মিলি ঘরে ঢুকে বলল, বাবা তুমি চা না খেয়েই চলে এসেছ?
টেবিলের উপর রাখ মা, খাব।
নতুন কিছু নিয়ে ভাবা শুরু করেছ?
হুঁ। সত্য দিবস।
ভাল।
না শুনেই বলে ফেললি ভাল? আগে জিনিসটা কি জানিবি তারপর বলবি ভাল। বোস- বুঝিয়ে বলছি।
আজ আমার সময় নেই বাবা। অন্য একদিন শুনব।
সেটাও মন্দ না। আমি নিজেও এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হইনি। প্রচুর ভাবনা চিন্তা করতে হবে। দেশটা পড়ে গেছে মিথ্যার খপ্পরে। সত্য। আজ নির্বাসিত। সেই নির্বাসিত সত্যকে প্ৰতিষ্ঠা করতে হবে।
চা খাও বাবা। চা ঠাণ্ডা হচ্ছে।
দেশটাই ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে মা। আর চা। আগে দেশটাকে আমাদের চাঙ্গা করতে হবে। দেশটা চলে গেছে কোন্ড ষ্টোরেজে। সেখান থেকে দেশটাকে বের করে তাকে গরম করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সত্যকে। একবার সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে আর চিন্তা নেই। আচ্ছা আনিস ছোকরা কি ফিরেছে? ওর সঙ্গে কথা বলা দরকার।
জ্বি বাবা উনি ফিরেছেন। ডেকে দেব?
না থাক। আমি চিন্তাগুলো আরো গুছিয়ে নেই। এখনো সব এলোমেলো আছে। তুই কাজে যা। তোকে দেখে এখন কেন জানি রাগ লাগছে।
মিলি শুকনো মুখে বাবার ঘর থেকে বের হল। তার নিজের শরীরটা ভাল নেই। জুর জুর লাগছে। বাবার বকবকানি শুনতে একটুও ভাল লাগছে না।
সোবাহান সাহেব সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাবলেন। মাগরেবের নামাজের পর পারিবারিক সভা ডাকলেন। তিনি একটা স্থির সিদ্ধান্তে এসেছেন। এই সিদ্ধান্তের কথা পারিবারিক সভাতে জানানোই ভাল।
পারিবারিক সভাগুলো সাধারণত রাতের খাবারের পর হয়। এটা জরুরি সভা বলে আগেই শুরু হল। সভার শেষে রাতের খাওয়া হবে।
বসার ঘরে সভা বসছে। পারিবারিক সদস্যদের বাইরেও কিছু মানুষজন আছে যেমন এমদাদ ও তার নাতনী। আনিসের পুত্ৰ কন্য। আনিস আসেনি তার মাথা ধরেছে। সভার শুরুতে উপস্থিত সদস্যদের দস্তখত নেয়া হল। যে কোন পারিবারিক সভার এই অংশটি রহিমার মার খুব পছন্দ। আগে সে টিপ সই দিত। এখন দস্তখত দেয়। দস্তখত দেয়া নতুন শিখেছে। দস্তখত দিতে তার বড় ভাল লাগে।
পারিবারিক সভার প্রসিডিংস সাধারণ লিখে মিলি। আজ বিলু লিখছে। কে কি বলছে, কি আলোচনা হচ্ছে সবই লিখিতভাবে থাকার কথা। তা সব সময় সম্ভব হয় না। বিলু মিলির মত দ্রুত লিখতে পারে না।
সভার শুরুতে সোবাহান সাহেব পুরো ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করলেন। তিনি মনে করেন। সপ্তাহে অন্তত একটি দিন সত্যি কথা বলার চেষ্টা আমাদের থাকা উচিত ইত্যাদি…। তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতার পর তিনি এই প্রসঙ্গে অন্যদের মতামত চাইলেন। কারো কিছু বলার থাকলে সে বলতে পারে। তবে বলার আগে হাত তুলতে হবে। প্রস্তাবের পক্ষে হলে ডান হাতু। প্রস্তাবের বিপক্ষে হলে বা হাত।
সোবাহান সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে লক্ষ্য করলেন ফরিদ দুহাত তুলে বসে আছে। সোবাহান সাহেব বললেন, তুমি কিছু বলতে চাও?
জি।
প্রস্তাবের পক্ষে না বিপক্ষে।
দুটোই।
তার মানে? রসিকতা করছি না-কি?
ফরিদ গম্ভীর গলায় বলল, আপনার সাথে রসিকতা করার অধিকার আমার আছে। সম্পর্ক সেই রকম। তবে আজ আমি আপনার প্রস্তাব একই সঙ্গে সমর্থন করছি আবার করছি না।
তার মানেটা কি?
সত্য দিবসে আমরা যেমন সত্য কথা বলব মিথ্যা দিবসে আমরা তেমনি শুধু মিথ্যা কথা বলব। সূর্যোদয় থেকে সূর্যস্ত পর্যন্ত শুধুই মিথ্যা। ঘরে মিথ্যা বলব, বাইরে মিথ্যা বলব, এমনকি সেদিন যদি মসজিদে যাই সেখানেও মিথ্যা বলব।
সোবাহান সাহেব অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ফরিদ সেই অগ্নিদৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, সমস্ত দিন মিথ্যা কথা বলার ফল কি হবে সেটাও বলে দিচ্ছি মিথ্যা কথা বলতে ইচ্ছা করবে না। পারিবারিক পর্যায়ে যেমন মিথ্যা। দিবস থাকবে তেমনি জাতীয় পর্যায়েও মিথ্যা দিবস থাকবে। সেই দিন দেশের সবচে বড় মিথ্যাবাদীকে আমরা পুরস্কার দেব। উপাধিও দেয়া হবে। যেমন – মিথ্যা শ্রেষ্ঠ। কিংবা জাতীয় মিথ্যুক।
চুপ কর।
চুপ করব কেন? পারিবারিক সভায় আমার কথা বলার পুরো অধিকার আছে। আমি অবশ্যই কথা বলতে পারি। হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম- দেশে একট মিথ্যা একাডেমী স্থাপিত হবে। সেই একাডেমীর কাজ হবে জাতীয় পর্যায়ের মিথু্যকরা কে কি ভাবে মিথ্যা বলছেন তার একটা রেকর্ড রাখা। উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিচ্ছি। ধরুন। এক নেতা পত্রিকায় একটা বিবৃতি দিলেন। দুদিন পর সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা বিবৃতি দিলেন। একাডেমীর কাজ হবে এই সব লক্ষ্য রাখা। এবং প্রয়োজনবোধে বাংলা একাডেমী পুরস্কারের মত মিথ্যা একাডেমী পুরস্কার প্রচলন করা যেতে পারে। এই মুহুর্তে একজনের নাম প্রকাশ করতে পারি যিনি সাধারণত মসজিদে মিথ্যা বলেন। সেই মিথ্যা ফলাও করে রেডিও টিভিতে প্রচার করা হয়।
সোবাহান সাহেব রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, তোমার বক্তব্য শেষ হয়েছে?
জ্বি না। আমার আরো কিছু বলার আছে।
তুমি যে একটা গাধা তা কি তোমার জানা আছে?
দুলাভাই পারিবারিক সভায় একজন সদস্যকে গাধা বলাটা ঠিক হচ্ছে না।
অবশ্যই ঠিক হচ্ছে। বিলু তুই লেখ পারিবারিক সভায় ফরিদকে গাধা সাব্যস্ত করা হল। কাজগপত্রে রেকর্ড থাকা দরকার। বিলু বলল, তুমি একা গাধা বললেতো বাবা হবে না। সবাইকে একমত হতে হবে। তাছাড়া আমি নিজে মনে করি মামার আইডিয়ার একটা স্যাটায়ারিক্যাল ভ্যালু আছে।
