স্লামালিকুম মামা।
ওয়ালাইকুম সালাম।
কি করছেন মামা?
তেমন কিছু করছি না। একটু আগে ভয়ঙ্কর কিছু করার ইচ্ছা করছিল এখন করছে না।
ডাক্তারকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফরিদ নিজের ঘরে চলে গেল। ঠাণ্ডা পানিতে ঘাড় ভিজিয়ে নিতে হবে তাতে মূল স্নায়ু শীতল হবে। বেশ খানিকটা ক্যাফিনও শরীরে ঢুকাতে হবে।
এতেও স্নায়ুর উত্তেজনা খানিকটা কমবে। কাদেরকে চায়ের কথা বলা দরকার। চিনি দুধ ছাড়া কড়া চা। প্রচুর ক্যাফিন দরকার। শুধু ক্যাফিনে কাজ হবে না, গানও লাগবে। এসব ক্ষেত্র রবীন্দ্র সংগীত খুব কাজ করে। মেঘের পর মেঘ জিমেছে। এই বিশেষ গানটি রাগ কমানোর ব্যাপারে কোরামিন ইনজেকশনের মত। পরপর দুবার শুনলেই রাগ-জল। আজ ঐ গানটিরও সাহায্য দরকার। আজকের অবস্থা বড়ই খারাপ।
ডাক্তারের ঘুম এখন পুরোপুরি ভেঙেছে।
সে এই মুহূর্তে বড় ধরনের লজ্জাও বোধ করছে। পুরো ব্যাপারটা এখন মনে পড়ছে। ক্ষুধার উপর লেখা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছে। কি অসম্ভব লজ্জার কথা। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। মিলি নিশ্চয়ই ঘটনা শুনেছে। না জানি সে কি ভাবছে। তাকে গাধা ভাবছে নিশ্চয়ই।
রাত এখন প্রায় দেড়টা। এত রাতে চুপচাপ সোফায় শুয়ে থাকা ছাড়া কোন গতি নেই। কিন্তু আবার ক্ষিধেও লেগেছে। ক্ষুধা ব্যাপারটা কত ভয়াবহ তা প্ৰবন্ধ পড়ে ঠিক বোঝা যায় নি— এখন বোঝা যাচ্ছে। তার মনে পড়ল। আজ দুপুরেও তেমন কিছু খাওয়া হয় নি।
ঘুম ভাঙার পর থেকে চোখের সামনে শুধু নানান রকম খাবারে ছবি ভাসছে। এই মুহুর্তে যে ছবিটি ভাসছে সেই ছবিটি বেশ অস্বস্তিকর— বিশাল একটা চিনামটির প্লেট। সেই প্লেটে শিউলি ফুলের মত দেখতে পোলাও। পোলাওয়ের উপর আস্ত একটা ভেড়ার রোস্ট। রোস্টটির বর্ণ সোনালি। এত জিনিস থাকতে চোখের সামনে ভেড়ার রোস্ট ভাসছে কেন সেটা একটা রহস্য। চামড়া ছাড়িয়ে নেবার পর ভেড়া এবং ছাগলে কোন তফাৎ নেই। তবু কেন শুধু ভেড়ার কথা মনে হচ্ছে? রোস্টটাতো ছাগলেরও হতে পারে।
খুট করে শব্দ হল।
ঘরে ঢুকল পুতুল। তার ঘুম আসছিল না। সে এসেছিল পানি খেতে। বসার ঘরে আলো জুলতে দেখে কৌতুহলী হয়ে এসেছে। ডাক্তারকে রাতে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে সে খুবই অবাক হয়েছে। তবে অবাক হওয়াটা সে প্রকাশ হতে দিল না। সহজ স্বরে বলল, স্নামালিকুম।
মনসুর বলল, ওয়ালাইকুম সালাম। ভাল আছ?
এই মেয়েটির সঙ্গে তার অনেকবার দেখা হয়েছে। তবে কখনো তেমন আলাপ হয়নি। মেয়েটা যে এতটা সুন্দর সে আগে লক্ষ্য করেনি। আলাদাভাবে এর নাক মুখ চোখ কোনটাই সুন্দর না। তবু সব কিছু মিলিয়ে মেয়েটাকে দেখতে তো বড় ভাল লাগছে। মনসুর উৎসাহের সঙ্গে বলল, কেমন আছ পুতুল? পুতুল বিস্মিত গলায় বলল,
ভাল।
আমি ক্ষুধা বিষয়ক লেখাটা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ব্যাপারটা খুবই অন্যায় হয়েছে। জেগে দেখি সোফায় শুয়ে আছি- মাথার নিচে বালিশ।
মশার কামড়ে ঘুম ভেঙেছে। আমার মনে হয় ক্ষিধের কারণে। প্ৰচণ্ড ক্ষিধে লেগেছে বুঝলে পুতুল।
পুতুল বলল, আপনি বসুন দেখি ঘরে কি আছে।
তোমার কষ্ট করার দরকার নেই পুতুল। তবে ফ্রীজটা খুলে দেখ। ঠাণ্ডা গরমে কোন অসুবিধা নেই।
আপনি বসুন আমি দেখি—
বাহ মেয়েটার কথা থেকে গ্রাম্য ভাবাটাওতো দূর হয়েছে। মেয়েটাকে বুদ্ধিমতী বলেও মনে হচ্ছে। মনসুরের মনে হল মেয়েটা কোন একটা ব্যবস্থা করবেই। কিছু না পেলে দুটাে ডিম ওমলেট করে নিয়ে আসবে।
মনসুরের চোখে আগের দৃশ্য ফিরে এল। সেই ভেড়ার রোস্ট। তবে তার সঙ্গে নতুন কিছু চিত্র যুক্ত হয়েছে। ভেড়ার রোষ্টের উপর এখন মুরগির রোষ্টও দেখা যাচ্ছে।
আধা ঘণ্টা পর পুতুল এসে বলল, খেতে আসুন।
খাবার ঘরে খাবার দেয়া হয়েছে। ভাত, রুই মাছের তরকারী, উচ্ছে ভাজা, ডাল। সবই গরম। রীতিমত ধোঁয়া উঠছে। একটা প্লেটে পেয়াজ কাচামরিচ দুটুকরা লেবু।
হতভম্ব মনসুর বলল, সব কি এখন রান্না করলে?
পুতুল হাসতে হাসতে বলল, এত অল্প সময়ে বুঝি রান্না করা যায়। সবই ফ্রীজে ছিল। আমি শুধু গরম করেছি। আপনি খেতে বসুন।
পুতুল প্লেটে ভাত উঠিয়ে দিল।
মিলির ঘুম আসছিল না। একটা মানুষ সোফায় শুয়ে আছে। হয়ত বেচারাকে মশারা ইতোমধ্যে খেয়ে ফেলেছে। একজনকে এই অবস্থায় রেখে ঘুমুতে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। সে নিঃশব্দে বসার ঘরে ঢুকল। সেখান থেকে খাবার ঘরে। খাবার ঘরে কি হচ্ছে? মনসুর খাচ্ছে? কে খাওয়াচ্ছে তাকে? তাকে দুজনের কেউ লক্ষ্য করল না। মিলি পর্দার আড়াল থেকে লক্ষ্য করল দুজন কি সুন্দর গল্প করছে। এত খাতির দুজনের মধ্যে? কই এই খাতিরের কথাতো তার জানা ছিল না? আবার হাসির শব্দ আসছে। খিলখিল করে নিশ্চয়ই পুতুল মেয়েটাই হাসছে। রাগে মিলির গা জুলে যেতে লাগল। যদিও সে খুব ভাল করেই জানে রাগ করার কিছুই নেই। কেন সে রাগ করবে? তার রাগ করার কি আছে?
হাসাহাসির কারণ হচ্ছে ঠিক এই সময় ডাক্তার একটা মজার রসিকতা করছিল- রসিকতাটা বানর বিষয়ক। ডাক্তার কখনো রসিকতা করে কাউকে হাসাতে পারে না। এই প্রথম সে একজন গ্ৰাম্য বালিকাকে মুগ্ধ করল— পুতুল হাসতে হাসতে ভেঙে গড়িয়ে পড়ল। কিংবা কে জানে এই গ্ৰাম্য বালিকাটি হয়ত মুগ্ধ হবার অভিনয় করল। ডাক্তার অভিনয় ধরতে পারল না।
পর্দা ধরে ঈর্ষায় নীল হয়ে গেল মিলি। তার ভেতরে এত ঈর্ষা ছিল তাও সে জানতে না। সে যেভাবে এসেছিল সেইভাবে ফিরে গেল। নিজের উপস্থিতি সে কাউকে জানতে দিল না।
