সোবাহান সাহেব বিস্মিত স্বরে বললেন, খুবই আশ্চার্যের ব্যাপার। ফরিদ বলল, দুলাভাই আমার ধারণা আপনার ক্ষুধা বিষয়ক বইটাতে ঘুম উপদ্রোকারী কিছু একটা আছে। আপনি যখন ডাক্তার ব্যাটাকে পড়ে শুনাচ্ছিলেন তখন আমিও দুতিন পৃষ্ঠা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলাম। আমার তিনবার হাই উঠল।
সোবাহান সাহেব কঠিন চোখে তাকালেন, কিছু বললেন না।
ফরিদ বলল, ইনসমনিয়ার ওষুধ হিসেবে এই বই বাজারে ছাড়া যেতে পারে। আমি ঠাট্টা করছি না দুলাভাই। আমি ড্যাম সিরিয়াস।
বিলু বলল, চুপ করতো মামা।
চুপ কর, চুপ কর এই কথা ইদানীং আমাকে খুব বেশি শুনতে হচ্ছে। আমার এটা শুনতে ভাল লাগছে না। সব মানুষেরই কিছু ব্যক্তিগত মতামত থাকতে পারে। এবং সেই মতামত প্ৰকাশের অধিকারও তার থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। দুলাভাইয়ের বইটি পড়ে আমার ঘুম আসছে এটা বলে দুলাভাইয়ের বইয়ের প্রতি আমি কোন অশ্রদ্ধা প্ৰকাশ করছি না। বইটির নতুন একটি ডাইমেনসনের দিকে আমি ইংগীত করছি।
মিনু বললেন, আর একটা কথা বললে এই ভাতের চামচ দিয়ে তোর মাথায় একটা বাড়ি দেব।
তা দাও। তবু আমার কথাটা আমি বলবই। সক্রেটিস ন্যায় কি? এ কথাটা বোঝাতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। তাকে হেমলক নামের তীব্র হলাহল পান করতে হল। আমি ক্ষুধা এবং ঘুমের সম্পর্ক বলতে গিয়ে না হয় চামচের একটা বাড়ি খেলা মই।
সোবাহান সাহেব শান্ত গলায় বললেন, খাওয়া দাওয়ার পর তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে ফরিদ।
ফরিদ বলল, জি আচ্ছা।
কথাগুলো অপ্রিয়। তবু আমি ঠিক করেছি কথাগুলো তোমাকে বলব।
জি আচ্ছা।
আনিস ছোকরা কি এখনো আসে নি?
বিলু বলল, না আসে নি।
কোথায় আছে? কোন খবর পাঠিয়েছে?
না।
ওকে যেন আর এ বাড়িতে ঢুকতে দেয়া না হয়। যে মানুষ তার দুটি বাচ্চা ফেলে উধাও হয়ে যায় তাকে এ বাড়িতে আমি থাকতে দিতে পারি না।
ফরিদ বলল, আপনার এই প্ৰস্তাব আমি সর্বান্তকরণে সমর্থন করছি দুলাভাই।
তোমার সমর্থনের আমি কোন প্রয়োজন বোধ করছি না।
প্রয়োজন বোধ না করলেও সমর্থনা করছি। আপনি বোধহয় জানেন না। দুলাভাই যে সত্য এবং ন্যায়ের পেছনে আমি সদা সর্বদা হিমালয়ের পর্বতের মতাই দাঁড়াই।
তোমার কি খাওয়া শেষ হয়েছে ফরিদ?
জ্বি না। এখন একবাটি ডাল খাব। খাওয়া দাওয়ার পর আমি একবাটি ডাল খাই। ভেজিটেবল প্রোটিন। এটার খুবই দরকার।
ডাল খাওয়া শেষ হবার পর তুমি দয়া করে আমার ঘরে এসো। তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
সোবাহান সাহেব নিতান্তই অনুত্তেজিত স্বরে যেসব কথা বললেন, সেগুলো হচ্ছে, ফরিদ আমার ব্লাড প্রেসার হচ্ছে একশ ষাট বাই পচানব্বই। আমার বয়সে এটাই স্বাভাবিক। কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি তোমার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বললেই আমার ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়।
বাড়ে তা কি জানতে পারি?
এ পর্যন্ত দুবার মেপেছি। দেখেছি উপরেরটা হয় দুশ নিচেরটা একশ দশ।
বলেন কি কোয়ায়েট ইন্টারেস্টিং।
তোমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হতে পারে! আমার কাছে ইন্টারেষ্টিং নয়। আমি চাই তুমি আর কখনো আমার সামনে না। আস।
তা কি করে সম্ভব?
আমার শ্বশুর সাহেব তোমার নামে আলাদা করে কিছু টাকা আমার কাছে গচ্ছিত রেখে গেছেন। এই টাকাটা আমি তোমাকে দিয়ে দিতে পারি। সেই টাকায় বাড়ি টারি কিনে তুমি মোটামুটি রাজার হালে থাকতে পার।
ফরিদ আগ্রহী গলায় বলল, অনেক টাকা না-কি?
হ্যাঁ অনেক টাকা। তবে তোমাকে আমি টাকাটা দিতে পারছি না। কারণ শ্বশুর সাহেব বলেছন তোমার মাথাটা ঠিক না হলে যেন তোমার কাছে টাকা না দেয়া হয়। তোমার মাথা ঠিক না।
আমার মাথা ঠিক না?
না।
আর আপনারটা হানড্রেড পার্সেন্ট ঠিক?
আমার মাথা নিয়ে কথা হচ্ছে না। তোমারটা নিয়ে কথা হচ্ছে।
ফরিদ হঠাৎ দাঁড়াল। গাঢ় গলায় বলল, দুলাভাই আমি চললাম। আমার কারণে আপনার প্রেসার বাড়বে না।
মনে হচ্ছে ফরিদের নিজের ব্লাড প্রেসারও হু হু করে বাড়ছে। মাথার ভেতর প্ৰলয় কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। মনে হয় এই অবস্থাতেই কবি নজরুল লিখেছিলেন—
আমি ভরা তরী করি ভরা ড়ুবি, আমি টর্নেডো, আমি ভাসমান মাইন।
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সূত, বিশ্ব বিধাত্রীর।
ফরিদের রাগ অনুরাগ কোনটাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না বলে নিজের ঘরে যেতে যেতে নিজেকে অনেকটা সামলে ফেলল। বসার ঘরে সোফায় ডাক্তার হা করে ঘুমুচ্ছে। ব্যাটাকে কষে একটা চড় দেবার ইচ্ছা অনেক কষ্টে দমন করতে হল। চড়টা দিতে পারলে রাগটা পুরোপুরি চলে যেত। রাগ কমানোর অনেকগুলো পদ্ধতির মধ্যে একটি হচ্ছে অন্যের উপর রাগ ঢেলে দেয়া। কিংবা উল্টো দিক থেকে সংখ্যা গোনা—একশ, নিরানব্বই, আটানব্বই, সাতানব্বই, ছিয়ানব্বই ফরিদ সংখ্যা পদ্ধতি চেষ্টা করল। পদ্ধতি আজ কাজ করছে না। সব দিন সব পদ্ধতি কাজ করে না। চুল ধরে হাঁচকা টান দিয়ে ডাক্তার ব্যাটাকে সোফা থেকে ফেলে দিলে কেমন হয়, ভদ্রতায় বাঁধছে। সমাজে বাস করার এই হচ্ছে সমস্যা। সামাজিক বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হয়। ইচ্ছা করলেও কারোর চুল ধরে হ্যাচক টান দিয়ে নিচে ফেলে দেয়া যায় না।
ফরিদ মেঘ গৰ্জন করল, এই ব্যাটা উঠ।
ডাক্তার ধড়মড় করে উঠে বসল। তার কাছে সব কিছুই এলোমেলো। এখানে সে কি করছে? ঘুমুচ্ছে না-কি? এখানে ঘুমুচ্ছে কেন? সামনে ফরিদ মামা না? উনি এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?
