দুজন চায়ের কাপ নিয়ে বসেছে। বিলু এক হাতে বাবাকে জড়িয়ে রেখেছে আর এত ভাল লাগছে।
বাসার খবর বল বাবা।
কোন খবরটা শুনতে চাস?
মামা নাকি ছবি বানাচ্ছে? মিলি চিঠি লিখেছিল।
সোবাহান সাহেব মুখ বিকৃত করে বললেন, গাধাটা বড় যন্ত্রণা করছে। রিহার্সেল টিহার্সেল কি কি করছে। বিকেলে বাসায় থাকা মুশকিল।
বিলু, আপন মনে হাসল। ফরিদ তার খুবই পছন্দের মানুষ। বিলু হালকা
গলায় বলল, মামার পাগলামী কমেনি?
না বেড়েছে। আমার মনে হয় কিছুদিন পর তালা বন্ধ করে রাখতে হবে।
ধরে বেঁধে মামার একটা বিয়ে দিয়ে দাও।
ঐ সব কথাই মনে আনবি না। একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করার কোন মানে হয়?
বিলুচায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঘর থেকে ঘরে ঘুরতে লাগল। মাত্র চার মাস পরে সে ফিরেছে অথচ মনে হচ্ছে যেন কত যুগ পরে ফিরল। সব কেমন যেন অচেনা।
আরো আফা কোন সময়ে আইলেন? কি তাজ্জব!
বিলুপ্ৰথম দেখায় চিনতে পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখে চশমা, মুখ ভর্তি দাড়ি চেনা ভঙ্গিতে কে যেন হাসছে।
আফা আমি কাদের।
তুমি দাড়ি কবে রাখলে কাদের?
সিনেমায় পাট করতাছি আফা— মামার সিনেমা, আমার হিরোর পাট। খেয়া নৌকার মাঝি।
তাই নাকি? খেয়া নৌকার মাঝির বুঝি, দাড়ি থাকতে হয়?
ডিরেকটর সাব চাইছে।
বিলু হেসে ফেলল, হাসতে হাসতে বলল— তোমরা বেশ সুখে আছ বলে মনে হচ্ছে কাদের।
আর সুখ। সিনেমা করা কি সোজা যন্ত্রণা? চিন্তা-ভাবনা আছে না? এইটা কি পানি-ভাত যে মরিচ দিয়া এক ডলা দিলাম। আর মুখের মইদ্যে ফেললাম?
বিলু অনেক কষ্টে মুখের হাসি আটকাল। তার খুব মজা লাগছে। কাদেরের মুখও আনন্দে উজ্জ্বল। কাদেরের ধারণা এই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা হচ্ছে বিলু আফা। এ বাড়ির সবাই তাকে তুই করে বলে, একমাত্র বিলু আফা বলে তুমি করে। এক গ্লাস পানির দরকার হলে বিলু আফা জনে জনে হুকুম দেয় না। নিজের পানি নিজে নিয়ে আসে। একবার কাদেরের জ্বর হল। চাকর-বাকরের জ্বর হলে কে আর খোঁজ করে। ঘরের এক কোণায় কথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে হয়। কাদের তাই করেছে, শুয়ে আছে। জ্বর খুব বেশি। চারপাশের পৃথিবী কেমন হলুদ হলুদ লাগছে। আচ্ছান্নের মত অবস্থা। এমন সময় লক্ষ্য করল কে যেন তার মাথায় পানি ঢালছে। ঠাণ্ডা পানি। বড় আরাম লাগছে। কাদের চোখ মেলে দেখে বিলু। এক মনে পানি ঢালছে এবং রহিমার মাকে কড়া গলায় বলছে, জ্বর এত বেড়েছে, তুমি লক্ষ্য করলে না এটা কেমন কথা রহিমার মা? একশ চার টেম্পারেচার। কত সময় ধরে এক রকম জ্বর কে জানে।
রহিমার মা বলল, আমারে দেন। আফা। আমি পানি ঢালি।
থাক, তোমার আর কষ্ট করতে হবে না। তবে তোমার উপর আজ আমি খুব রাগ করেছি।
সেই প্ৰবল জুরের ঘোরের মধ্যে কাদের ঠিক করে ফেলল বড়। আপার জন্যে যদি কোনদিন প্রয়োজন হয় সে জীবন দিয়ে দিবে। বড়। আপার যদি কোন শক্ৰ থাকে–তাকে খুন করে সে ফাঁসি যাবে।
দুপুর নাগাদ গত তিন মাসে এ বাড়িতে কি কি ঘটেছে বিলু জেনে গেল। কোন কোন ঘটনা তিনবার চারবার করে শুনতে হল। একবার বলল মিলি, একবার মা, একবার কাদের। প্রতিবারেই বিলু ভান করল যে সে ঘটনাটা প্রথম বারের মত শুনছে।
বিলু আসা উপলক্ষে মিলি ইউনিভার্সিটিতে গেল না। সারাক্ষণ বড় আপার পেছনে পেছনে ঘুরতে লাগল এবং অনবরত কথা বলতে লাগল।
টগর আর নিশার সঙ্গে তোমার এখনো দেখা হয়নি— পৃথিবীতে এরকম দুষ্ট ছেলেপুলে আছে, না দেখলে তোমার বিশ্বাস হবে না।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ। তবে মুখের দিকে তাকালে তোমার মনে হবে এরা দেবশিশু। ভয়ানক ইন্টেলিজেন্ট। ওদের মা নেই, তোমাকে তো আগেই চিঠি লিখে জানিয়েছি।
বিলু প্ৰসঙ্গ পাল্টে বলল, আচ্ছা তোর ঐ ডাক্তার সাহেবের খবর কি?
মিলি হকচকিয়ে বলল, আমার ডাক্তার সাহেব মানে? আমার ডাক্তার সাহেব বলছি কেন?
এম্নি বললাম, তোর চিঠিতে ভদ্রলোকের কথা প্রথম জানলাম তো। তুই লজ্জায় এমন লাল হয়ে যাচ্ছিস ব্যাপার কি? সত্যি করে বলতো–উনাকে কি তোর পছন্দ?
মিলি রেগে গেল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, কি যে তুমি বল আপা। ঐ ছাগল–কে আমি পছন্দ করব কেন? আমার তো আর মাথা খারাপ হয় নি।
তুই রেগে মেগে কেমন হয়ে গেছিস। এটাতো সন্দেহজনক।
আমি সত্যি কিন্তু রাগছি আপা।
ভদ্রলোককে খবর দে না, আমার দেখতে ইচ্ছে করছে।
তাকে খবর দেবার কোন দরকার নেই। দিনের মধ্যে তিনবার করে আসছে। রিহার্সেল করছে। মামার সিনেমায় সেও তো আছে।
বাহ ভালতো। তোমরা দুজন আবার নায়ক-নায়িকা না তো?
রাগিয়ে দিওনাতো। আপা। এতদিন পর এসেছ বলে ঝগড়া করলাম না। নয়ত প্ৰচণ্ড ঝগড়া হয়ে যেত। এর মধ্যে আবার নায়ক-নায়িকা কি?
বিলু হাসি মুখে ফরিদের ঘরে ঢুকল। বাড়ির সবার সঙ্গেই কথা হয়েছে শুধু মামার সঙ্গে কথা হয় নি।
ফরিদ মাথা নিচু করে কি যেন লিখছে। বিলুকে এক নজর দেখেও সে লিখেই যেতে লাগল। যেন বিলুকে সে চেনে না।
আসব মামা?
না।
না বললে তো হবে না। এতদিন পর এসেছি তোমার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথাও বলব না?
না। কাজ করছি। আগামীকাল হে মাছ ছবির অন দ্যা স্পট রিহার্সেল। নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। লাস্ট মিনিট চেঞ্জ যা করার এখনি করতে হবে।
তাই বলে তোমাকে আমি সালামও করতে পারব না?
বিলু এগিয়ে এসে ফরিদের পা ছুঁয়ে সালাম করল। ফরিদ বলল, তুই এত ভাল মেয়ে কি করে হলি রে বিলু? ছোটবেলায় তো এত ভাল ছিলি না। যতাই দিন যাচ্ছে ততাই ভাল হচ্ছিস।
