হুঁ। এই নাম আমার সামনে নিয়েন না। সেই বান্দি প্রথম দেইখা আমারে বলছিল। সেও হরিবাবুরে একই জায়গা দেখেছে। উনি ঘুমের মধ্যে ছিলেন।
শশী মাস্টার বললেন, তোমার স্ত্রীও ধান্ধাই দেখেছে। তোমাকে বলার পর তোমার মন তৈরি ছিল ধান্ধা দেখতে। যথাসময়ে দেখেছি। এই ঘটনা কি তুমি আর কাউকে বলেছ?
মাওলানা সাবরে বলেছি। মাওলানা ইদরিস।
উনি কী বলেছেন?
উনি বলেছেন, দুষ্ট জিনের কাজ।
জিন শুধু শুধু উনাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখবে কেন?
সেটা আমি ক্যামনে বলব? জিনের সাথে তো আমার আলাপ পরিচয় নাই।
শশী মাস্টার বললেন, তুমি এই ঘটনা নিজের মধ্যে রাখবে। কাউরে বলে বেড়াবে না। বলাবলি করলে বিপদ হবে।
কী বিপদ?
দেশের মানুষ অশিক্ষিত। কুসংস্কারে ড়ুবে আছে। ঘটনা জানাজানি হলে সবাই ভাববে হরিবাবু বিরাট আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধুপুরুষ। ঝাড়ফুকের জন্যে দলে দলে লোক আসবে। কবচ দরকার, ঝাড়ফুক দরকার।
সুলেমান বলল, উনার কাছে তো আগে থাইকাই অনেকে যায়। ফুঁ নিতে যায়।
শশী মাস্টার অবাক হয়ে বললেন, কই আমি তো জানি না!
আপনে থাকেন আপনের মতো। জানবেন ক্যামনে? মাস্টার বাবু, উঠি? ঘটনা কাউরে বলতে না করছেন, বলব না।
মাধাই খাল যেখানে বড়গাঙে পড়েছে সেখানে বিশাল এক পারুল গাছ। ফুলগুলি জবার মতো দেখতে, রঙ নীল মেশানো হালকা শাদা। শীতের সময় গাছতলা ফুলে ফুলে ঢেকে থাকে। হরিচরণ গাছের নিচটা বঁধিয়ে দিয়েছেন। শীতের সময় প্রায়ই তিনি বাধানো গাছতলায় এসে বসেন। পারুলের হালকা সুঘ্ৰাণে তার নেশার মতো হয়। মাঝে মাঝে তিনি খাতাপত্র সঙ্গে নিয়ে যান। লেখালেখি করেন। কী মনে করে যেন একটি গ্রন্থ রচনায় হাত দিয়েছেন। গ্রন্থের নাম—- ‘দেবদেবী অভিধান’। গ্রন্থে দেবদেবীর ঠিকুজি কুলিজি লিখছেন। তাদের কর্মকাণ্ডও লিখছেন।
মাঘ মাসের শেষ।
প্ৰচণ্ড শীত ছিল। আজ হঠাৎ ধাপ করে শীত নেমে গেছে। হরিচরণ পারুল গাছের নিচে আয়োজন করে বসেছেন। একটু দূরে কালু মিয়া হাতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। জায়গাটা মোটামুটি জনশূন্য। হরিচরণ লিখছেন—
দেবী লক্ষ্মী
জগত তখনো সৃষ্ট হয় নাই। সনাতন কৃষ্ণের বাম অংশ হইতে এক অপরূপ নারীর সৃষ্টি হইল। তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ এই নারী দ্বাদশ বৰ্ষিয়া বালিকার ন্যায়। মুখমণ্ডল পূৰ্ণচন্দ্ৰ সদৃশ। এই নারীই লক্ষ্মী। তিনি হরিকে স্বামীরূপে কামনা করিলেন। হরি নিজ স্বরূপকে দুই অংশে বিভক্ত করিলেন। এক অংশের নাম চতুৰ্ভুজ নারায়ণ। অপর অংশ দ্বিভূজা কৃষ্ণ। চতুৰ্ভুজ নারায়ণ লক্ষ্মীকে পত্নীরূপে গ্রহণপূর্বক বৈকুণ্ঠে স্থায়ী সংসার গড়িলেন। দেবী লক্ষ্মী স্বৰ্গলক্ষ্মী হিসেবে অবস্থান করেন স্বর্গে, আবার একই সঙ্গে যোগমহিমায় গৃহলক্ষ্মী হিসেবে অবস্থান করেন মানুষের গৃহে গৃহে।
দেবী রাধা
সনাতন কৃষ্ণের ডান অংশ হইতে সৃষ্ট হইলেন অপরূপা রাধা। তিনিও লক্ষ্মীর ন্যায় হরিকে স্বামীরূপে প্রার্থনা করিলেন। হরির যে অংশ দ্বিভূজ কৃষ্ণ সেই অংশ রাধাকে লীলাসঙ্গীনি হিসেবে গ্রহণ করিয়া গোলকবিহারী হইলেন।
হরিচরণের লেখায় বাধা পড়ল। জেলেপাড়ার মুকুন্দ তার ছেলেকে নিয়ে এসেছে। ছেলের প্রচণ্ড জ্বর। মুকুন্দ ভীতগলায় ডাকল, কর্তা!
হরিচরণ বললেন, তোর খবর কিরে মুকুন্দ? আছিস কেমন?
মুকুন্দ বলল, কর্তা আছি ভালা। পুলাটার বেজায় জ্বর। আপনের কাছে নিয়া আসছি।
আমার কাছে কেন? সতীশ কবিরাজের কাছে নিয়া যা।
আপনে কপালে হাত দিলেই জ্বর। কমবে। ডাক্তার-কবিরাজ লাগব না।
হরিচরণ বললেন, আমি কপালে হাত দিলে জ্বর কমবে কেন?
মুকুন্দ বলল, ভগবান আপনেরে এই ক্ষমতা দিছে। কেন দিছে সেইটা উনার বিষয়। পুলাটার কপালে হাত দেন কর্তা। জুরে শইল পুইড়া যাইতেছে।
হরিচরণ মুকুন্দের জুরতপ্ত পুত্রের মাথায় হাত রেখে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘসময় একমনে পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করলেন। এবং একসময় বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলেন— মুকুন্দের পুত্রের কপালে ঘাম হচ্ছে, জ্বর ছেড়ে দিচ্ছে। এই ঘটনা কেন ঘটছে তার কোনো ব্যাখ্যা তার কাছে নেই। একটাই ব্যাখ্যা- জগত অতি রহস্যময়।
কর্তা!
বল মুকুন্দ।
পুলার জ্বর নাই। শইল পানির মতো ঠাণ্ডা।
হুঁ।
আইজ নাও নিয়া হাওরে মাছ ধরতে যাব। পরথম মাছ যেটা পাব সেটা আপনের জন্যে।
আমার জন্যে মাছ আনতে হবে না। আমি মাছ মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।
আপনে মাছ খান না-খান আপনের জন্যে নিয়া আসব। আপনের নামে মানত করেছি। মাছ একখান যে উঠব।
হরিচরণ লেখায় মন দিলেন। মুকুন্দের খেজুরে আলাপ ভালো লাগছে না। মুকুন্দ যাচ্ছে না। ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছে। পিতা-পুত্র মুগ্ধ হয়ে হরিচরণকে দেখছে।
হরিচরণ বললেন, বসে আছিস কেন চলে যা। ছেলেটার গায়ে রোদ লাগাচ্ছিাস, আবার জ্বর আসবে।
মুকুন্দ তৃপ্তির গলায় বলল, আসলে আসব। আমরার কবিরাজ এইখানে বসা। কর্তা, আমার পুলা একটা হপন দেখছে। হপন শুনলে আপনে হাসতে হাসতে পেট ফাইট্টা মরবেন।
কী স্বপ্ন?
হাপনে দেখছে হে হাতিতে চইড়া বিয়া করতে যাইতেছে। হা হা হা।
হরিচরণ মাহুত কালুকে ডেকে বললেন, মুকুন্দের ছেলেটাকে হাতিতে করে বাড়িতে দিয়ে আস।
মুকুন্দের মুখ হা হয়ে গেল।
আধমান ওজনের দর্শনীয় এক বোয়াল মাছ মুকুন্দ পৌঁছে দিয়েছে। সেই মাছ রান্না হচ্ছে। রান্না করছে। হাতির মাহুত কালু মিয়া। বিশেষ বিশেষ রান্নায় সে পারদশী। বড় বোয়াল রান্না করা জটিল ব্যাপার। সামান্য নাড়াচাড়াতেই পেটি ভেঙে যেতে পারে। পেটি ভাঙা মানেই মাছ নষ্ট।
