বলুন।
বলতে শরম লাগছে। আবার না বলেও পারতেছি না। তারপর ভেবে দেখলাম আপনাদের না বললে কাদের বলল? আপনারা হইলেন বটবৃক্ষ।
ব্যাপারটা কি?
ট্রেইন থাইক্যা নামার সময় বুঝলেন মা জননী পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিয়া দেখি পকেট কাটা।
পকেট কাটা মানে?
ব্লেড দিয়ে পকেট সাফা করে দিছে। মানিব্যাগে চাইরশ তেত্ৰিশ টাকা ছিল, সব শেষ। এখন পকেটে একটা কানা পয়সা নাই। কি বেইজ্জতী অবস্থা চিন্তা করেন মা জননী।
আচ্ছা ওর একটা ব্যবস্থা হবে।
হবে তাতো জানিই। বটবৃক্ষতো শুধু শুধু বলি না। চাইলতা গাছও তো বলতে পারতাম। পারতাম না।
আপনাকে কি মিষ্টি দেব? ঘরে মিষ্টি আছে।
দেন। আমার অবশ্য ডায়াবেটিস। মিষ্টি খাওয়া নিষেধ। এত নিষেধ। শুনলে তো আর হয় না। কি বলেন মা জননী? মিষ্টি খাইতে পারব না, ভালমন্দ খানা খাইতে পারব না, সিগ্রেট খাইতে পারব না–তাইলে খামুটা কি? বাতাস খামু?
দীর্ঘদিন পর এমন্দাদের খুব চাপ খাওয়া হয়ে গেল। পেট দম সম হয়ে আছে। খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা দরকার। এদের বাড়ি ঘর, লোকজন সবার সম্পর্কে একটা ধারণা থাকা দরকার। সে দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। নাতনীটাকে এ বাড়িতে গছিয়ে যেতে হবে। কাজেই পরিবারে সদস্যদের নাড়ি নক্ষত্র জানা থাকা প্রয়োজন। তার কাছে অবশ্যি বেশির ভাগ সদস্যকেই বোকা কিসিমেরে বলে মনে হচ্ছে। এটা খুবই ভাল লক্ষণ। যে পরিবারে সদস্যদের মধ্যে অর্ধেক থাকে বোকা সেই পরিবার সাধারণত সুখী হয়।
এমদাদ ফরিদের ঘরে উঁকি দিলে। ফরিদ চিন্তিত মুখে বিছানায় বসে আছে। ছবির পরিকল্পনা ভেঙে যাওয়ায় তার মন খুবই খারাপ। এমদাদ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলর, বাবাজী কি জেগে আছেন?
ফরিদ কড়া চোখে তাকাল। থমথমে গলায় বলল, আপনি কি এর আগে কাউকে চোখ মেলে বসে বসে ঘুমুতে দেখেছেন যে আমাকে এরকম একটা প্রশ্ন করলেন। দেখেছেন। এইভাবে কাউকে ঘুমুতে?
এমদাদ প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেও অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। সহজ গলায় বলল, জ্বি জনাব দেখেছি। চোখ মেলে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে ঘুমাতে দেখেছি।
কাকে দেখেছেন?
ঘোড়াকে। ঘোড়া দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে ঘুমায়।
লোকটির স্পধাঁয় ফরিদ হতভম্ব।
আমাকে দেখে আপনার কি ধারণা হয়েছে যে আমি একটা ঘোড়া?
জি না।
আপনি বয়স্ক প্ৰবীণ একজন মানুষ বলেই আমি এই দফায় আপনাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে আর করা হবে না।
জ্বি আচ্ছা।
আপনি কখনো আমার ঘরে ঢুকবেন না।
জ্বি আচ্ছা।
দাঁড়িয়ে আছেন কেন চলে যান।
একটা সিগারেটের জন্যে দাঁড়িয়ে আছি। বাবাজী কি সিগারেট খান।
খাই কিন্তু আপনাকে সিগারেট দেয়া হবে না। আপনি যেতে পারেন।
জি আচ্ছা। জিনিসটা অবশ্য স্বাস্থ্যের জইন্যেও খারাপ।
এমদাদ বের হয়ে এল। ফরিদের ঘরের ঘটনা তাকে খুব একটা বিচলিত করল না। বরংচ সে খানিকটা মজাই পেল। বড় ধরনের বেকুব সংসারে থাকা ভাল। যে সংসারে বড় ধরনের কোন বেকুব থাকে সেই সংসারে কখনো ভয়াবহ কোন সমস্যা হয় না। বোকাগুলি কোন না কোনভাবে সমস্যা পাতলা করে দেয়। এমদাদ রাস্তায় বের হল। চা খাওয়ার পর তার একটা সিগারেট দরকার।
অপরিচিতি মানুষের কাছে টাকা চাওয়া সমস্যা কিন্তু সিগারেট চাওয়া কোন সমস্যা না। এমদাদ আধা ঘণ্টার মধ্যে ছটা সিগারেট জোগাড় করে ফেলল। তার টেকনিকটা এ রকম–সিগারেট ধরিয়ে কোন ভদ্রলোক হয়ত আসছে–এমদাদ হাসি মুখে এগিয়ে যাবে।
স্লামালিকুম ভাইসাব।
অপরিচিত ভদ্রলোক থমকে দাঁড়িয়ে বিস্মিত গলায় বললেন, আমাকে কিছু
বলছেন?
জ্বি।
বলুন-
আমার হার্টের অসুখ। ডাক্তার সিগারেট বন্ধ করে দিয়েছে। লুকিয়ে চুকিয়ে যে একটা টান দিব সেই উপায় নাই। ঘর থেকে একটা পয়সা দেয় না। ভাই এখন আপনি যদি একটা সিগারেট দেন জীবনটা রক্ষা হয়।
ডাক্তার যখন নিষেধ করেছে তখন তো সিগারেট খাওয়া উচিত হবে না।
কয়দিন আর বাঁচব বলেন? এখন সিগারেট খাওয়া না খাওয়া তো সমান।
এরপর আর কথা চলে না। অপরিচিত ভদ্রলোক পকেটে হাত দিয়ে সিগারেট বের করেন। এমদাদ হাসি মুখে বলে, দুটা দিয়ে দেন ভাই সাহেব। রাতে খাওয়ার পর একটা খাব।
এমদাদ যখন সিগারেটের সঞ্চয় বাড়াতে ব্যস্ত তখন বাড়ির ভেতর ছোট্ট একটা নাটক হল। মিনু তিনশ টাকা হাতে নিয়ে পুতুলকে বললেন, মা এই টাকাটা তোমার দাদাকে দিও। পুতুল বিস্মিত হয়ে বলল, কিসের টাকা?
উনার মানিব্যাগ পকেটমার হয়ে গেল। উনি বলছিলেন।
পুতুল কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, কই দাদাজানের কোন টাকা পকেটমার হয় নাই। ঐতো দাদাজানের মানিব্যাগ।
তবু তুমি টাকাটা রাখা।
না না— আমি টাকা রাখব না।
মিনু বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন— পুতুলের চোখে পানি এসে গেছে। তিনি বেশ অবাক হলেন। মিনু কোমল গলায় বললেন, কি ব্যাপার পুতুল? পুতুল ধরা গলায় বলল— দাদাজান মিথ্যা কথা বললে আমার বড় কষ্ট হয়।
হয়ত মিথ্যা কথা না। হয়ত উনি ভুলে গেছেন।
না। উনি ভুলেন নাই। উনি সহজে কিছু ভুলেন না। পুতুলের কান্নার বেগ ক্রমেই বাড়তে লাগল। মিনু পুরোপুরি হকচকিয়ে গেলেন। এই মেয়েটা মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্য রকম। তিনি নিতান্ত অপরিচিত এই মেয়েটির প্রতি এক ধরনের মমতা অনুভব করলেন।
নিরিবিলি বাড়িতে ক্রাইসিস তৈরি হতে বেশি সময় লাগে না। রাত আটটা দশ মিনিটে একটা ক্রাইসিস তৈরি হয়ে গেল। অবশ্যি এটা যে একটা ক্রাইসিস শুরুতে তা বোঝা গেল না। রাতের টেবিলে সবাই খেতে বসেছে। সোবাহান সাহেব হাত ধুয়েছেন। তাঁর প্লেটে বিলু ভাত দিতে যাচ্ছে তিনি বললেন, স্টপ।
