সখীগণ সবে কুড়াইতে কুটা।
চলিল কুসুম কাননে।
কৌতুকরসে পাগলপরানী
শাখা ধরি সবে করে টানাটানি,
সহসা সবারে ডাক দিয়া রাণী
কহে সহাস্য আননে–
ওগো তোরা আয়, এই দেখা যায়
কুটির কাহার অদূরে!
না। রাত্রির মত মেয়েরা বার বার আসে না। এদের হঠাৎ হঠাৎ পাওয়া যায়। আসীম সৌভাগ্যবান কোন পুরুষ হঠাৎ এদের পেয়ে যান। সে যেমন পেয়েছিল। রাত্রির মৃত্যুর সময় সে তার হাতে হাত রেখে বসেছিল। এক সময় আনিস বলল, কষ্ট হচ্ছে?
রাত্রি বলল, হ্যাঁ।
আনিস সহজভাবে বলল, কষ্টের কিছু নেই রাত্রি আবার দেখা হবে। রাত্রি চোখের পানি মুছে বলল, এই কথাটা ভুল। আর দেখা হবে না। যা দেখার এই বেলা দেখে নাও।
পরকাল আছে কি না এটা নিয়ে আনিস মাথায় ঘামায় না। তবে আর কোনদিন দেখা হবে না। এই কথা আনিস গ্রহণ করে নি। দেখা হয়েছে। রাত্রির সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে। অন্য একটি মেয়ে হঠাৎ হয়ত অবিকল রাত্রির মত করে হাসল। আবার দেখা হল রাত্রির সঙ্গে।
বিটের দুজন পুলিশ আনিসকে থামাল।
আপনি কে?
আমার নাম আনিস?
যান কোথায়?
আনিস চুপ করে রইল। বিটের পুলিশ বিরক্ত হয়ে তাকাচ্ছে। রাতের শহরে বিটের পুলিশরাও বড় বিরক্ত করে।
কথা বলেন না কেন? যান কোথায়?
কোথাও যাই না- হাঁটি।
দেখি আপনার ঝুলির মধ্যে কি আছে?
ঝুলির মধ্যে তেমন কিছু পাওয়া গেল না- স্কট মামাডের লেখা একটি উপন্যাস House made of down আনিসের জন্মদিনে রাত্রি উপহার দিয়েছিল। গোটা গোটা হরফে লেখা— আনিস, তুমি এত ভাল কেন?
আনিস বিটের পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল, এই বইটি আমার স্ত্রী আমার জন্মদিনে আমাকে উপহার দিয়েছেন। এইখানে আমার প্রসঙ্গে কি লেখা আছে আপনি পড়ে দেখতে পারেন। আমার স্ত্রীর ধারণা আমি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। মেয়েরা অবশ্যি সব সময়ই একটু বাড়িয়ে কথা বলে। তবু…
পুলিশ আনিসকে ঘাঁটাল না। এগিয়ে গেল। এরকম নিশি পাগলের সঙ্গে তাদের সব সময় দেখা হয়। এদের নিয়ে মাথা ঘামালে তাদের চলে না।
মনসুর সোফায় আধশোয়া
মনসুর সোফায় আধশোয়া হয়ে আছে।
সোবাহান সাহেবের কারণেই সে এমনভাবে বসা। সোবাহান সাহেব চান যে সে আরাম করে বসে ক্ষুধা সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার লেখাটা শুনে। মনসুর একবার শুধু ক্ষীণ স্বরে বলল, স্যার লেখাটা কত পৃষ্ঠা?
সোবাহান সাহেব বললেন, তিনশ বাইশ পৃষ্ঠা হয়েছে। এখনো লিখছি। আরো বাড়বে।
মনসুর হতভম্ব হয়ে বলল, সবটা আজ শুনাবেন?
হ্যা। নয়তো ফ্লো ঠিক থাকে না। ফ্লো থাকাটা খুব দরকার। একসঙ্গে না। শুনলে তুমি পরিষ্কার বুঝতে পারবে না।
তা ঠিক।
তুমি আরাম করে পা তুলে বস। খুব মন দিয়ে শুনবে। কিছু মিস করবে: की।
জ্বি আচ্ছা।
আর পড়ার সময় হু হা এই সব কিছু বলবে না। এতে আমার অসুবিধা হয়। কনসানট্রেসান কেটে যায়।
আমি কিছু বলব না।
ভেরী গুড।
সোবাহান সাহেব শুরু করলেন এবং অতি দ্রুত পড়ে যেতে লাগলেন। ঘণ্টা খানিক পার হবার আগেই ঘরে ঢুকল ফরিদ। সোবাহান সাহেবকে থামিয়ে বলল, দুলাভাই আপনার কাইন্ড পারমিশান নিয়ে কি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
কি কথা?
যাকে আপনি লেখা পড়ে শুনাচ্ছেন সেই গাধা ঘুমুচ্ছে। তাকিয়ে দেখুন–হা করে ঘুমুচ্ছে।
সোবাহান সাহেব তাকালেন এবং তার মন সত্যি সত্যি খুব খারাপ হয়ে গেল। আসলে তাই। ডাক্তার ঘুমুচ্ছে। হা করেই ঘুমুচ্ছে।
সোবাহান সাহেব উচ্চস্বরে ডাকলেন, মিলি মিলি। সেই শব্দেও ডাক্তারের ঘুম ভাঙলি না। কয়েকবার শুধু ঠোঁট কাঁপল। মিলি পাশে এসে দাঁড়াবার পর সোবাহান সাহেব বললেন, ডাক্তারের মাথার নিচে একটা বালিশ দাও মা ও ঘুমিয়ে পড়েছে। ক্ষুধা বিষয়ক আমার এই জটিল লেখা পড়তে পড়তে যে কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারে এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
মিলি ডাক্তারের মাথায় নিচে একটা বালিশ দিয়ে দিল। পাতলা চাদরে গা ঢেকে দিল। এই সামান্য কাজটা করতে তার ভাল লাগল। প্ৰবল ইচ্ছা করতে লাগল। এই ছেলেটার হাতটা একটু ছুয়ে দেখতে। মানুষের মনে কেন এরকম ইচ্ছা! হয়? এই ইচ্ছার নামই কি ভালবাসা? তাহলে ভালবাসা ব্যাপারটা কি শরীর নির্ভর? কবি যে বলেন প্ৰতি অঙ্গ লাগি তার প্রতি অঙ্গ কাদেরে– এই কথা কি সত্যি? সত্যি হলে খুব কষ্টের ব্যাপার হবে। ভালবাসার মত এত বড় একটা ব্যাপারকে দেহে সীমাবদ্ধ করা খুব অন্যায়। খুবই অন্যায়। তবু কেন জানি ভালবাসা শেষ পর্যন্ত দেহেই আশ্রয় করে। বড় রহস্যময় এই পৃথিবী। বড়ই রহস্যময়।
মিলি গায়ে চাদর দিয়ে দিচ্ছে পাশে মুখ বিকৃত করে দাঁড়িয়ে আছে ফরিদ। সে বলল, এত বড় গাধা আমি আমার লাইফে দেখিনিরে মিলি। একটা ভদ্রলোক আগ্রহ করে তোকে একটা লেখা পড়ে শোনাচ্ছেন আর তুই ব্যাটা ঘুমিয়ে পড়লি? তোর একটু লজ্জাও লাগল না? আবার দেখনা নাক ডাকাচ্ছে। কষে একটা চড় দেব না-কি?
মিলি বলল, বেচারাকে ঘুমুতে দাও মামা বিরক্ত কর না।
আমার কি ইচ্ছে করছে জানিস? আমার ইচ্ছে করছে গাধাটাকে ধরাধরি করে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসি। হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গলে একটা শক খাবে। বুঝবে কত ধানে কত চাল।
তুমি এ ঘর থেকে যাও তো মামা।
ঘরে প্রচণ্ড মশা। বেচারাকে মশা বিরক্ত করছে। সোফার উপর মশারী খাটিয়ে দেয়া যায় না। মিলি মসকুইটো কয়েল জ্বলিয়ে দিল।
রাতে ভাত খেতে খেতে সোবাহান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ডাক্তার কি এখনো ঘুমুচ্ছে? মিলি লজ্জিত গলায় বলল, হ্যাঁ বাবা।
