কথা মন্দ বলিস নি। তাহলে বরং হে টা পেছনে নিয়ে যাই। ছবির নাম–ক্ষুধা হে কি বলিস?
মন্দ না।
কাগজ কলম দে। ইমিডিয়েট যেসব চিন্তা মাথায় আসছে সেগুলো নোট ডাউন করে ফেলি। দুলাভাইয়ের সঙ্গেও আলাপ দরকার। ছবিটা যখন তাঁকে নিয়েই হচ্ছে।
কাদের ক্ষীণ স্বরে বলল, আমার কোন পাট থাকত না মামা?
থাকবে! তবে সাইড রোল। সেন্ট্রাল ক্যারেকটার হচ্ছে দুলাভাই! দেখি আপার সঙ্গে ব্যাপারটা আগে ফয়সালা করে নিই।
মিনু রাগ করে বিলুর ঘরে শুয়ে আছেন। সকালে তিনিও নাস্তা করেননি। তার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্যে বাড়ি থেকে চলে যাবার কথাও মনে আসছে। রাগারাগী তাঁর স্বভাবে নেই। তবু সবাই বেশ কয়েকবার তার কাছে ধমক খেয়েছে। তিনি বলে দিয়েছেন কেউ যেন তাকে বিরক্ত না করে। কাজেই ফরিদ যখন বিশাল একটা খাতা হাতে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, আপা আসব?
তিনি কড়া গলায় বলেন, ভাগ এখান থেকে।
তুমি যা বলবে তাই হবে কিন্তু তার আগে তোমার কয়েকটা মিনিট সময় আমাকে দিতে হবে। দুলাভাইকে নিয়ে ছবি করছি আপা। ছবির নাম ক্ষুধা হে। দুলাভাই সেখানে মানুষ না। দুলাভাই হচ্ছেন ক্যামেরা — যে ক্যামেরা ক্ষুধা কি বুঝতে চেষ্টা করছে। পনেরো মিনিটের ছবি। পনেরো মিনিটই যথেষ্ট। শেষ দৃশ্যটা নিয়েছি সুকান্তের কবিতা থেকে। ঘন নীল আকশে পূর্ণিমার চাঁদ। হঠাৎ সেই চাঁদটা হয়ে গেল একটা আটার রুটি। দুটা রোগা রোগা হাত আকাশ থেকে সেই চাদটা অর্থাৎ রুটিটা নামিয়ে এনে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে খেয়ে ফেলল। কেমন হবে। আপা বলতো? অসাধারণ না?
মিনু একটিও কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। ফরিদের সঙ্গে কথা বলা অর্থহীন। সে নিজের মনে বকবক করতে থাকুক।
মানুষের অবহেলা ফরিদকে তেমন বিচলিত করে না। এবারো করল না। আসলে এই মুহুর্তে ক্ষুধা হে ছবির শেষ দৃশ্য তাকে অভিভূত করে রেখেছে। রোগা রোগা দুটা হাত আকাশ থেকে চাঁদটা নামিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে কপ কপি করে খেয়ে ফেলছে। এই দৃশ্যের কোন তুলনা হয় না।
ফরিদ ঘর থেকে বের হয়েই পুতুলের মুখোমুখি পড়ে গেল। ফরিদ কড়া গলায় বলল, এই যে মেয়ে দাড়াও তো। দেখি হাত দুটা মেলতো। পুতুল ভয়ে ভয়ে হাত মেলল।
হুঁ রোগা রোগা হাত আছে— মনে হচ্ছে তোমাকে দিয়ে হবে। তুমি কি একটা কাজ করতে পারবে?
কি কাজ?
অতি সামান্য কাজ। পারবে কি পারবে না সেটা বল।
পুতুল ক্ষীণ স্বরে বলল, পারব।
ভেরী গুড। কাজটা অতি সামান্য। আকাশ থেকে চাদটা টেনে নামাবে তারপর ছিঁড়ে কুচি কুচি করে খেয়ে ফেলবে!
পুতুল অপলক চোখে তাকিয়ে আছে। তার সব চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে গেছে।
ফরিদ দাঁড়াল না— লম্বা লম্বা পা ফেলে বারান্দায় চলে গেল। ছবিটা নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবা দরকার। খুবই ঠাণ্ডা মাথায়। দরকার হলে ছবির লেংথ কমিয়ে পনেরো থেকে দশ মিনিটে নিয়ে আসতে হবে। তবে সেই দশ মিনিটও হবে। অসাধারণ দশ মিনিট — গোল্ডেন মিনিটস!
যতটা কষ্ট হবে
তটা কষ্ট হবে বলে ভেবেছিলেন ততটা কষ্ট সোবাহান সাহেবের হচ্ছে না। কষ্ট একটিই, পরিবারের সদস্যরা সবাই বড় বিরক্ত করছে। এদের যন্ত্রণায় বড় কিছু করা যায় না। দৃষ্টিটাকে এরা কিছুতেই ছড়িয়ে দিতে পারে না। কয়েকটা দিন না খেয়ে থাকা যে কঠিন কিছু না এটা তারা বুঝে না।
সোবাহান সাহেব একটা বড় খাতায় তাঁর অভিজ্ঞতার কথাও লিখে রাখছেন। খুব গুছিয়ে লেখার চেষ্টা করছেন। তেমন গুছিয়ে লিখতে পারছেন না। কিছুক্ষণ লেখালেখি করলেই মাথায় চাপ পড়ছে। তাঁর ডায়েরীর কিছু কিছু অংশ এরক।–
বুধবার রাত দশটা পাঁচ।
অনশন পর্ব শুরু করা গেল। এই অনশন দাবি আদায়ের অনশন নয়। এই অনশন নিজেকে জানার অনশন। আমি ক্ষুধার প্রকৃত স্বরূপ জানতে চাই। আমি এর ভয়াবহ রূপ জানতে চাই। যদি জানতে পারি। তাহলে হয়তবা ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী সম্পর্কে আমার কিঞ্চিৎ ধারণা হবে। এই যে পৃথিবী জুড়ে হত্যাকাণ্ড হচ্ছে এর মূল কারণগুলোর একটি নিশ্চয়ই ক্ষুধা। আজকের খবরের কাগজের একটি খবর দেখে অত্যন্ত বিষণ্ণ বোধ করেছে। সাভার উপজেলার জনৈক কালু মিয়া অভাবে অতিষ্ট হয়ে তার স্ত্রী, ছয় বছরের পুত্র এবং তিন বছরের কন্যাকে হত্যা করে পুলিশের কাছে ধরা দিয়েছে। স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দিতে বলেছে ক্ষুধার তাড়নায় অতিষ্ট হয়ে সে এটা করেছে। হায়রে ক্ষুধা! অথচ এই সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।
বৃহস্পতিবার ভোর এগারোটা।
আমি আমার পরিবারের সদস্যদের প্রতি অত্যন্ত বিরক্ত বোধ করছি। আমি একটা পরীক্ষা করছি তাও তারা করতে দেবে না। তাদের ধারণা হয়েছে অল্প কয়েক ঘণ্টা না খেয়ে থাকার কারণে আমি মারা যাব। মৃত্যু এত সহজ নয়। বিয়াল্লিশ দিন শুধুমাত্র পানি খেয়ে জীবিত থাকার রেকর্ড আছে। এরা এই জিনিসটা বুঝতে চায় না। আমার মৃত্যু প্রসঙ্গে এদের অতিরিক্ত সচেতনতাও আমার ভাল লাগছে না। মৃত্যু একটি অমোঘ ব্যাপার। একে নিয়ে এত মাতামাতি কেন? পবিত্র কোরান শরীফে তো স্পষ্ট উল্লেখ আছে, প্রতিটি জীবিত প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্ৰহণ করিতে হইবে। বর্তমানে ধর্মগ্রন্থ পাঠের একটা প্রবল ইচ্ছা বোধ করছি। ক্ষুধার্তা মানুষ কি পারলৌকিক চিন্তা করে? একটি জরুরি বিষয় লিখে রাখা দরকার বোধ করছি। মিনু বড় কান্নাকাটি করছে। এত কান্নাকাটির কি আছে তাতো বুঝতে পারছি না। বিলু এসে বলে গেল আমি যদি না খাই তাহলে তার মা-ও খাওয়া বন্ধ করে দেবে। এ দেখি আরেক যন্ত্রণা হল।
