ধনু শেখ পালঙ্ক থেকে নামছে। চাদর গায়ে দিচ্ছে। কমলা ভীত গলায় বলল, আপনে যান কই?
ঐ বলদ পুলারে আনতে যাই। আইজ রাইতের মধ্যে যদি তারে না। আনছি, ঘুংঘুর পরাইয়া না নাচাইছি তাইলে আমার নাম ধনু শেখ না। আমার নাম কুত্তা শেখ।
কমলা ক্ষীণস্বরে বলল, সকালে যান।
ধনু শেখ বলল, মাগি চুপ! আমি এখনই যাব। ঐ পুলারে আইন্যা মাওলানা ডাকায়া শাদি করব। সে-ই হইব তোর আসল সতিন।
পুরুষের সাথে পুরুষের বিবাহ হয়?
টাকা থাকলে সবই হয়।
ধনু শেখ দুর্যোগের রাতেই বের হয়ে গেল। পথে কালী মন্দির পড়ল। বাজারের কালী মন্দির। ধনু শেখ কালীমূর্তির মাথা ভেঙে ফেলল। গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাওয়ার সময় কোনো মুসলমান যদি হিন্দু মন্দিরের কোনো ক্ষতি করে তাহলে বিনা ঝামেলায় কাৰ্য সমাধা হয়। এই ছিল তখনকার লোকজ বিশ্বাস।
শশী মাস্টার
শশী মাস্টার মাছ মারার কনুই জাল নিয়ে বের হয়েছেন। জাল ফেলার কৌশল তার এখনো রপ্ত হয় নি। জালের মুখ গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়ার কথা। তা হচ্ছে না, জাল জড়িয়ে যাচ্ছে। শশী মাস্টারের জেদ চেপে গেছে, তিনি জাল ফেলেই যাচ্ছেন। পুরো কর্মকাণ্ড হচ্ছে শুকনায়, পানিতে না। শশী মাস্টারের কাজ আগ্ৰহ নিয়ে দেখছে সুলেমান। সে মাস্টারকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসে ফেসে গেছে। শুকনায় জাল ফেলার দৃশ্যে সে অভিভূত।
শশী মাস্টার বললেন, তুমি আমাকে কিছু বলতে এসেছ?
সুলেমান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। শশী মাস্টার বললেন, বলে ফেলো। কাজের সময় কেউ হা করে তাকিয়ে থাকলে ভালো লাগে না।
আপনার কাজ শেষ করেন, তারপর বলি। অপেক্ষা করি।
শশী মাস্টার জবাব দিলেন না। জাল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। জালের একটা অংশ হাতের কনুইয়ে জড়িয়ে রাখতে হয় বলেই এর নাম কনুই জাল। জাল ছুঁড়ে মারার সময় বিশেষ এক মুহুর্তে কনুই নামিয়ে দিতে হয়। সেই বিশেষ মুহূর্ত বের করা যাচ্ছে না বলেই বিপত্তি।
সুলেমান বলল, আমি দেখায়া দেই?
শশী মাস্টার বললেন, না। কৌশলটা আমি নিজে নিজে বের করব। তুমি কী বলতে এসেছি বলে চলে যাও। হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে না। কোনো উপদেশ বা পরামর্শের জন্যে এসে থাকলে ‘নো’। আমি উপদেশ দেই না, পরামর্শও দেই না।
সুলেমান বলল, উপদেশ পরামর্শ না। আমি একটা আচানক জিনিস দেখছি। সেই বিষয়ে আপনারে বলতে চাই।
আমাকে বলে লাভ কী?
আপনি জ্ঞানী মানুষ। আচানক জিনিস ক্যান দেখলাম। আপনি বলতে পারবেন। আমি একজন মানুষরে শূন্যে ভাসতে দেখছি।
শূন্যে ভাসতে দেখেছি?
জে। মাটি থাইকা দুই তিন হাত উপরে সে ভাসতেছে।
শশী মাস্টার বললেন, গাজটা কম খাবে, তাহলে আর এইসব জিনিস দেখবে না। গাজা মনে হয় অতিরিক্ত খাচ্ছি।
মাস্টার বাবু, আমি গাজা খাই না। অনুমতি দেন পুরা ঘটনাটা বলি। মন দিয়া শোনেন।
শশী মাস্টার অনিচ্ছায় রাজি হলেন। বিরক্তিতে তাঁর ভ্ৰ কুঁচকে গেল। অশিক্ষার কারণে এইসব ঘটছে। ভূত-প্ৰেত, শূন্যে ভাসাভাসি, সবকিছুর মূলে অশিক্ষা। শশী মাস্টার সুলেমানের পাশে এসে বসতে বসতে বললেন, ঘটনা বলো। তবে সংক্ষেপে বলবে। ডালপালা দিয়ে বলবে না। আমি বৃক্ষ পছন্দ করি, ডালপালা পছন্দ করি না।
সুলেমানের ঘটনাটা এরকম— কয়েকদিন আগে সে গিয়েছে হরিচরণের বাড়িতে তার ছেলের সন্ধানে। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। মাগরেবের আজান হয় হয়ে গেছে কিংবা এখনি হবে। ছেলেকে সে খুঁজে পেল না। ফিরে আসছে, হঠাৎ চোখ পড়ল। হরিচরণ বাবুর দিকে। তিনি পুকুরের শ্বেতপাথরের ঘাটে কান্ত হয়ে শুয়ে আছেন। মনে হয়। ঘুমাচ্ছেন। ভর সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে থাকা খুব খারাপ, এইজন্যে সে উনাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার জন্যে ঘাটের কাছে গিয়ে থ’ হয়ে গেল। কারণ হরিচরণ শূন্যের উপরে শুয়ে আছেন। শ্বেতপাথরের ঘাট তাঁর দুই তিন হাত নিচে। এই হলো ঘটনা।
শশী মাস্টার বললেন, তুমি কী করলে? তাঁকে ডেকে তুললে?
সুলেমান বলল, আমি কিছুই করলাম না। দৌড় দিয়া পালায়া আসলাম। হারিকেন জ্বালায়া পরে আরেকবার গেছি। দেখি উনিও লণ্ঠন জ্বলায়ে বই श्रएহুঁ0ठgछ्न्म।
তাকে কি তুমি সন্ধ্যার ঘটনা বললে?
জে না।
বললে না কেন?
সাহসে কুলাইল না।
তুমি মদ, ভাং, গাজা, আফিম— এর কিছু খাও?
একবার তো বলছি- না। আমি মুসলমান। আমাদের ধর্মে এইসব খাওয়া নিষেধ আছে।
কোনোদিন খাও নাই?
একবার আফিং খাইছিলাম। পেটে বেদনা হইছিল। কবিরাজ চাচা বললেন, সরিষার দানা পরিমাণ আফিং দুধে দিয়া তিনদিন খাইতে। আমি দুইদিন খাইছি। দুইদিনেই আরাম হইছে।
হরিচরণ বাবু যে শুয়েছিলেন তাঁর গায়ে কি চাদর ছিল?
জে না।
মাথার নিচে বালিশ ছিল?
জে না।
তুমি যা দেখেছ, তার নাম ধান্ধা।
ধান্ধা কেন দেখাব?
ধান্ধা দেখার জিনিস তাই দেখেছি। দুনিয়ায় অনেকেই ধান্ধা দেখে। মরুভূমিতে দেখে মরীচিকা। চারদিকে ধুধু বালি— এর মধ্যে দেখে টলটলা পানি।
সুলেমান বলল, পানি দেখা আর মানুষ শূন্যে ভাসতে দেখা তো এক না।
শশী মাস্টার বললেন, জিনিস একই। তোমার মাথার কিছু দোষ আছে, এইজন্যে শূন্যে ভাসা মানুষ দেখেছ।
আরো একজন দেখেছে। তার মাথায়ও দোষ?
সেই একজন কে?
সুলেমান চাপা গলায় বলল, সে বিরাট পাপিষ্ঠ। তার নাম মুখে আনাও পাপ। একসময় আমার পরিবার ছিল, এখন নটিবাড়ির নটি। তার জন্যে আমার ইজ্জত গেছে। কাউরে মুখ দেখাইতে পারি না।
শশী মাস্টার অবাক হয়ে বললেন, তার নাম কি জুলেখা?
