। লাবুসের কোলে উঠে কিছুক্ষণের জন্যে তার কান্না থামল। সে কৌতূহলী হয়ে নতুন মানুষটাকে দেখছে। লাবুস বলল, আমি আমার বোনের নাম রাখলাম পুষ্পরানি।
মাওলানা বললেন, তুমি কি এর খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবে? এ ক্ষুধায় অস্থির হয়েছে।
লারুস বলল, আমি সব ব্যবস্থা করেই আপনাকে নিতে এসেছি।
কী ব্যবস্থা করেছ?
লাবুস বলল, একটা মেয়ে রেখেছি যে পুষ্পারানির দেখাশোনা করবে। আমার বোনের যা যা লাগবে তার সব ব্যবস্থা করেছি।
মাওলানা বললেন, ব্যবস্থা করেছি, ব্যবস্থা করেছি— এমন কথা বলব না। এতে অহঙ্কার প্রকাশ হয়। ব্যবস্থা করেছেন আল্লাহপাক। তোমার মাধ্যমে করেছেন।
লাবুস বলল, আমার ভুল হয়েছে। এখন আমার সঙ্গে চলেন।
মাওলানা বললেন, আল্লাহপাকের হিসাব সাধারণ মানুষের বোঝা সম্ভব না। আমি বাচ্চাটাকে কী খাওয়াব কী পরাব ভেবে খুব অস্থির হয়ে ছিলাম। কাঁদতে ছিলাম। আমার একবারও মনে হয় নাই যে, আল্লাহপাক সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
পুষ্পরানি আবার কাঁদতে শুরু করেছে। লাবুস পুষ্পরানিকে কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে রওনা হয়েছে। হারিকেন হাতে নিয়ে মাওলানা আগে আগে যাচ্ছেন। আয়াতুল কুরসি পড়তে পড়তে যাচ্ছেন। ছোট শিশুদের দিকে ভূত-প্রেতের নজর থাকে বেশি। সেই শিশু যদি রূপ নিয়ে আসে তাহলে সমস্যা আরো বেশি হয়। জিনরা সুন্দর মানবশিশু তাদের দেশে নিয়ে যেতে আগ্রহী থাকে বলে তিনি শুনেছেন। মানুষ জিনের বাচ্চা পালতে পারে না, কিন্তু জিন মানুষের বাচ্চা পালতে পারে— এটাও এক রহস্য। জগৎ রহস্যময়।
জামে মসজিদের ইমাম করিম সাহেবের স্ত্রী শরিফা আজ সারাদিন অভুক্ত। এমন না যে ঘরে খাবার নাই। খাবার আছে, কিন্তু সে খেতে পারছে না। ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া তার একশ’ টাকা চুরি গেছে। চুরি কখন হয়েছে। সে অনেক চিন্তা করেও বের করতে পারছে না। গত রাতে চুরি হয়েছে এটা পরিষ্কার। তবে চোর একশ’ টাকা ছাড়া আর কিছুই নেয় নি। টাকাটা সে রেখেছিল অতি গোপন জায়গায়— শুকনা বড়ুই-এর হাঁড়িতে। টাকার ওপর শুকনা বড়ুই বিছানো। চোর এই গোপন জায়গা থেকে টাকা বের করে নিয়ে গেল কীভাবে কে জানে!
