খান সাহেব মাওলানার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেন। মন দিয়ে স্বপ্ন শুনলেন। তারপর দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, স্বপ্ন নিয়া তুমি চিন্তিত? (খান সাহেব কিছুদিন হলো দাড়ি রেখেছেন। দাড়িতে চেহারার ক্রটি অনেকটাই ঢাকা পড়েছে।)
জি জনাব।
ভালো জিনিস নিয়া চিন্তা করা শিখো। স্বপ্ন কি কোনো বিষয়?
স্বপ্নটা কয়েকবার দেখলাম। এই কারণে মন অস্থির।
মাত্র কয়েকবার? একটা স্বপ্ন আমি এই নিয়া একশ’বার দেখেছি। স্বপ্নে আমি গেছি ছোটলাট সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে। খান বাহাদুর টাইটেল দেয়া হবে। আমার খান বাহাদুর টাইটেল পাওয়ার কথা। সেখানে আরো অনেক বিশিষ্টজনরা আছেন। অতি মনোহর তাদের পোশাক। একমাত্র আমার শরীরে কোনো কাপড়-চোপড় নাই। পুরা নেংটা। একটা সুতাও নাই। ছোটলাট এই অবস্থাতেই আমার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। তুমি বলো, খারাপ স্বপ্ন না?
জি।
এই স্বপ্ন আমি একশ’বার দেখেছি, তাতে কী হয়েছে? নাকি তুমি ভাবতেছ। হরিচরণ মৃত্যুর আগে কলেমা তৈয়ব বলে মুসলমান হয় নাই? আমি সবেরে মিথ্যা বানিয়ে বলেছি। একজন হিন্দুরে মুসলমান পরিচয় দিয়া কবর দেওয়ার মধ্যে আমার কোনো ফয়দা আছে? চুপ করে থাকবা না। বিলো ফয়দা আছে?
জি-না। স্বপ্নের তফসির জানলে মনের অস্থিরতা কমত। আল্লাহপাক স্বপ্নের মাধ্যমে আমাদের অনেক কিছু জানান দেন।
খান সাহেব বললেন, তফসির জানতে চাইলে জানো। বিশিষ্ট আলেমদের কাছে যাও। রাহাখরচ যদি চাও আমার দিতে আপত্তি নাই। মুনসির কাছে দস্তখত দিয়া কুড়ি টাকা রাহাখিরচ নেও।
মাওলানা বললেন, আপনার মেহেরবানি। আমি যেন খান বাহাদুর টাইটেল পাই এই জন্যে দোয়াখায়ের সর্বক্ষণ করবা। অঞ্চলে একজন খান বাহাদুর থাকলে সবের লাভ। এতে অঞ্চলের ইজ্জত বাড়ে। বুঝেছ?
জি।
তোমার বৃত্তি এই মাস থেকে পাঁচ টাকা বাড়াইলাম। আমি দরাজ হাতের লোক। সাল্লার নেয়ামত হোসেনের মতো কিরপিন’ না। নেয়ামত হোসেন কী করেছে শুনেছে?
জি না।
লখনৌ-এর যে বাইজি নিয়া আসছিল তারে ফালায়া থুইয়া ভাগছে। সেই মেয়েরে যেসব গয়না দিয়েছিল তাও শুনছি। নিয়া গেছে। মেয়ের না আছে টাকা পয়সা, না আছে কিছু। খাওয়া খাদ্যের ব্যবস্থাও করে নাই। বাধ্য হয়ে আমি ব্যবস্থা নিয়েছি।
ভালো করেছেন।
খান সাহেব হাই তুলতে তুলতে বললেন, কেউ বিপদে পড়লে তার জন্যে কিছু না করা পর্যন্ত অস্থির থাকি। এইটাই আমার সমস্যা।
লখনৌ-এর বাইজি পিয়ারীকে খান সাহেব ময়মনসিংহে ঘর ভাড়া করে। রেখেছেন। পিয়ারীর সঙ্গে আছে তবলচি এবং সারেঙ্গিবাদক। তাদের রান্নাবান্নার জন্যে একজন বাবুর্চি আছে। দেখাশোনার জন্যে দারোয়ান আছে।
খান সাহেবকে কাজেকর্মে প্রায়ই ময়মনসিংহ যেতে হয়। তিনি পিয়ারীর ভাড়া বাড়িতে উঠেন। অনেক রাত পর্যন্ত গানবাজনা হয়। পিয়ারীর সঙ্গ তাঁর বড় মধুর মনে হয়। রাতে সুনিদ্রা হয়। মাঝে মাঝে লাটসাহেবকে দেখা স্বপ্নটা তাকে বিরক্ত করে।
দেওবন্দের আলেমরা মাওলানা ইদরিসের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না। তবে দেওবন্দ যাওয়ায় মাওলানার একটা লাভ হলো, তিনি ‘হাফেজ’ টাইটেল পেয়ে গেলেন। নির্ভুল কোরান পাঠ করলেন। তাঁর ইচ্ছা করল তিনি দেওবন্দে থেকে যাবেন। আলেমদের সঙ্গে ধর্মালোচনা করে জীবন কেটে যাবে। বান্ধবপুরে ফিরে যাওয়া মানেই স্বপ্নে হরিচরণের সঙ্গে সাক্ষাত। এছাড়া রঙিলাবাড়ির বিষয়ও আছে। রঙিলাবাড়ির বিষয় তিনি চিন্তাও করতে চান না। তারপরেও হঠাৎ হঠাৎ চিন্তাটা আসে, তখন বড়ই অস্থির লাগে। শান্তির জীবন আল্লাহপাক তাকে দেন নাই। আল্লাহপাক দিয়েছেন ধারাবাহিক দুঃশ্চিন্তার জীবন।
হাফেজ মাওলানা ইদরিস বান্ধবপুরে ফিরেছেন। এখন আর কেউ তাঁকে মাওলানা ডাকছে না। সবই বলছে হাফেজ সাব’। সম্বোধনই বলে দিচ্ছে এই লোক কোরান মজিদ কণ্ঠস্থ করেছেন। ইনি সহজ কেউ না। শুনতে আনন্দ লাগছে। আনন্দের সঙ্গে গভীর শঙ্কাও জড়িত। মাওলানা জানেন। ইবলিশ শয়তান এখন সারাক্ষণ তাঁর সঙ্গে থাকবে। তাঁকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করবে। একজন সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেয়ে কোরানে হাফেজকে বিভ্ৰান্ত করায় অনেক লাভ। ইবলিশ প্ৰাণপণে চেষ্টা করে যাবে তাকে দিয়ে মিথ্যা বলাতে। পাপ চিন্তা করাতে। পাপ কাজে যেমন গুনাহ, পাপ চিন্তাতেও একইরকম গুনাহ।
ইবলিশ যে এই বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রসরও হয়েছে সেটাও তিনি বুঝতে পারছেন। কয়েকদিন আগে এশার নামাজ শেষ করে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো বাড়িতে ঢুকেই দেখবেন জুলেখা উঠানে বসে আছে। (চিন্তাটা অবশ্যই ইবলিশ শয়তান তাঁর মাথায় ঢুকিয়েছে। তিনি নিজে কখনো এ ধরনের নাপাকি চিন্তা করবেন না। আস্তাগাফিরুল্লাহ।)
চিন্তাটা সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকে দূর করে দেয়া প্রয়োজন, তা না করে তিনি চিন্তাকে প্রশ্ৰয় দিলেন (আবারো ইবলিশের কাজ)। তিনি কল্পনা করেই যেতে লাগলেন। কী ঘটছে তিনি চোখের সামনে দেখতেও পাচ্ছেন- এই তিনি উঠানে পা দিলেন। জুলেখা জলচৌকিতে বসেছিল। পরনে শাড়ি। মাথায় ঘোমটা নেই। মাথাভর্তি চুল। তাঁকে দেখে লজ্জা পেয়ে জুলেখা উঠে দাঁড়াল।
তিনি বললেন, এখানে কী চাও? তোমাকে না বলেছি। এ বাড়িতে আসবে না? আবার কেন আসছ?
আপনাকে দেখার জন্যে আসছি।
কেন?
আমি যত মন্দই হই, আপনি আমার স্বামী।
এরকম নাপাকি কথা বলব না।
