বিলু বলল, ভাত দেব না। বাবা?
না।
প্লেট বোধহয় ভাল করে ধোয়া হয়নি। তাই না?
ওসব কিছু না।
সোবাহান সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালেন। মিনু বললেন, শরীর খারাপ লাগছে? সোবাহান সাহেব অস্পষ্ট এক ধরনের শব্দ করলেন। এই শব্দের কোন অর্থ নেই।
রাত সাড়ে নটার দিকে জানা গেল ক্ষুধার প্রকৃত স্বরূপ কি তা জানার জন্যে তিনি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। আগামী দশদিন তিনি পানি ছাড়া কিছুই খাবেন না।
বিলু বাবাকে বোঝানোর জন্যে তার ঘরে গেল। হাইপারটেনসনের রুগীকে অনিয়ম করলে চলে না। বিলুর সঙ্গে সোবাহান সাহেবের নিম্নলিখিত কথাবার্তা হল।
বিলু : বাবা তুমি ভাত খাবে না।
বিলু : না।
বিলু : ভাত খাবে না। কারণ তোমাকে ক্ষুধার স্বরূপ বুঝতে হবে?
বাবা : হ্যাঁ।
বিলু : কেন বলতো? ক্ষুধার স্বরূপ বুঝে তোমার হবেটা কি? তুমি যদি একজন কবি হতে তাহলে একটা কথা হত। ক্ষুধা সম্পর্কে কবিতা লিখতে। গদ্যকার হলে আমরা ক্ষুধার অসাধারণ বর্ণনা পেতাম। তুমি যদি রাজনীতিবিদ হতে তাহলেও লাভ ছিল, গরিব দুঃখীদের কষ্ট বুঝতে— তুমি বলতে গেলে কিছুই না। তাহলে তুমি কেন কষ্ট করছ?
বাবা : তুই ঘর থেকে যা। তুই বড় বিরক্ত করছিস।
বিলু : তুমি যদি কিছু না খাও তাহলে মা-ও খাবে না।
বাবা : সেটা তার ব্যাপার। আমি মনস্থির করে ফেলেছি।
বিলু : না খেয়ে কতদিন থাকবে?
বাবা : যত দিন পারি।
বিলু : অনশনে যাবার এই বুদ্ধি তোমাকে কে দিয়েছে বাবা? দোতালার আনিস সাহেব?
বাবা : হ্যাঁ।
বিলু : আমিও তাই ভেবেছিলাম।
বিলু দোতলায় উঠে এল। তার মুখ থম থম করছে।
আনিসের দুটি বাচ্চাই শুয়ে আছে। দুজনের চোখই বন্ধ। কোন সাড়াশব্দ করছে না। কারণ আনিস ঘোষণা করেছে। সবচে বেশি সময় যে কথা না বলে থাকতে পারবে সে পাঁচ টাকা পুরস্কার পাবে। পুরস্কারের পাঁচটা টাকা খামে ভর্তি করে টেবিলের উপর রেখে দেয়া আছে। আনিসের ধারণা পুরস্কারের লোভে চুপ করে থাকতে থাকতে দুজনই এক সময় ঘুমিয়ে পড়বে। যদিও লক্ষণ তেমন মনে হচ্ছে না। টগর এবং নিশা মুখে কথা বলছে না ঠিকই কিন্তু ইশারায় কথা বলছে। দুজনই হাত ও ঠোঁট নাড়ছে। এই সব কীর্তিকলাপ বিলুকে ঢুকতে দেখে থেমে গেল। দুজনই চোখ বন্ধ করে মরার মত পড়ে রইল। যেন ঘুমুচ্ছে।
বিলু বলল, আনিস সাহেব, আমি কি আপনার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলতে পারি?
আনিস হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল। কোমল গলায় বলল, অবশ্যই পারেন।
আপনার সঙ্গে আমার ফরম্যাল পরিচয় হয়নি— আমার নাম….
আনিস বলল, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। আপনার হয়ত মনে নেই। আপনার নাম বিলু, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে পড়েন। একবার ছাদে আমাকে দেখে ভয় পেয়েছিলেন। আপনি বসুন।
না। আমি বসার জন্য আসিনি।
ঝগড়া করতে এসেছেন?
হ্যাঁ।
আনিস হাসতে হাসতে বলল, এটা অদ্ভুত ব্যাপার যে সবাই আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আসে। এতদিন পর্যন্ত এ বাড়ি আছি। অথচ এখন পর্যন্ত একজন কেউ এসে বলল না, আপনার সঙ্গে গল্প করতে এসেছি।
বিলু আনিসের হালকা কথাবাতাঁর ধার দিয়েও গেল না। কঠিন গলায় বলল, আপনি কি বাবাকে উপোষ দিতে বলেছেন?
আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
আপনি কি বাবাকে বুঝিয়েছেন ক্ষুধার স্বরূপ বোঝার জন্য না খেয়ে থাকার প্রয়োজন।
আনিস বিস্মিত হয়ে বলল, উনি কি না খেয়ে আছেন না-কি?
হ্যাঁ।
কি সর্বনাশ। আমি শুধুমাত্ৰ কথা প্রসঙ্গে বলছিলাম যে আমরা যারা সৌখিন সমস্যাবিদ তারা মূল সমস্যা নিয়ে ভাসা ভাসা কথাবার্তা বলি। কারণ মূল সমস্যা আমরা জানি না। ক্ষুধা যে কি ভয়াবহ ব্যাপার তা আমরা অর্থাৎ তথাকথিত মধ্যবিত্ত সমস্যা বিশারদরা জানি না। কারণ আমাদের কখনো ক্ষুধার্তা থাকতে হয় না। রোজার সময় বেশ কিছু সময় ক্ষুধার্ত থাকি সেও খুবই সাময়িক ব্যাপার। তখন আমাদের মনের মধ্যে থাকে সূৰ্যটা ড়ুবার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর খাদ্য দ্রব্য চলে আসবে। কাজেই ক্ষুধার স্বরূপ…
বিলু আনিসকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আপনাকে হাত জোর করে অনুরোধ করছি আপনার এই সব চমৎকার থিওরী দয়া করে নিজের মধ্যেই রাখবেন। বাবাকে এসবের মধ্যে জড়াবেন না। উনি সব কিছুই খুব সিরিয়াসলি নেন। নিজের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেন, আমাদের জন্যেও সমস্যা সৃষ্টি করেন। আমি কি বলছি আপনি কি বুঝতে পারছেন?
জ্বি পারছি।
সুযোগ যখন পাওয়া গেছে তখন আরো একটা কথা আপনাকে বলতে চাচ্ছি। কথাটা হচ্ছে–আপনি যে আপনার বাচ্চাদের মাধ্যমে আমাকে প্ৰেম নিবেদন করেছেন এতে আমি শুধু অবাক হয়েছি। তাই না-দুঃখিত হয়েছি, রাগ করেছি, বিরক্ত হয়েছি। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হৈ চৈ করা আমি পছন্দ করি না বলেই এতদিন চুপচাপ ছিলাম। আজ বলে ফেললাম।
আনিসেকে একটি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিলু নিচে নেমে গেল। আনিস ডাকল, টগর টগর। টগর জেগে আছে। তবু কথা বলছে না। কথা বললেই বাজিতে হারিতে হয়। আনিস বলল, টগর কথা বল এখন কথা বললে বাজির কোন হেরফের হবে না। টগর।
জি।
বিলু মেয়েটিকে তুমি কি বলেছ?
আমি কিছু বলিনি— নিশা বলেছে।
নিশা, তুমি কি বলেছে?
আমার মনে নেই।
মনে করার চেষ্টা কর। তুমি কি বলেছ?
নিশা কোন শব্দ করল না। টগর বলল, নিশা মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছে বাবা। আনিস বলল, তোমার কি মনে আছে নিশা কি বলেছে?
মনে আছে।
বলতো শুনি।
নিশা উনাকে বলেছে— আব্বু আপনাকে বিয়ে করবে। তখন আপনি আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তখন আমরা আপনাকে আম্মু ডাকব।
