সুলতান মিয়া খবর পেয়ে শশাংক পালের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। সে সরাসরি তাকাতে পারছে না, কারণ শশাংক পাল সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় পাটিতে শুয়ে আছেন। শীতলপাটির উপর কলাপাতা বিছানো। একজন নিমগাছের ডাল দিয়ে তাকে বাতাস দিচ্ছে। নিমপাতার হাওয়া শরীরের জন্যে উপকারী। শশাংক পাল কিছুক্ষণ আগে বমি করেছেন। মুখ ধোয়া হয় নি। বেশ কিছু পুরুষ্ট নীল রঙের মাছি মুখের চারপাশে উড়াউড়ি করছে। নিমপাতার হাওয়ার কারণে মুখে বসতে পারছে না। তারা হতোদ্যম হয়ে চলেও যাচ্ছে না। রবার্ট ব্রুসের ধৈর্য নিয়ে চেষ্টা করেই যাচ্ছে।
শশাংক পাল বললেন, শরীরে কাপড় রাখতে পারি না। শরীর জ্বালা করে। এই জন্যে ন্যাংটা হয়ে আছি। বুঝেছ?
সুলতান মিয়া হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
শশাংক পাল বললেন, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি বিদেশী মানুষ। তুমি কি আমাকে চেনো?
সুলতান মিয়া আবারো হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
আমার সম্বন্ধে কী জানো অল্পকথায় বলে। সারমর্ম বলবা, ইতিহাস শুরু করবা না। ইতিহাস শোনার সময় আমার নাই। জীবনের শেষপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছি। এখন ঝটপট বলো, আমি কে?
আপনি জমিদার শশাংক পাল।
একসময় জমিদার ছিলাম। আমার রক্ষিতা ছিল চারজন। এখন আমি ফালতু। শশাংক পাল, বালস্য বাল। হা হা হা।
শশাংক পাল হেঁচকি না ওঠা পর্যন্ত হাসলেন। অতি কষ্টে বললেন, লোকমুখে শুনেছি। তুমি না-কি মৎস্যকন্যার মাংস নিয়ে এসেছ?
সুলতান মিয়া হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। শশাংক পাল বললেন, মাথা নাড়ােনাড়ি বন্ধ। হ্যাঁ বলবা কিংবা না বলবা। মৎস্যকন্যার মাংস এনেছ?
হ্যাঁ।
কতখানি এনেছ?
দুই পিস। এক পিস বিক্রি করে দিয়েছি। আরেক পিস আছে।
মৎস্যকন্যার মাংস খেলে চিরযৌবন লাভ হয়, এটা কি সত্য?
জানি না। লোকে বলে।
তুমি নিজে খেয়েছ?
না।
এক পিস মাংস যে বিক্রি করেছ, কার কাছে বিক্রি করেছ? তার নাম ঠিকানা বলে।
গোয়ালন্দে এক লোকের কাছে বিক্রি করেছি। কাপড়ের ব্যবসা করে। নাম জানি না।
কত টাকায় বিক্রি করেছ?
কত টাকায় বিক্রি করেছি সেটা আপনারে বলব না।
কেন বলবা না?
সুলতান মিয়া চুপ করে রইল। শশাংক পাল বললেন, আমার আগের দিন থাকলে বেয়াদবির জন্যে তোমাকে ন্যাংটা করে মাটিতে পুতে ফেলতাম। যাই হোক, এখন বলো মাংস কোথায় পেয়েছ?
কালিগঞ্জ থেকে এনেছি। যেখানে মৎস্যকন্যা ধরা পড়েছে সেখান থেকে এনেছি।
তার অর্থ কি এই যে, তুমি নিজ চোখে মৎস্যকন্যা দেখেছ?
হুঁ।
শশাংক পাল ধমক দিয়ে বললেন, ই আবার কী? আদবের সঙ্গে বলোদেখেছি কি দেখা নাই।
দেখেছি।
আমরা ছবিতে যেরকম দেখি সেরকম?
সুলতান মিয়া অস্পষ্ট গলায় বলল, সেরকমই, তবে মুখ ছোট।
গাত্ৰবৰ্ণ কী?
নীল।
তার বুকের সাইজ কী? বাঙালি মেয়েদের মতো, না-কি বুকও মুখের মতো ছোট?
খিয়াল নাই।
খিয়াল নাই মানে? বুক দেখো নাই? লজ্জা পেয়েছিলা? মৎস্যকন্যা উদাম গায়ে পানিতে ঘুরে। সে তো শাড়ি দিয়া শরীর ঢাকে না। তারে নগ্ন দেখাই স্বাভাবিক।
সুলতান মিয়া বলল, আমি যখন দেখেছি তখন উড়না দিয়া তার বুক ঢাকা छिन।
উড়না দিয়া বুক ঢাকার প্রয়োজন পড়ল কেন?
সুলতান মিয়া বলল, অনেক ছোট ছোট পুলাপান ছিল, এইজন্যে ঢাকা হয়েছিল। মাতব্বররা ঢাকতে বললেন।
শশাংক পাল বললেন, তুমি বিরাট মিথ্যুক, এইটা তুমি জানো? তুমি কিছুই দেখ নাই। সব বানায়ে বলতেছ। তুমি আছ টাকা কামানোর ধান্দায়। দুই পিস মাংস কোনখান থেকে যোগাড় করে সেটা বিক্রির ধান্দায় আছ। যে মাংস তুমি এনেছ আমার মন বলতেছে সেটা কুকুরের মাংস। তুমি এক ধান্দাবাজ, আমি তোমার চেয়ে বড় ধান্দাবাজ।
সুলতান মিয়া বলল, আপনার সঙ্গে কথা পাল্টাপাল্টি করব না। অনুমতি gनन अभि यादरे।
শশাংক পাল বললেন, অনুমতি দিলাম না। তুমি যে ধান্দাবাজ এটা স্বীকার করে তারপর বিদায় হও।
সুলতান মিয়া স্বাভাবিক গলায় হাই তুলতে তুলতে বলল, আচ্ছা স্বীকার করলাম। এখন বিদায় দেন। আপনার সঙ্গে আমি বাহাস করব না। আপনি যেটা বলেন সেটাই সত্য।
আমার সঙ্গে বাহাস করবা না কেন?
আমি কারোর সাথেই বাহাস করি না। আমার কাছে এক টুকরা মাংস আছে। দশ হাজার টাকা দাম। আপনে ইচ্ছা করলে খরিদ করতে পারেন।
শশাংক পাল বিক্ষিত গলায় বললেন, দশ হাজার টাকা দাম? তুই কন্স কী? দশ হাজার টাকায় একজোড়া জীবন্ত মৎস্যকন্যা পাওয়া যায়। তাদের সঙ্গে যৌনকর্ম করা যায়।
সুলতান নির্বিকার গলায় বলল, পাওয়া গেলে খরিদ করেন। যৌনকর্ম করতে চাইলে করেন। আপনার বড় পুসকুনি আছে। পুসকুনিতে ছাড়েন। আমারে তুই তুকারি করবেন না, আমি আপনার কর্মচারী না।
শশাংক পাল নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলেন। এই বিদের বাচ্চার সঙ্গে কথা চালাচালির অর্থ হয় না। মূল প্রসঙ্গে যাওয়াই ভালো। তিনি হাই তুলতে তুলতে বললেন, মাংস খাইতে হয় কীভাবে? রান্না কইরা খাইতে হয়, না-কি কাঁচা খাইতে হয়?
জানি না।
এক হাজার টাকা নগদ দিতে পারি। যদি পোষায় দিয়া যা। টাকা নিয়া যা।
সুলতান স্পষ্ট গলায় বলল, না। বলেই বের হয়ে গেল। এক মুহুর্তের জন্যেও দাঁড়াল না।
শশাংক পাল ধাধায় পড়ে গেলেন। সত্যি কি এর কাছে আসল বস্তু আছে? চিরযৌবন সহজ ব্যাপার না। এর জন্যে রাজত্ব দিয়ে দেয়া যায়। রাজত্বের কাছে দশ হাজার টাকা কোনো টাকাই না। তাছাড়া টাকা দিয়ে তিনি করবেনইবা কী? মৃত্যু মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি মাথা ঘুরাতে পারেন না বলে দেখতে পারেন না। এক পিস মৎস্যকন্যার মাংস খেলে চিরযৌবন না পাওয়া গেলেও রোগটা তো সারিতে পারে।
