জি, জনাব।
নানান জায়গায় হিন্দু মুসলিম হাঙ্গামা হুজ্জত হচ্ছে। আমি আমার অঞ্চলে এটা হতে দেব না। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব এই বিষয়ে আমাকে পত্র দিয়েছেন।
জনাব, আমাদের কাঁধের দুই ফেরেশতা কেরামন কাতেমিন সাক্ষী, আমি কিছুই করি নাই।
আপনি দুই ফেরেশতাকে সাক্ষী মেনেছেন। খুবই ভালো কথা। এরা কোর্টে উকিলের জেরার জবাব দিবে না। এটা বোঝার মতো বুদ্ধি কি আপনার আছে? আমার তো মনে হয় নাই। আচ্ছা এখন বিদায় হন, অনেক কথা বলে ফেলেছি।
মসজিদের কাজ কি তাহলে আর করব না?
না। তবে যদি সব অপরাধ স্বীকার করে সবার কাছে ক্ষমা চান, তাহলে বিবেচনা করে দেখব।
যে অপরাধ করি নাই সেই অপরাধ কীভাবে স্বীকার করব?
আপনি বুরবাক। এখন বিদায় হন। বুরবাকের সাথে কথা বলতে নাই। বুরবাকের সঙ্গে কথা বললে আয়ুক্ষয় হয়।
অনেকদিন এই অঞ্চলে আছি, একটা মায়া পড়ে গেছে।
আপনার অন্তরভর্তি মায়া। এত মায়া নিয়া এক জায়গায় থাকা ঠিক না। বিভিন্ন জায়গায় যান। মায়া দিতে থাকেন। মায়ার চাষ করেন।
মাওলানা চলে এলেন। বাড়িতে না গিয়ে মসজিদের দিকে রওনা হলেন। আজ সারাদিন এবাদত বন্দেগি করবেন। তার ধারণা, নিজের অজান্তে তিনি কোনো একটা অপরাধ করেছেন বলেই আল্লাহপাক তাকে এই শাস্তি দিচ্ছেন। শরীরকে শুদ্ধ রাখার জন্যে কয়েকটা নফল রোজা রাখতে হবে। রোজা শরীর শুদ্ধ রাখার মহৌষধ। শরীর শুদ্ধ হলেই মন শুদ্ধ হবে। নেয়ামত হোসেনের কথা শুনে মন অশান্তও হয়েছে। মনকে শান্ত করতে হবে। রিজিক নিয়ে তিনি বেশি। চিন্তা করছেন আল্লাহপাকের উপর ভরসা করছেন না,- এটা একটা নাফরমানি। তিনি যে ব্যবস্থা করে রেখেছেন তাই হবে। তাঁর সমস্ত সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হবে। এর নাম ঈমান।
মসজিদের বারান্দায় সুলেমানের ছেলেটা বসে আছে। তার চোখেমুখে দিশাহারা ভাব। দূর থেকে দেখেই মনে হচ্ছে, সে বড় কোনো সমস্যায় পড়েছে।
মাওলানা বললেন, তোর কী হয়েছে?
ছেলে জবাব দিল না। অন্যদিকে তাকিয়ে বসে রইল। তার চোখমুখ কঠিন।
মাওলানা বললেন, আমারে কিছু বলবি?
জহির উঠে চলে গেল। ছেলেটা অল্প সময়ে কয়েকটা বেআদবি করে ফেলেছে। মুরুব্বি মানুষকে দেখেও সালাম দেয় নাই। প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উঠে চলে গেছে। মাওলানার উচিত রাগ করা, তিনি রাগ করতে পারছেন না। মানসিক কষ্টের সময় মানুষ ভুলভ্রান্তি করে। সেই ভুলভ্রাত্তি ক্ষমার চোখে দেখতে হয়। সুলেমান দ্বিতীয়বার বিবাহ করেছে। সেই কারণেই হয়তো ছেলেটা কষ্টে আছে।
মাগরেব এবং এশার নামাজ শেষ করে মাওলানা বাড়ি ফিরে গেলেন। সঙ্গে টর্চ ছিল না, তাতে সমস্যা হলো না। ফকফকা চান্নি। জঙ্গলের মাথার উপর বিশাল চাদ। পূর্ণিমার রাতে জিন ভুত থাকে না। ওদের কর্মকাণ্ড অমাবশ্যায়। চাঁদের হিসাবে তাদের চলাচল। তারপরেও মাওলানা আয়াতুল কুরাসি পড়তে পড়তে এগুচ্ছেন। বেতঝোপের পাশে তাঁর গা ছমছম করতে লাগল। এই জায়গাটা সবচে’ খারাপ। এখান থেকে নদীর পাড়ের শ্মশানঘাট দেখা যায়। শ্মশানঘাটে প্রতিদিনই একটা দুটা মারা পোড়ানো হয়। মাংসপোড়া গন্ধ এবং কাঠকয়লার গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকে, শরীর গুলায়। আজও মরা পোড়ানো হচ্ছে। তবে মরা পোড়ানোর গন্ধ আসছে না। উত্ত্বরে বাতাস বইতে শুরু করেছে। গন্ধ ভেসে যাচ্ছে দক্ষিণে।
মাওলানা বাড়ি ফিরে অবাক হলেন। উঠানে জহির বসে আছে। তার সঙ্গে টিনের ট্রাংক। সে বসে আছে ট্রাংকের উপর। তার গায়ে চাঁদের আলো পড়েছে। টিনের ট্রাংকটা নতুন। চাঁদের আলোতে ট্রাংক ঝলমল করছে। মাওলানা বললেন, তোর ঘটনা কী?
জহির অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, আইজ থাইক্যা আপনার লগে থাকব।
মাওলানা বললেন, তুই যে এইখানে তোর বাপ জানে?
জহির হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
দুপুরে খাওয়া দাওয়া হইছে?
জহির জবাব দিল না।
মাওলানা বললেন, আয় খাওয়া খাদ্যের ব্যবস্থা করি। বেগুন পুড়া, ডাইল ভাত চলিব?
হুঁ।
ঘরে ডিমের সালুন আছে। ডিমের সালুন খাইতে চাস?
হুঁ।
মাওলানা রাঁধতে বসলেন। জহির তার সামনে বসে আছে। তার বসে থাকার ভঙ্গিতেই মনে হচ্ছে সে ক্ষুধায় কাতর। রান্না শেষ না হওয়া পর্যন্ত গল্পগুজব করে ছেলেটাকে ভুলিয়ে রাখতে হবে।
নতুন মা’র নাম কী?
হালিমা।
বড়ই ভালো নাম। নেক নাম। বিবি হালিমার নাম শুনছস?
না।
কস কিরে পুলা? বিবি হালিমা নবিজির দুধমা। হারিস হইল। উনার দুধ পিতা। স্মরণে রাখিস।
হুঁ।
তোর নতুন মা তোরে কষ্ট দেয় না-কি রে?
না।
মারধোর করে?
না।
তাইলে তুই আমার কাছে থাকতে আসছস, ঘটনা কী?
জহির জবাব দিল না। মাওলানা বললেন, আমার এই বাড়ি খারাপ। জিনের আনাগোনা। আপনাআপনি জানালা বন্ধ হয়, জানালা খুলে। গাছের ডাল নড়ে। তুই ভয়ে মইরা যাবি।
জহির মাথা নিচু করে হাসছে।
মাওলানা অবাক হয়ে বললেন, হাসছ কেন?
জহির বলল, আপনের বাড়িত বান্দর আছে। বান্দরে ত্যক্ত করে।
তুই জানস ক্যামনে?
আমি দেখছি। বান্দরে জানালা টানাটানি করে। দুইটা বান্দর।
মাওলানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বাড়িতে জিন ভূতের এত সহজ ব্যাখ্যা তার মাথায় আসে নি।
পুলা, তোর বুদ্ধি তো ভালো।
জহির মাথা নিচু করে হাসল।
হাত-মুখ ধুইয়া আয়। খানা হইছে।
জহির অতি দ্রুত খাচ্ছে। মাওলানা খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছেন। ক্ষুধার্ত একটি শিশু আগ্রহ করে খাচ্ছে, এরচে’ সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে কি আছে?
