এমদাদ চোখ বড় বড় করে বলল, পছন্দ হচ্ছে না! এইটা ভাইসাব কি বললেন। জীবনের সারকথা তো সবটাই আপনার লেখার মধ্যে। ক্ষুধা বিষয়টা যে কি আপনের লেখা পড়ার আগে জানতাম না। উপাষ দিছি। ঠিকই কিন্তু ক্ষুধা বুঝি নাই। এখন বুঝলাম।
সোবাহান সাহেব বললেন, তাহলে কি বাকিটা পড়ব?
অবশ্যই পড়বেন।
দেড়শ পৃষ্ঠার মত লেখা হয়েছে আমি ভাবছি আরো শ দুই পৃষ্ঠা লিখে ফেলব। মোটামুটি সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার একটা কাজ।
ভাইসাব টেনে টুনে এটারে পাঁচশ করেন। একটা কাজ যখন হইতেছে ভাল করেই হোক।
পড়তে শুরু করি তাহলে?
আলহামদুলিল্লাহ।
এমদাদ দীর্ঘ নিঃশ্বাস গোপন করে চেয়ারে পা তুলে বসল। গত দুঘণ্টা যাবত এই জিনিস শুনতে হচ্ছে। এখন মাথা ঘুরছে ভন ভন করে অথচ বলতে হচ্ছে অসাধারণ। এর নাম কপাল।
এমদাদ সাহেব।
জি।
আপনি যদি কোন পয়েন্টে আমার সঙ্গে ডিফার করেন তাহলে দয়া করে বলে ফেলবেন। সংকোচ করবেন না। আমি নোট রাখব। কারণ বইটা অনেকবার রিরাইট করতে হবে। শুরু করি তাহলে?
জি আচ্ছা।
সোবাহান সাহেব শুরু করলেন,
আমি ক্ষুধা সম্পর্কে প্রচুর উক্তি সংগ্ৰহ করিয়াছি। আগে জানিতে চাহিয়াছি অন্যে ক্ষুধা প্রসঙ্গে কি ভাবিয়াছেন। তাহাদের ভাবনা আপাতত অত্যন্ত মনকাড়া হইলেও আমার কাছে কেন জানি ভ্রান্ত বলিয়া প্রতিয়মান হইতেছে। ক্ষুধা নিয়া বড় বড় মানুষ রঙ্গ রসিকতা করিয়াছেন, মূল ধরিতে পারেন নাই। যেমন ফ্রাংকলিন বলিয়াছেন, না খেয়ে মানুষকে মরতে দেখেছি খুবই কম, অতিরিক্ত খেয়ে মরতে দেখেছি অনেককে।
ইহাকে আমি রসিকতা ছাড়া আর কি বলিব?
উইল রজার বলিয়াছেন–ক্ষুধার্তারা তীক্ষ্ণ তলোয়ারের চেয়েও ধারালো।
ইহাও কি একটি সুন্দর মিথ্যা নয়? ক্ষুধার্তরা তীক্ষ্ণ তলোয়ারের মত ধারালো হইলে দেশে বিপ্লব হইয়া যাইত। যাহা হয় নাই।…
এমদাদ সাহেব কি ঘুমিয়ে পড়লেন না-কি?
জ্বি না! এই চোখ বন্ধ করে আছি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, চউখটা বন্ধ থাকলে শুনতে ভাল লাগে।
ঠিক বলেছেন— আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে— ক্ষুধা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের মানুষদের ধ্যান ধারণা চিন্তা ভাবনা সঠিক ছিল নয়। ক্ষুধার ভয়াবহ রূপ তাঁরা ধরতে পারেন নি। তবে সবাই যে পারেননি তা না। যাঁরা নিজেরা ক্ষুধার্ত থেকেছেন। অভুক্ত থেকেছেন তারা পেরেছেন। যেমন ইংল্যান্ডের চার্লস ডিকেন্স এবং রাশিয়ার ম্যাক্সিম গর্কি। হ্যাংগার বা ক্ষুধা নামক একটা বিখ্যাত গ্রন্থ আছে। নুট হামসুনের লেখা। সেই বইটিতেও ক্ষুধার ভয়াবহ বৰ্ণনা আছে। যদিও সেই বর্ণনা আমার কাছে যথাযথ মনে হয় নি। এমদাদ সাহেব ঘুমিয়ে পড়লেন না-কি?
জ্বি না।
মনে হচ্ছিল নাক ডাকের মত শব্দ হচ্ছে।
জনাব এইটা হইল আমার অভ্যাস। খুব চিন্তাযুক্ত হইয়া যদি কিছু শুনি তখন এই রকম শব্দ হয়।
আজি না হয় থাক। অন্য আরেকদিন পড়ব। এমদাদ উঠতে উঠতে বলল, এইসব আসলে আমাদের শুনায়ে কোন লাভ নাই। আমরা আছিইবা কয়দিন। এইসব শোনা দরকার অল্প বয়স্ক পুলাপানদের। যেমন ধরেন এই বাড়ির ফরিদী, তারপর ধরেন ডাক্তার। সোবাহান সাহেব উৎসাহিত হয়ে বললেন,
কথাটা ভুল বলেন নি। ডাক্তার অনেকদিন আসছেও না— আচ্ছা দেখি কাল খবর পাঠাব।
এমদাদ হাঁপ ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্ষুধা বিষয়ে পড়ার চেয়ে ক্ষুধায় ছটফট করতে করতে মরে যাওয়া ভাল। ভাইসাব তাহলে যাই— স্নামালিকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম। কাল দুপুর থেকে বসে যাব। বাকিটা একটানে পড়ব কেমন।
এমদাদ শুকনো গলায় বললেন, জি আচ্ছা।
রাতে মশারি ফেলতে এসে মিলি বলল, বাবা আনিস সাহেব যে পালিয়ে গেছেন সেই খবরটা কি শুনেছ?
সোবাহান সাহেব অবাক হয়ে বললেন, পালিয়ে গেছে মানে?
বাচ্চা দুটিকে রেখে বাড়ি ছেড়ে উধাও হয়েছেন।
কারণটা কি?
বাচ্চারা তার কথা শুনে না। তিনি বাচ্চা দুটিকে শিক্ষা দিতে চান।
ওরা কান্নাকাটি করছে না?
না ওরা সুখেই আছে। বিলু আপার সঙ্গে শুয়েছে। বিলু আপা ক্ৰমাগত কবিতা আবৃত্তি করছে ওরা শুনছে। এত রাত হয়েছে অথচ ঘুমুবার কোন লক্ষণ নেই।
বাচ্চা দুটি তাহলে ব্যাপারটা সহজভাবে নিয়েছে?
হ্যাঁ। এবং মনে হচ্ছে এই নাটকীয় ঘটনায় তারা বেশ আনন্দিত।
সোবাহান সাহেব অতিরিক্ত গম্ভীর হয়ে পড়লেন। মিলি খুব হালকা গলায় বলল, বাবা বিলু আপা বাচ্চা দুটিকে যে কি রকম পছন্দ করে তা কি তুমি জান?
না জানি না।
অতিরিক্ত রকমের পছন্দ। এর ফল ভাল নাও হতে পারে বাবা।
ফল ভাল হবে না কেন?
সব কিছু আমি তোমাকে গুছিয়ে বলতে পারব না। আমার লজ্জা লাগবে। শুধু এইটুকু বলি ছোট মেয়েটি বিলু আপাকে আড়ালে ডাকে- আম্মি।
তাতে অসুবিধা কি? আমরাতো অনেকই মা ডাকি।
তা ডাকি। তবে আড়ালে ডাকি না- এই মেয়েটা ডাকছে আড়ালে।
ও।
এই নাও বাবা তোমার রিলক্সিন। খেয়ে ঘুমাও!
বিলুকে একটু ডেকে আনতো কথা বলি।
আজ থাক বাবা। আজ বিলু আপা ওদের কবিতা শোনাচ্ছে।
মিলি।
জি।
ঐ ডাক্তার অনেকদিন আসছে না ব্যাপারটা কি?
মিলি। ঈষৎ লাল হয়ে বলল, আমি জানি না কেন আসছে না।
ওকে খবর পাঠাস তো।
মিলি আবার লাল হয়ে বলল, খবর পাঠাতে হবে না। ও এমিতেই আসবে।
সোবাহান সাহেব হঠাৎ অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিক ভাবে বললেন, ডাক্তার ছেলেটা ভাল। মিলি থমথমে গলায় বলল, বার বার তার প্রসঙ্গ আসছে কেন বাবা?
ওকে ক্ষুধা বিষয়ক রচনাটা পড়ে শুনাতে চাই। খবর দিবিতো।
