আচ্ছা দেব।
গোপনে গোপনে আম্মি ডাকছে। এটাও চিন্তার বিষয়।
তোমাকে এত চিন্তা করতে হবে না।
তোর মা এখন আমার সঙ্গে ঘুমুচ্ছে না। আলাদা ঘুমুচ্ছে এই বিষয়টা কি বলতো?
জানি না বাবা, এটা তোমাদের ব্যাপার তোমরা ফয়সালা করবে। আমি যাচ্ছি। আর কিছু তোমার লাগবে?
না। খাওয়ার পানি দিয়েছিস?
হ্যাঁ।
যাবার আগে ক্ষুধা সম্পর্কে লাস্ট যে পাতাটা লিখলাম সেটা কি পড়ব, শুনবি?
রক্ষা কর বাবা। ক্ষুধা সম্পর্কে জানার আমার কোন আগ্রহ নেই। তুমি জেনেছ এইতো যথেষ্ট। একটা ফ্যামিলি থেকে একজন জানাই কি অনেক জানা না? ফ্যামিলির সব মেম্বারদের জানতে হবে?
হ্যাঁ হবে। আমি এই জিনিসটা তোর মাকে বুঝাতে পারি না।
বাবা তুমি ঘুমাও তো…
টগর এবং নিশা জেগে আছে। জেগে আছে বিলু। সে পড়ছে দেবতার গ্রাস। খুব সহজ কোন কবিতা না। কিন্তু টগর এবং নিশা মুগ্ধ হয়ে শুনছে। টগরের চোখে জল। একটু পর পর তার ঠোঁট কেঁপে উঠছে। বিলু অবাক হয়েছে। একটা বাচ্চা ছেলের মধ্যে এত আবেগ। আশ্চর্য তো!
রাখাল যাইবে সাথে স্থির হল কথা—
অন্নদা লোকের মুখে শুনে সে বারতা
ছুটে আসি বলে, বাছা কোথা যাবি ওরে!
রাখাল কহিল হাসি, চলিনু সাগরে।
আবার ফিরিব মাসি! পাগলের প্রায়
অন্নদা কহিল ডাকি, ঠাকুরমশায়
বড়ো যে দুরন্ত ছেলে রাখাল আমার,
কে তাহারে সামালিবে! জন্ম হতে তার
মাসি ছাড়া বেশিক্ষণ থাকে নি কোথাও।
পড়া এইটুকু আসতেই টগর বিলুকে হতভম্ব করে তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। নিশাও ঘন ঘন চোখ মুছছে।
বিস্মিত বিলু বলল, এ রকম কাঁদার তো কিছু হয় নি। কাঁদছ কেন টগর? টগর কিছু বলল না। নিশা বলল, টগর এমন করে কাঁদছে কারণ আমাদের আম্মু এই কবিতা আমাদের শুনাতো। আম্মু বই পড়ে বলতো না। পুরোটা মুখস্থ বলতো।
বিলু বলল, এটা ছাড়া আর কোন কবিতা তিনি বলতেন?
সামান্য ক্ষতি কবিতাটাও বলতেন।
ঐটাও অবিশ্যি খুব সুন্দর।
টগর লজ্জা লজ্জা গলায় বলল, এই কবিতাটা আম্মু বলতো নেচে নেচে। বিলু অবাক হয়ে বলল, নেচে নেচে মানে?
হাত পা দুলিয়ে নাচত। নেচে নেচে বলত।
বাহ চমৎকারতো। তোমাদের তো দেখছি অদ্ভুত একটা মা ছিল।
হ্যাঁ ছিল।
সেই রাতে বাকি কবিতাটা আর পড়া হল না।
রাস্তায় রাস্তায় হাঁটছে আনিস। খারাপ লাগছে না। ভালই লাগছে। বিয়ের আগে এইভাবে হেঁটে হেঁটে কত রাত সে পার করে দিয়েছে। রাতের ঢাকায় কত কি দেখার আছে। রূপহীনা কিছু তরুণী কেমন মাছের মত চোখে তাকায় চলমান পুরুষদের দিকে। যদি কেউ তাকে পছন্দ করে। যদি কেউ এগিয়ে আসে। অর্থ দিয়ে অল্প কিছু আনন্দ যদি কিনে নিতে চায়। সৃষ্টির কোন এক লগ্নে বিধাতা শরীর দিয়ে মানব এবং মানবী পাঠিয়েছিলেন। সেই শরীরে বপন করেছেন ব্যাখ্যাতিত ভালবাসা। সেই ভালবাসার একটি কদৰ্য অংশ টাকায় কেনা যায়। আনিস দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। কেমন অকাতরে মানুষজন ঘুমুচ্ছে। কেউ কেউ জেগে উঠে বিড়ি ধরিয়ে পাশের মানুষের সঙ্গে গল্প করছে। এদের দেখে মনে হচ্ছে এরা কত না সুখী।
আনন্দিত হবার অসাধারণ ক্ষমতা এই মানুষের। আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখলে এরা খুশী হয়। একটি অবোধ শিশুকে হেসে ফেলতে দেখলে এরা খুশী হয়। আম গাছ যখন নতুন পাতা ছাড়ে তখন তাই দেখেও আনন্দে অভিভূত হয়। মানুষ প্রকৃতির এত চমৎকার একটি সৃষ্টি প্রকৃতি তবু নানান শিকলে তাকে বাঁধলেন। ক্ষুধার শিকল, তৃষ্ণার শিকল… প্রকৃতির নিশ্চয়ই তার প্রয়ােজনীয়তা বোধ করেছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন মানুষ নামক এই প্রাণীটাকে নানান দিক থেকে বেঁধে না রাখলে সে শেষ পর্যন্ত একটা ভয়াবহ কাণ্ড করে বসবে। স্বৰ্গমর্ত পাতাল জয় করবে।— গ্রহ থেকে গ্রহান্তরকে সে নিয়ে আসবে তার পায়ের নিচে এবং এক সময় প্রকৃতিকেই প্রশ্ন করে বসবে— কে তুমি? কি তোমার পরিচয়? কি চাও তুমি মানুষের কাছে? কেন তুমি আমাদের এই পৃথিবীতে এনেছ? কোথায় তুমি আমাদের নিয়ে যেতে চাও?
আনিস সিগারেট ধরিয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের দিকে রওনা হল। আজকের রাতটা সে লঞ্চ টামিনালেই কাটাবে।
স্যার।
আনিস চমকে তাকাল। মেয়ে লাগব স্যার? কলেজ গার্ল। বিশ্বাস না করলে সাটিফিকেট দেখবেন।
কি নাম মেয়ের?
মেয়ে তো একটা না। অনেক আছে। নাম দিয়া কি হইবে? কি রকম চান বলেন। হোটেলে ব্যবস্থা করা আছে। কোন সমস্যা না।
আনিস হাসি মুখে বলল, এমন কোন মেয়ে যদি আপনার সন্ধানে থাকে যার নাম রাত্রি তাহলে যেতে পারি। আমার স্ত্রীর ভাল নাম রেশমা, ডাক নাম রাত্রি। এই নামের কাউকে পাওয়া গেলে খানিকক্ষণ গল্প করতাম।
লোকটি বিরক্ত চোখে তাকিয়ে থেকে চলে গেল। রাতের ঢাকায় হেঁটে বেড়ানোর এই হচ্ছে এক সমস্যা- কিছুক্ষণ পর পর দালালদের হাতে পড়তে হয়। আনিসের মাথায় চট করে কবিতার একটা লাইন চলে এল— কিছু ভালবাসা কিনিব অল্প দামে।
কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে প্রথম লাইনটিই শুধু এসেছে। দ্বিতীয় লাইনটি আর আসবে না। প্রকৃতি মানুষের সঙ্গে রসিকতা করতে বডড পছন্দ করে। একটা অসাধারণ লাইন পাঠায়। দ্বিতীয় লাইনটা আর পাঠায় না। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দ্বিতীয় লাইনটার জন্যে অপেক্ষা করতে হয়। যা আর আসে না।
আচ্ছা রাত্রির মত দ্বিতীয় কোন তরুণী কি আসবে তার জীবনে? সে গভীর রাতে হঠাৎ অকারণ পুলকে মাথার লম্বা চুল খোপা করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে সাজবে। বাতি নিভিয়ে মোমবাতি জ্বলিয়ে মদির গলায় বলবে এখন আমি নাচব। তুমি বসে বসে দেখবে–
