হরিচরণের বাড়িতেও একজন খেতে বসেছেন। তিনিও খুব আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছেন। তার নাম শশাংক পাল। এই অঞ্চলের প্রাক্তন জমিদার। আজ তার হতদৈন্য দশা। গায়ের কাশ্মীরি শালটা অবশ্যি দামি। শালের নিচে রুপার থালা দুটো দামি। তিনি এসেছেন। থালা দুটা হরিচরণকে দিয়ে কিছু টাকা নিতে। খুব বেশি না, পঞ্চাশটা রুপার টাকা। হরিচরণ থালা রাখেন নি, তবে পঞ্চাশ টাকা দিয়েছেন।
শশাংক পাল বললেন, তোমার ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়েছি। হাতি গর্তে পড়লে সবাই খারাপ ব্যবহার করে, তুমি তা করো নি। মানুষ হিসেবে তুমি উত্তম।
হরিচরণ বললেন, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ক্ষুধার্তা। আপনি কি আমার এখানে খান খাবেন?
শশাংক পাল বললেন, খাব। পোলাও খেতে ইচ্ছা করছে। পোলাও খাব। মুরগির মাংস খাব। ঝাল দিয়ে রাঁধতে বলো। ইদানীং ঝাল ছাড়া মুখে কিছু রুচে না। শরীর পুরোপুরি গেছে। রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। একদিক দিয়ে ভালো। খাওয়া জুটে না।
কলিকাতা চলে যান না কেন? শুনেছি সেখানে আপনার বড় বড় আত্মীয়স্বজন আছে।
ঠিকই শুনেছ। যাই না, ওদের মুখ দেখােব কীভাবে?
আপনার যে অবস্থা, এত কিছু ভাবেন কেন?
তাও ঠিক। মুরগির মাংসের সঙ্গে ডিমের ভুনা করতে বলো। বেশি করে পিয়াজ দিতে বলবে। যখন কষা কষা হবে তখন চায়ের চামচে আধা চামচ চিনি দিবে। ত্রিপুরার মহারাজার পূণ্যার সময় একবার উনার নিমন্ত্রণে ত্রিপুরা গিয়েছি। নীরমহলে দুইরাত থেকেছিলাম। তখন ডিমের এই রান্না খেয়েছি।
আপনার যখন ভালো কিছু খেতে ইচ্ছা করে আমাকে জানাবেন, আমি ব্যবস্থা করব।
বললেই তো ব্যবস্থা করতে পারবে না। ময়ুরের মাংস খেতে ইচ্ছা করে। গৌরীপুরের মহারাজার বাড়িতে খেয়েছিলাম। তিনি ময়ুর আনিয়েছিলেন রাজস্থান থেকে। বাবুর্চিও রাজস্থান থেকে এসেছিল। ময়ূরের মাংস খেয়ে এত আনন্দ পেয়েছিলাম যে বাবুর্চিকে বিশটা রুপার টাকা দিয়েছিলাম।
ময়ূরের মাংস খাওয়াতে পারব না।
পারবা না জানি। কী আর করা। ঘটনা শুনেছি?
কী ঘটনা?
মসজিদের যে মাওলানা তার পাছায় লাথি দিয়ে তাকে অঞ্চল ছাড়ার ব্যবস্থা করেছেন।
কে করেছেন?
তারই স্বজাতি। শাল্লার জমিদার। মাওলানা ধরা খেয়েছে তার স্বজাতির
কাছে।
আপনি মনে হয় খুশি।
শশাংক পাল হাই তুলতে তুলতে বললেন, অবশ্যই আমি খুশি। কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে আমার খুশি লাগে।
হরিচরণ বললেন, মাওলানা ভালো মানুষ। আমি তাকে বিপদে পড়তে দেব না।
শশাংক পাল বললেন, একমাত্ৰ তুমিই এখন তাকে রক্ষা করতে পারবে। তোমার ক্ষমতা আছে। এই দুনিয়ায় ক্ষমতাই সব। জমিদারি কেমন চলছে?
ভালো। আপনার পুরনো কর্মচারীরাই কাজকর্ম দেখছে। তাদের সঙ্গে আছে শশী মাষ্টার।
শশী মাস্টার নাকি পাগল?
ভাবের মধ্যে থাকে, তবে পাগল না।
ভাবের পাগল কিন্তু বড় পাগল, এটা খেয়াল রাখবা।
আচ্ছা খেয়াল রাখব।
খাওয়া শেষ করে শশাংক পাল হরিচরণের বৈঠকখানাতে শুয়ে পড়লেন। তার হাঁপানির টান উঠেছে। এই অবস্থায় হেঁটে কোথাও যাওয়া সম্ভব না।
শশাংক পাল আধশোয়া হয়ে পালংকে বসে আছেন। তাঁর মুখভর্তি পান। ঠোঁট বেয়ে পানের রস গড়াচ্ছে। এদিকে তার খেয়াল নেই। হরিচরণ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
শশাংক পাল বললেন, তুমি কি জোড়াসাঁকোর রবি ঠাকুরের নাম শুনেছ?
শুনেছি।
গান লেখে, গান গায়। তার গান জোড়াসাঁকোর বাড়িতে শুনেছি, মধুর গলা।
তার কথা হঠাৎ উঠল। কেন?
উনি বিরাট পুরস্কার পেয়েছেন। নোবেল পুরস্কার। তার অবস্থা দেখ। আর আমার অবস্থা দেখ। গান-কবিতা আমিও লিখতাম। ট্রাংকভর্তি লেখা ছিল। সবই নিয়তি।
সময় ১৯১৩ সন। ঔপন্যাসিক টমাস হার্ডি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবেন এই বিষয়ে সবাই যখন নিশ্চিত তখন হঠাৎ নোবেল কমিটি মত পাল্টালেন। বাংলাভাষী এক কবিকে এই পুরস্কার দিয়ে দিলেন।
উকিল মুনসি
মোহনগঞ্জের বরান্তর গ্রামের মসজিদের ইমাম আব্দুল হক আকন্দ এসেছেন বান্ধবপুরে। যেহেতু ইমাম মানুষ, লোকজনের কাছে তাঁর পরিচয় মুনসি। মুনসি সাহেবের ডাকনাম উকিল। বাবা-মা’র আশা ছিল এই ছেলে বড় হয়ে উকিল হবে। সেই থেকে তাঁর পরিচয় উকিল মুনসি। বড়ই আশ্চর্যের কথা, মুনসি মানুষ হয়েও তিনি গানবাজনা করেন। লোকজন তাঁর গানবাজনা খুব যে মন্দ চোখে দেখে তা-না। তখনকার মুসলিম সমাজে উগ্রতা ছিল না। মসজিদের ইমাম সাহেব ঢোল বাজিয়ে গান করছেন, বিষয়টাতে অন্যায় কেউ খুজে পায় নি। বরং তাঁর গান লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
মাওলানা ইদরিস উকিল মুনসির আগমনের খবর পেয়ে নদীর ঘাটে গেছেন। আদর করে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসবেন। উকিল মুনসি বরান্তর মসজিদের ইমাম। তিনি নিজেও ইমাম। একজন ইমাম থাকবেন। আরেকজন ইমামের কাছে। এইটাই সহবন্ত।
বড়গাঙের বাজারের ঘাটে উকিল মুনসির নৌকা বাধা। নৌকার ছই সবুজ শাড়ি দিয়ে ঘেরাটোপ দেয়া। তার ভেতর বসে আছেন ‘লাবুসের মা’।
তিনি লাবুস নামের কারো মা না। তাঁর নামই লাবুসের মা। তিনি উকিল মুনসির স্ত্রী। জনশ্রুতি- লাবুসের মায়ের মতো রূপবতী কন্যা অতীতে কখনো জন্মায় নি। ভবিষ্যতেও জন্মাবে না।
লাবুসের মা’র জন্ম ভাটি অঞ্চলের জালালপুরে। একবার মাত্র এই মেয়েকে চোখের দেখা দেখে উকিল মুনসি আধাপাগল হয়ে যান। প্রথম গান লেখেন—
ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে
সোনার জালালপুর
সেইখানে বসত করে
লাবুসের মা
উকিলের মনচোর।
