বিষয়টা নিয়ে তিনি কি কারো সঙ্গে আলাপ করবেন? আলাপ-আলোচনা করার লোকও নাই। সব ধান্দাবাজ। সবাই আছে নিজের ধান্দায়। কাউকে বিশ্বাসও করা যায় না। মাওলানা ইদরিসকে খবর দিয়ে আনা যায়। সেও গাধা। গাধা মাওলানা। হাদিস-কোরানের বাইরে কিছুই জানে না। শশাংক পাল বিরক্ত গলায় ডাকলেন, সুলেমান! সুলেমান!
সুলেমান ঘোড়ায় চড়ে ভিক্ষা করে। দূর-দূরান্তে চলে যায়। সে এইসব বিষয় জানতে পারে। সুলেমানকে পাওয়া গেল না। জানা গেল কিছুক্ষণ আগে সে ঘোড়া নিয়ে বের হয়েছে। ভিক্ষাবৃত্তির প্রধান সমস্যা হচ্ছে, দিনের মধ্যে কিছুক্ষণ ভিক্ষা না করলে পেটের ভাত হজম হয় না।
শশাংক পালের মুখে মাছি বসেছে। নিমপাতা দিয়ে হাওয়া করে মাছি তাড়াবার কেউ নেই। তিনি নিজে হাত দিয়ে তাড়াতে পারেন। তাতে লাভ কী? আবার এসে বসবে।
পুকুরঘাটে কে যেন হাঁটাহাঁটি করছে। শুকনা পাতার ওপর হাঁটার শব্দ কানে আসছে। শরীর পুরোপুরি নষ্ট হওয়ায় একটা লাভ হয়েছে, কান পরিষ্কার হয়েছে। অনেক দূরের শব্দও শুনতে পান।
শশাংক পাল বললেন, হাঁটে কে? কাছে আস।
কেউ একজন এসে মাথার পেছনে দাঁড়াল। এমনভাবে সে দাঁড়িয়েছে যে তাকে দেখা যাচ্ছে না।
শশাংক পাল বললেন, গাধার মতো মাথার পিছনে দাঁড়ায়েছ। কেন? সামনে আসি তোমারে দেখি।
সারা গায়ে চাদর জড়ানো একজন শশাংক পালের পায়ের কাছে এসে দাঁড়াল।
তুমি কে?
আমার নাম লাবুস।
সুলেমানের পুলা না?
জি।
শরীরে চাদর কেন? ‘দরবেশ হয়েছ? এইখানে কী চাও?
বাপজানের খোঁজে আসছি।
সে গেছে ভিক্ষায়। তুমি একটা কাজ কর, আরেকটা ঘোড়া জোগাড় কর। বাপ-বেটায় একসঙ্গে ঘোড়ায় চইড়া ভিক্ষা করবো। মনোহর দৃশ্য। হা হা হা।
লাবুস তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না একটি নগ্ন মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে সে কোনোরকম লজ্জা পাচ্ছে। শশাংক পাল বললেন, নিমের ডাল হাতে নাও। আমারে বাতাস করা। ঘণ্টা হিসাবে পয়সা পাইবা। ঘণ্টায় দুই পয়সা। রাজি আছ?
লারুস, জবাব না দিয়ে নিমের ডাল দিয়ে বাতাস শুরু করল। ঘণ্টায় দুই পয়সা তার জন্যে যথেষ্ট। আজ সকাল থেকে সে কিছু খায় নি। সে বাবার কাছে এসেছিল দুপুরের খাবারের কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি-না সেই খোঁজে।
নিমের ডালের হাওয়ায় আরাম লাগছে। মাছিগুলি যে তাড়া খাচ্ছে এই দৃশ্য দেখেও ভালো লাগছে। শশাংক পাল বললেন, মৎস্যকন্যার মাংস নিয়ে একজন যে বান্ধবপুর বাজারে এসেছে এই খবর জানো?
লাবুস বলল, না।
হারামজাদা এক পিস মাংসের দাম চায় দশ হাজার টাকা। থাপড়ায়ে এর দাঁত ফেলা দরকার। তাকে থাপড়াতে পারব?
লারুস, জবাব দিল না। একমনে বাতাস করতে লাগল। শশাংক পাল বললেন, বাজারে তারে খুঁইজ্যা বাহির করা। তারপর তার দুই গালে দুই চড় দেও। প্রতি চড় এক টেকা হিসেবে দুই টেকা পাইবা। রাজি?
লাবুস জবাব দিল না।
শশাংক পাল বললেন, কত বড় ধান্দাবাজ, কুকুরের মাংস নিয়ে এসে বলে মৎস্যকন্যার মাংস! আমার কাছে বেচিতে চায়। ভাবছে কী? এই মাংস খাওয়ার চেয়ে গু খাওয়া ভালো। ঠিক না?
লাবুস বলল, ঠিক।
শশাংক পাল পরদিন দুপুর দুটিার সময় মৎস্যকন্যার মাংস খেলেন। কাঁচাই খেলেন। রান্না করলে যদি গুনাগুণ নষ্ট হয়ে যায়! মাংস খাবার সময় সুলতান সামনে বসে রইল। লবণভর্তি মাংস— খাওয়ার সময় শরীর উল্টে যাবার মতো হলো। শশাংক পাল হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, নুনা ইলিশের মতো স্বাদ। এর কারণ কী?
সুলতান বলল, মাংস যাতে নষ্ট হয়ে না যায়। এর জন্যে নুন দিয়ে জারানো। চাবায়ে খাওয়ার দরকার কী! ওষুধের ট্যাবলেটের মতো গিলে ফেলেন। এটা তো ওষুধই।
অনেক কষ্টে শশাংক পাল মাংস গিললেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই শরীরে জুলুনি শুরু হলো। যেন কেউ নাগা মরিচ বেটে শরীরে মাখিয়ে দিয়েছে। এমন ভয়ঙ্কর জুলুনি যে শশাংক পালের ইচ্ছা করছে নিজেই টান দিয়ে তার গায়ের চামড়া খুলে ফেলেন। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আমাকে ধরাধরি করে পুসকুনির পানিতে ড়ুবায়ে রাখা। আমার সর্বাঙ্গ জুলে যাচ্ছে গো। সর্বাঙ্গ কেউ যেন আগুন দিয়ে পুড়াচ্ছে। হায় ভগবান, এ-কী শাস্তি!
তাঁকে পুকুরের পানিতে ড়ুবানো হলো। দুইজন দুই দিক থেকে হাত ধরে আছে। তিনি মাথা ভাসিয়ে আছেন। মাঝে মাঝে মুখে পানির ছিটা দেয়া হচ্ছে। বান্ধবপুরের মানুষ পুকুরের চারদিকে জড়ো হলো। তাদের কৌতূহলের সীমা নাই। শশাংক পাল বললেন, দেখ মিনি মাগনার মজা। মৎস্যকন্যার মাংস খেয়ে আমি হয়েছি মৎস্যপুরুষ। পানিতে বাস করা শুরু করেছি। এমন মজা দেখবা না। কোনো সার্কাস পাটিতেও এই মজা নাই।
সন্ধ্যাবেল তিনি মাওলানা ইদরিসকে খবর দিলেন। ক্ষীণ গলায় বললেন, সবাই মজা দেখতে এসেছে, আপনি নাই, এটা কেমন কথা? মজা ভালো লাগে না?
মাওলানা বললেন, আপনি বিরাট যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। মানুষের যন্ত্রণা দেখতে ইচ্ছা করে না।
এটা কী বললেন মাওলানা? যন্ত্রণা দেখার মধ্যেই আনন্দ। অন্যের যন্ত্রণা হচ্ছে, আমার হচ্ছে না— আনন্দ না?
মাওলানা জবাব দিলেন না। শশাংক পাল বললেন, আপনাকে ডেকেছি একটা অতি জরুরি এবং অতি গোপন কথা বলার জন্যে। খোশগল্প করার জন্যে ডাকি নাই।
মাওলানা বললেন, বলেন কথা। আমি আছি।
শশাংক পাল ক্ষীণ গলায় বললেন, কথাটা শুধু আপনারে বলব। দুইজন আমার হাত ধরে আছে। এখন বললে তারাও শুনবে। আমি চাই না তারা শুনুক। এই তোরা দুইজন আমাকে শুকনায় তোল। কিছুক্ষণের জন্যে বিদায় হ। মাওলানার সঙ্গে কথা শেষ হবার পর আবার পানিতে নামাবি।
