কেন?
কুন্দন বাই আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। তার হাসি-তামাশা সবই রায়নার ছোটবাবুর সাথে। তাঁকে নিজের হাতে পান বানিয়ে দিচ্ছে। ফরাসীর নল এগিয়ে দিচ্ছে। আমি কেউ না। আমি ছোটবাবুর গোমস্তা।
সুলেমান বলল, আপনার উচিত ছিল উইঠা চাইলা আসা।
শশাংক পাল তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, শোন না ঘটনা। রাত একটার দিকে গানবাজনা কিছু সময়ের জন্যে থামল। রায়নার ছোটবাবু কুন্দন বাইকে একটা আশরাফি নজরানা দিলেন। কুন্দন বাই সালামের পর সালাম দিচ্ছে। আশরাফি পেয়ে তার দিলখোশ। তখন আমি নজরানা দিলাম।
কী দিলেন?
আমি দিলাম। তিনটা আশরাফি।
বলেন কী?
তখন টাকা ছিল, খরচ করেছি। পরে কী হবে চিন্তা করি নাই। তারপরের ঘটনা শোন— রায়নার ছোটবাবুর মুখ হয়ে গেল ছাইবৰ্ণ। তার জন্যে বিরাট অপমান। কুন্দন বাই-এর চোখে পলক পড়ে না। আমাকে বলল, বাবুজি আপকা তারিফ?
তারিফ মানে কী?
তারিফ মানে নাম। আমার নাম জানতে চাইল। নাম বললাম। পরের ঘটনা না বলাই ভালো। রাতে থেকে গেলাম। মধু মধু।
উনি বিরাট শিক্ষার মধ্যে পড়লেন। জন্মের শিক্ষা। জুরিগাড়ি নিয়া চলে গেলেন।
সুলেমান বলল, উচিত শিক্ষা হয়েছে। পাছায় লাখি খাইছে।
শশাংক পাল বললেন, জীবন নিয়া আমার কোনো আফসোস নাই, বুঝেছি। সুলেমান। মধুদিন কাটিয়েছি। এখন সামান্য বেকায়দায় আছি, তবে বেকায়দা যে-কোনো সময় কাটতে পারে। সুতা ভগবানের হাতে। উনি সুতা কীভাবে টান দিবেন। কে জানে। উনার সুতার এক টানে দেবী লক্ষ্মী এসে আমার পাশে বসতে পারেন। পারেন না?
অবশ্যই পারেন।
দেবী লক্ষ্মীর গল্প শুনবা?
শুনব।
লক্ষ্মী এবং তার স্বামী নারায়ণ বৈকুণ্ঠে বসে রসালাপ করছিলেন। এমন সময় তাদের সামনে দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল। সূর্যপুত্র রোবন্ত। লক্ষ্মী তাঁর ঘোড়ার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন। সেই ঘোড়া তো আর তোমার ঘোড়ার মতো মরা ঘোড়া না। স্বর্গের ঘোড়া, নাম উচ্চশ্ৰবা। যাই হোক, নারায়ণ বললেন, লক্ষ্মী, তুমি চোখ বড় বড় করে কী দেখ? লক্ষ্মী ঘোড়া দেখে এতই মাজেছেন যে উত্তর দিলেন না। নারায়ণের উঠল রাগ। উনি বললেন, ঘোড়া দেখে তুমি মজেছ, তোমাকে অভিশাপ দিলাম। তুমি পৃথিবীতে ঘোড়ী হয়ে জন্মাবে। ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গম করবে এবং তোমার একটা ঘোড়াপুত্র হবে।
সুলেমান বলল, সর্বনাশ!
শশাংক পাল বললেন, দেবদেবীদের কাছে এইসব কোনো ব্যাপার না। তারা অভিশাপ দেওয়ার মধ্যেই থাকেন।
লক্ষ্মী কি ঘোড়া হয়ে জন্মেছিলেন?
অবশ্যই। তাঁর একটা ঘোড়াপুত্ৰও হয়েছিল। বিষ্ণুর আশীর্বাদে তার শাপমুক্তি ঘটে। ঘোড়াপুত্র মানুষ হয়। একবীর নামে সে দীর্ঘদিন পৃথিবী শাসন করে। নতুন এক বংশ স্থাপন করে। বংশের নাম ‘হৈহয়’ বংশ।
আজিব ব্যাপার।
দেবতাদের কাছে আজিব কোনো ব্যাপার নাই। তারা যদি ঘোড়া থেকে মানুষ বানাতে পারেন তাহলে আমাকে দুর্দশা থেকে কেন উদ্ধার করতে পারবেন না?
সুলেমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলল, অবশ্যই পারবেন।
নিশিরাতে শশাংক পালের সঙ্গে গল্প করতে সুলেমানের ভালো লাগে। জীবন আনন্দময় মনে হয়।
ভিক্ষুক জীবন যে এত সুখের হবে তা সুলেমানের কল্পনাতেও ছিল না। অল্পদিনেই ঘোড়ার পিঠে ঘুমিয়ে পড়ার দুর্লভ বিদ্যাও সে আয়ত্ত করেছে। ঘণ্টা বাজিয়ে হালকা চালে ঘোড়া চলে, সুলেমান লাগাম ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে শোনে— টুনটুনি টুনটুন। শান্তির আনন্দযাত্রা।
সুলেমান যতটুকু আনন্দে আছে ঠিক ততটাই কষ্টে আছেন মাওলানা ইদরিস। তিনি কষ্টে আছেন দুঃস্বপ্ন দেখে। দুঃস্বপ্নটা তিনি এই নিয়ে তিনবার দেখেছেন। একই স্বপ্ন- ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা। স্বপ্নে হরিচরণ এসে তাকে ডাকেন। মাওলানা আছ? মাওলানা! মাওলানা ব্যস্ত হয়ে বের হন। তখন হরিচরণ বলেন, কাজটা কি ঠিক করেছ মাওলানা? আমি মুসলমান হই নাই। তুমি জানাযা পড়িয়ে আমাকে কবর দিয়ে দিলে। আমাকে দাহ করা উচিত ছিল না?
প্রতিবারই মাওলানা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, ধনু শেখ যেটা বলেছেন। আমি সেটাই বিশ্বাস করেছি। আমি ভেবেছি মৃত্যুর আগে আপনি মুসলমান হয়েছেন।
হরিচরণ বলেন, উঁহু! তুমি বিশ্বাস কর নাই। তুমি আমার লেখা দানপত্রে দস্তখত করেছ। তুমি বিশ্বাস করবে। কেন? তুমি কাজটা করেছ ভয়ে। আমাকে মাটিচাপা দিয়েছ।
এখন কী করব সেটা বলে দেন।
আমার লাশটা কবর থেকে তোল। তারপর দাহ করার ব্যবস্থা কর। মুখাগ্নি তুমিই করবে।
আমি কী করে মুখাগ্নি করব? আমি মাওলানা মানুষ!
জহিরকে খবর দাও। সে আমার পুত্ৰসম। পুত্ৰই মুখাগ্নি করে।
তাকে কই পাব বলেন! সে নিরুদ্দেশ হয়েছে। কেউ তার খোঁজ জানে না।
খোঁজ বের কর। বেশি দেরি করলে মহাবিপদে পড়বা।
কী বিপদ? আমি নিজেই কবর থেকে বের হয়ে পড়ব। তখন বিরাট বিশৃঙ্খলা হবে।
কী বিশৃঙ্খলা?
বের হই, তারপর দেখা কী বিশৃঙ্খলা।
এই পর্যায়ে আতঙ্কে মাওলানার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি জেগে উঠে দেখেন তার বুক ধড়ফড় করছে। সারা শরীর ঘামে ভেজা। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম।
স্বপ্লের বিষয়ে তিনি খান সাহেব ধনু শেখের সঙ্গে আলাপ করলেন। ধনু শেখ অতি বিশিষ্ট ব্যক্তি। লোকজন সবসময় তাকে ঘিরে রাখে। সরাসরি তিনি এখন কারো সঙ্গে কথাও বলেন না। আগে তাঁর মুনসির সঙ্গে কথা বলতে হয়। মুনসির অনুমতি পেলে তবেই খান সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত।
