আনিস হতভম্ব হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেক কষ্টে বলল, ভদ্র মহিলা নিশার কথা শুনে কি বলল? সে তখন বলল, টগর–তোমার বাবা এই সব কথা তোমাদের বলেছেন? আমি বললাম— হুঁ।
তুমি হুঁ বললে?
হ্যাঁ।
কিন্তু আমি তো কখনো এ রকম কথা বলিনি–তুমি হুঁ বললে কেন?
আর বলব না বাবা।
নিশা ক্ষীণ স্বরে বলল, আমিও বলব না। বাবা। এতক্ষণ সে জেগেই ছিল! কোন পর্যায়ে কথাবার্তায় অংশগ্রহণ করবে। এইটাই শুধু বুঝতে পারছিল না।
একটা মানুষ ক্ষুধা কেমন এটা জানার জন্যে না খেয়ে আছে। এই ব্যাপারটা পুতুলকে অভিভূত করে ফেলেছে। সে কয়েকবার দাদাজানের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চেষ্টা করলা–এমদাদ কোন পাত্তা দিল না। এমিতেই তার মেজাজ খারাপ, পকেট মারের ব্যাপারটায় উল্টাপাল্টা কথা বলে মেয়েটা তাকে ড়ুবিয়েছে। শুরুতেই বেইজ্জত হতে হল। এটাকে যে কোন ভাবেই হোক সামলাতে হবে। কি ভাবে সামলাবে তাই নিয়ে এমদাদ চিন্তা ভাবনা করছে— এর মধ্যে পুতুল ঘ্যান ঘ্যান করছে। সোবাহান সাহেবের না খাওয়া নিয়ে। এই মেয়েটাকে কড়া একটা ধমক দেয়া দরকার। ধমক দিতেও ইচ্ছা করছে না! ও দাদাজান ঘুমাইলা?
না!
কেমন আশ্চর্য মানুষ দেখলা দাদাজান? ক্ষুধা কেমন জিনিস এইটা জাননের জইন্যে না খাইয়া আছ।
দুনিয়াডা ভর্তি বেকুবে—এইডাও বেকুবির এক নমুনা।
ছিঃ দাদাজান–এমন কথা কইও না।
এই বুড়া বেকুব তো বেকুবই, তুইও বেকুব। তুই আমার সাথে কথা কইস না।
আমি কি দোষ করলাম দাদাজান?
চুপ, কোন কথা না।
বুড়ো বয়সের ব্যধি রাতে ঘুম হয় না। এমদাদ রাত দেড়টায় ঘুমের আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল। ফুরফুরে বাতাস দিচ্ছে বসে থাকতেও আরাম। মশা না থাকলে পাটি পেতে বারান্দায় ঘুমানোরই ব্যবস্থা করা যেত কিন্তু বডড মশা।
মিনু দরজা বন্ধ করতে এসে দেখেন এমদাদ সাহেব বারান্দার ইজিচেয়ারে আরাম করে বসে আছেন। হাতে সিগারেট। তিনি বিস্মিত গলায় বললেন, কে এমদাদ সাহেব না?
জ্বি মা জননী।
এত রাতে এখানে কি করছেন?
মনটা খুব খারাপ। ঘুম আসে না।
মন খারাপ কেন?
বাড়ির কর্তা না খেয়ে ঘুমিয়ে আছে। এই জন্যেই মনটা খারাপ মা জননী! আমার হইলাম গোরামের মানুষ, ক্ষুধা পেটে কেউ ঘুমাইতে গেছে শুনলে মনটা খারাপ হয়?
ঐসব নিয়ে ভাববেন না। বিলুর বাবার এই রকম পাগলামী আছে। সকালে দেখবেন ঠিকই নাশতা করছে।
শুনে বড় ভাল লাগছে মা জননী।
আসুন ভেতরে চলে আসুন। আমি দরজা বন্ধ করে দেব।
এমদাদ ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, আরেকটা বিষয় আপনেরে বলা হয় নাই মা জননী— মানিব্যাগের বিষয়ে! মানিব্যাগ ছিল পুতুলের কাছে। মাইয়া খুব সাবধানতো— গুছায়ে রাখছে। এদিকে আমার পাঞ্জাবীর পকেটে ছিল রুমাল। পকেটমার সেই রুমাল নিয়ে চলে গেছে। হা হা হা।
মিনু বললেন, টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে বলবেন। সংকোচ করবেন না।
আলহামদুলিল্লাহ। কোন সংকোচ করব না— আপনারা হইলেন বটবৃক্ষ।
যান। ঘুমুতে যান।
জ্বি আচ্ছা। ঘুম আসবে না। তবু শুইয়া থাকব। বাড়ির আসল লোক দানাপানি খায় নাই— এরপরেও কি ঘুম আসে কন মা জননী?
এইসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। সকাল হলেই দেখবেন খাওয়া দাওয়া শুরু করছে। উদ্দেশ্যে তো আর কিছু না। উদ্দেশ্য হলো আমাকে যন্ত্রণা দেয়া!
এই কথা মুখে উচ্চারণ করবেন না মা জননী – ক্ষুধা কি যে বুঝতে চায় সে কি সাধারণ লোক? সে তো বলতে গেলে আল্লাহর অলি। ঠিক বলছি না— মা জননী?
মিনু জবাব দিলেন না। এই লোক কি মতলবে এসেছে কে জানে। বিনা কারণে আসে নি বোঝাই যাচ্ছে। নিশ্চয়ই বড় কোন সমস্যা। সমস্যা টেনে টেনে তিনি এমন ক্লান্ত ও বিরক্ত। আর ভাল লাগে না।
কাপে করে এক কাপ পানি
বাহান সাহেব ভোরবেলায় কাপে করে এক কাপ পানি খেলেন। আর কিছুই খেলেন না। মিনু বললেন, তুমি সত্যি সত্যি কিছু মুখে দেবে না?
না।
কেন?
কেনর জবাবতো দিয়েছি। আমি ক্ষুধার স্বরূপ বুঝতে চাই।
রাগে দুঃখে মিনুর চোখে পানি এসে গেল। একজন বয়স্ক মানুষ যদি এরকম যন্ত্রণা করে তাহলে কিভাবে হয়? মিলির ইউনিভার্সিটিতে যাবার খুব প্রয়োজন ছিল সে গেল না। বাসার আবহাওয়া মনে হচ্ছে ভাল না। বাবার প্রেসারের কি অবস্থা কে জানে। ডাক্তারকে খবর দেয়া প্রয়োজন। তবে এক্ষুনি ছুটে যাওয়ার দরকার নেই। দুপুর পর্যন্ত যাক তারপর দেখা যাবে।
দুপুরে ফরিদ দুলাভাইয়ের অনশনের খবর পেল। তার উৎসাহের সীমা রইল না। কাদেরকে ডেকে বলল, সাবজেক্ট পাওয়া গেছে–অসাধারণ সাবজেক্ট–ছবি হবে ক্ষুধা নিয়ে। ক্ষুধা কি একজন জানতে চাচ্ছে। ক্যামেরা তার মুখের ওপর ধরে রাখা। মাঝে মাঝে ক্যামেরা সরে নানান ধরনের খাবার দাবারের উপর চলে যাচ্ছে। আবার ফিরে আসছে তার মুখে। লোকটার অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছে। ক্ষুধার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তৃষ্ণা। ক্যামেরা প্যান করে চলে গেল ঝর্ণায়। বিরবির করে ঝর্ণার পানি পড়ছে–অথচ ঐ মানুষটির মুখে এক ফোঁটা পানি নেই। ক্যামেরা চলে গেল আকাশের মেঘে।
কাদের উৎসাহী গলায় বলল, আবার ছবি হইব মামা?
ফরিদ বলল, ছবি হবে না। মানে? একটা প্রজেক্ট ফেল করেছে বলে সব কয়টা প্ৰজেক্ট ফেল করবে নাকি? বলতে গেলে আজ থেকেই ছবির কাজ শুরু হল। ছবির নাম — হে ক্ষুধা।
কি নাম কইলেন মামা?
হে ক্ষুধা।
হে-কথাডা বাদ দেন মামা। অপয়া কথা। এর আগের বারও হে আছিল। বইল্যা ছবি অয় নাই।
