বানর গল্পের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে ডাক্তার দ্বিতীয় গল্প শুরু করল। পুতুল। এই গল্পটিও চোখ বড় বড় করে শুনল এবং এক সময় হেসে উঠল খিলখিল করে।
ডাক্তার বানর বিষয়ক তৃতীয় গল্প খুঁজতে শুরু করল। তেমন কোন গল্প মনে পড়ছে না। এই মেয়েটি বানর ছাড়া অন্য কোন গল্পে হাসবে কি না তাও বোঝা যাচ্ছে না। রিক্সাটা নেয়া ঠিক হবে না। বানর সংক্রান্ত গল্পই মনে করতে হবে। ডাক্তারের ধারণা মেয়েদের ব্রেইন Unidirectional. যে মেয়ে বানর সংক্রান্ত রসিকতায় হাসে সে অন্য রসিকতায় হাসবে না। তাকে বানর বিষয়ক গল্পই বলতে হবে। অন্য গল্প না। নারী জাতি খুব প্রবলেমের জাতি। এক চক্ষু হরিণীর মত।
নাস্তার টেবিলে
নাস্তার টেবিলে সোবাহান সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, ফরিদ তুমি যাওনি, ফরিদ তার চেয়েও বিস্মিত হয়ে বলল, কোথায় যাব?
তুমি বলেছিলে— এ বাড়িতে থাকবে না।
ফরিদ টোস্টে মাখন লাগাতে লাগাতে বলল, ভালমত চিন্তা করে দেখলাম- হুট করে কোন ডিসিসান নেয়া উচিত না।
তাহলে মিথ্যা কথা বললে কেন?
মিথ্যা কখন বলালাম?
গত রাতেই তো বললে।
বলেছি ভাল করেছি। এই নিয়ে আপনি দায়া করে এখন ক্যাট ক্যাট করবেন না। এমিতেই রাতে ভাল ঘুম হয়নি।
ফরিদ তার নাশতার প্লেট নিয়ে নিজের ঘর চলে গেল।
সোবাহান সাহেব, এমদাদ খোন্দকারের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেশটা নষ্ট হচ্ছে কেন জানেন?
দেশ নষ্ট হচ্ছে কি হচ্ছে না। এই নিয়ে এমন্দাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। এমদাদ এই মুহুর্তে রুটিতে পুরু করে মাখন লাগাতে ব্যস্ত। দেশ সম্পর্কে ভাববার ফুসরত কোথায়?
এমদাদ বলল, আমাকে কিছু বললেন?
হ্যাঁ। দেশটা কেন নষ্ট জানেন?
জ্বি না।
জানতে হবে। এসব নিয়ে ভাবতে হবে। শুধু মাখন দিয়ে রুটি খেলে হবে না।
অবশ্যই। অবশ্যই ভাবতে হবে।
সোবাহান সাহেব কঠিন গলায় বললেন, দেশটা নষ্ট হবার মূল কারণ হল আমাদের মিথ্যা বলার প্রবণতা।
তাতো ঠিকই বলেছেন জনাব। একবারে ঠিক।
জাতি হিসেবেই আমরা মিথ্যাবাদী।
অবশ্যই।
আমরা প্ৰতিজ্ঞা করি প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গার জন্যে।
আসল কথা বলেছেন। লাখ কথার এক কথা।
এমদাদ, সোবাহান সাহেবের প্রতিটি কথায় একমত হতে লাগল। সে সাধারণত করো কোন কথাতেই দ্বিমত পোষণ করে না। এমদাদ তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় লক্ষ্য করেছে যে মানুষের সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রাখার একটা পথ হচ্ছে সব কথায় একমত হওয়া।
এমদাদ সাহেব?
জ্বি।
সত্যি কথা বলার প্রবণতা যদি আমাদের মধ্যে বৃদ্ধি পায় তাহালে কিন্তু সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
অবশ্যই হয়।
মিথ্যা, মিথ্যা, মিথ্যা। চারদিকে শুধু মিথ্যা। এটা দূর করতে হবে।
সত্যবাদী জাতি হিসেবে আমরা যদি নিজেদের প্রমাণ করতে পারি। তাহলে অবস্থাটা কি হবে আপনি কি চিন্তা করে দেখেছেন এমদাদ সাহেব?
জ্বি না।
আমার গা শিউরে উঠছে। পৃথিবীর লোক জানবে বাঙালি মিথ্যা বলে না। বাঙালি সত্যবাদী। আমাদের আসনটা কি রকম হবে চিন্তা করুন। কত সম্মান কর…
সোবাহান সাহেব আবেগে আপুত হয়ে কথা শেষ করতে পারলেন না। বাঙ্গালী জাতিকে সত্যবাদী কি করে করা যায়। তাই নিয়ে ভাবতে লাগলেন। গাঢ় স্বরে বললেন, এমদাদ সাহেব?
জি।
জিনিসটা নিয়ে ভাবতে হবে।
অবশ্যই হবে।
চা শেষ না করেই সোবাহান সাহেব উঠে পড়লেন। ক্ষুধা অবশ্যই একটি ভয়াবহ ব্যাপার। তবে তারো আগে হচ্ছে সত্যবাদিতা। একটি সত্যবাদী জাতি নিশ্চয়ই ক্ষুধায় কষ্ট পাবে না।
এমদাদ নাশতার টেবিলে একা বসে রইল। তার জন্যে ভালই হল। একা থাকলে ইচ্ছামত খাওয়া দাওয়া করা যায়। একটা ডিমের জায়গায় দুটা ডিম নিলে কেউ বলবে না- এই বয়সে দুটা ডিম খাওয়া ঠিক না। কোলেস্টরল নাকি যেন ঝামেলা হয়। ডাক্তার ছোকরা বলছিল। আরে বাবা আল্লাহতালা তাহলে ডিম দিয়েছেন কি জন্যে? খাওয়ার জন্যেই তো। আল্লাহতালা তো না ভেবে চিন্তে কিছু দেন নাই। তিনি না ভেবে চিন্তে কিছু করবেন তা— কি হয়?
মিলি এসে বলল, বাবার কি নাশতা খাওয়া শেষ হয়ে গেল চাচা?
হ্যাঁ মা।
চা-তো শেষ করেননি।
সুখি মানুষ। মাথার মধ্যে হঠাৎ একটা চিন্তা এসে গেল— খাওয়া দাওয়া বন্ধ।
মিলি চিন্তিত গলায় বলল, আবার কি চিন্তা?
মিলি চিন্তিত মুখে বাবার ঘরের দিকে এগুলো।
এমদাদ প্লেটে পড়ে থাকা তৃতীয় ডিমটিও নিয়ে নিল। দুটা খাওয়া গেলে তিনটিও খাওয়া যায়। যাহা বাহান্ন তাহা পয়ষট্টি। এমন্দাদের মনও আজ খুব প্ৰসন্ন। কোন প্ৰসন্ন নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না। পুতুলের কাছ থেকে গত রাতের বর্ণনা শোনার পর থেকেই মনটা দ্রবীভূত অবস্থায় আছে। নতুন আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। আশার আলো ডাক্তার ছোকরা প্রসঙ্গে। চেষ্টা চরিত্র করে পুতুলের সঙ্গে এই ছোকরাকে গেথে ফেলা খুব কি অসম্ভব? এই জগতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। এই জগতে সবই সম্ভব। চেষ্টা চালাতে হবে। চেষ্টা।
সোবাহান সাহেব সত্য দিবস বিষয়ে চিন্তা করছেন। তাঁর চিন্তার সূত্রগুলো এখনো স্পষ্ট নয়। তবু তিনি যা ভাবছেন তা হচ্ছে সপ্তাহের একটি দিনকে কি সত্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করা যায় না? যেমন মঙ্গলবার, কিংবা বুধবার। এই দিনে কেউ মিথ্যা কথা বলবেন না। সবাই সত্য কথা বলবে। সব বড় বড় কাজ ঐ দিনটির জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। প্রয়োজনে এই দিন আরো বড় করে পৃথিবীময় ছড়িয়ে দেয়া যায়। যেমন বিশ্ব স্বাক্ষরতা দিবস, বিশ্ব শিশু দিবস ঠিক এই রকম হবে বিশ্ব সত্য দিবস। এই দিনে পৃথিবীর সব মানুষ সূর্যোদয় থেকে সূর্যস্ত পর্যন্ত শুধুই সত্যি কথা বলবে।
