ওয়ালাইকুম সালাম। তুমি করে বললাম। কিছু মনে করনিতো? আমি মিলির মামা।
জ্বি আমি জানি। আসুন ভেতরে আসুন।
ভেতরে যাব না। কাজের কথা সেরে চলে যাব। খুব ব্যস্ত। ছবির স্ত্রীপ্ট করছি, মাছ নিয়ে শর্ট ফ্রিম বানাচ্ছি। নাম হচ্ছে হে মাছ।
তাই না কি?
হ্যা! তাই। এখন কথা হচ্ছে তুমি কি ছবিতে অভিনয় করবে? এক গাদা কথা বলার দরকার নেই। বল হ্যাঁ কিংবা না।
আনিস হকচকিয়ে গেল। কেউ তাকে অভিনয়ের জন্যে ডাকতে পারে তা তার মাথায় কখনো আসে নি। ফরিদ বলল, আমার ছবিতে একটা চোরের ক্যারেক্টার আছে। এই জন্যেই তোমার কাছে আসা নয়ত আসতাম না। তোমার চেহারায় একটা চোর চোর ভাব আছে।
আনিস হতভম্ব হয়ে বলল, আমার চেহারায় চোর চোর ভাব আছে?
হ্যাঁ আছে।
আনিস বিস্মিত গলায় বলল, নিজের সম্পর্কে আজে বাজে কথা অনেক শুনেছি, কিন্তু আমার চেহারা চোরের মত এটা এই প্রথম শুনলাম।
সত্যি কথা আমি পেটে রাখতে পারি না। বলে ফেলি। তুমি আবার কিছু মনে করনি তো?
জ্বি না, কিছু মনে করিনি।
অভিনয় করবে, না করবে না?
করব। এ জীবনে অনেক কিছুই করেছি। অভিনয়টাই বা বাদ থাকবে কেন?
ফরিদ হৃষ্টচিত্তে নিচে নেমে এল। এখন ডাক্তার ছোকরা রাজি হলেই কাজ শুরু করা যায়। তবে ছোকরার ব্রেইন বলে কিছু নেই। তার কাছ থেকে অভিনয় আদায় করা কষ্ট হবে। ব্যাটা হয়তো রাজিও হতে চাইবে না। ফরিদের ধারণা ডাক্তার এবং ইনজিনিয়ার এই দুই সম্প্রদায়, অভিনয় কলার প্রতি খুব উৎসাহী নয়। আজ রাতেই ব্যাপারটা ফয়সালা করে ফেললে কেমন হয়?
ফরিদ কাদেরকে পাঠাল মনসুরকে ডেকে আনতে। মনসুর সঙ্গে সঙ্গে চলে এল। মনে হল যেন কাপড় পরে এ বাড়িতে আসার জন্যে তৈরি হয়েই ছিল। মনসুরের সঙ্গে ফরিদের নিম্নলিখিত কথোপকথন হল।
ফরিদ : তোমাকে একটি বিশেষ কারণে ডেকেছি। অসুখ বিসুখের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই।
মনসুর : জ্বি বলুন।
ফরিদ : আচ্ছা স্ত্রী হিসাবে মিলি কি তোমার জন্যে মানানসই হবে বলে মনে হয়? মিলি আবার একটু বেঁটে, ভেবে চিন্তে বল।
মনসুর : (তোতলাতে তোতলাতে) জ্বি মামা, অবশ্যই হবে। বেঁটে কি বলছেন? পারফেক্ট হাইট। মানে আমার ধারণা-মানে—
ফরিদ : মিলি স্বামী হিসেবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে?
মনসুর : অবশ্যই পারব। একশ বার পারব।
ফরিদ : তাহলে কাল থেকে রিহার্সেল শুরু করে দাও।
মনসুর : (বিস্মিত) কিসের রিহার্সেল?
ফরিদ : মিলি করবে জেলে স্ত্রীর ভূমিকা আর তুমি হচ্ছে জেলে।
মনসুর : আমি মামা কিছুই বুঝতে পারছি না।
ফরিদ : ছবি বানাচ্ছি। শর্ট ফ্রিম। সেখানে তোমার ভূমিকা হচ্ছে অভাব অনটনে পর্যুদস্ত জেলে, আর মিলি তোমার স্ত্রী।
মনসুর : ছবির কথা বলছেন? ফরিদ : অফকোর্স ছবির কথা বলছি। তুমি কি ভেবেছিলে?
মনসুর : (শুকনো গলায়) একগ্লাস ঠাণ্ডা পানি খাব। একগ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেয়ে মনসুর ক্ষীণ স্বরে বলল, মিস মিলি কি আমার সঙ্গে অভিনয় করতে রাজি হবেন?
সেতো রাজি হয়েই আছে।
তাই নাকি–আরেক গ্রাস পানি খাব।
মনসুর দ্বিতীয় গ্লাস পানি খেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জানাল যে, সে অতি আগ্রহের সঙ্গে মিস মিলির অভিনয় করবে।
তুমি আগে অভিনয় করেছ?
জ্বি না। অসুবিধা হবে না–আমি শিখিয়ে দেব। অভিনয় কঠিন কিছু না। জাল ফেলতে জান?
শিখে নেবে।
জ্বি আচ্ছা।
মাথাটা কাল পরশু কামিয়ে ফেল।
ডাক্তার হকচকিয়ে গেল। টোক গিলে ভয়ে ভয়ে বলল, কি বললেন মামা?
মাথাটা কামিয়ে ফেলতে বললাম। জেলেদের মাথায় থাকে কদমছাট চুল। মাথা না কামালে ঐ জিনিস পাব কোথায়? কোন অসুবিধা আছে?
জ্বি না। কোন অসুবিধা নেই। আপনি যা বলবেন তাই করব।
ভেরি গুড।
অভিনয় নিয়ে মিস মিলির সঙ্গে কি একটু কথা বলতে পারি?
ফরিদ বিরক্ত হয়ে বলল, তার সঙ্গে আবার কি কথা? সে অভিনয়ের জানে কি? যা জানতে চাইবে আমাকে প্রশ্ন করলেই জানবে।
ডাক্তার বলল, জি আচ্ছা।
ফজরের নামায
ফজরের নামায শেষ করে সোবাহান সাহেব তসবি হাতে বাগানে খানিকক্ষণ হাঁটেন। আজও তাই করছেন। হঠাৎ মনে হল কে যেন গেটে টোকা দিচ্ছে। এত ভোরে কে আসবে এ বাড়িতে? তিনি বিস্মিত হয়ে গেট খুললেন–বিলুদাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপারটা বিশ্বাসই হল না। বিলুর মেডিকেল কলেজ খোলা। কদিন পরই পরীক্ষা। এই সময় সে ঢাকায় আসবে কেন? আনন্দ ও বিস্ময়ে সোবাহান সাহেব অভিভূত হয়ে গেলেন।
আরে তুই? বিলু, মা, তুই?
বিলু বেবীটেক্সী ভাড়া মেটাতে মেটাতে বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল। ভোরবেলার আলোয় হলুদ রঙের শাল জড়ানো বিলুকে অন্সরীর মত লাগছে। তার এই মেয়ে বড় সুন্দর। স্বর্গের সব রূপ নিয়ে এই মেয়ে পৃথিবীতে চলে এসেছে।
ভাড়া মিটিয়ে রাস্তার উপরই বিলু নিচু হয়ে বাবার পা স্পর্শ করল। নরম গলায় বলল, তুমি এতো রোগা হয়েছ কেন বাবা? সোবাহান সাহেবের চোখে পানি এসে গেল। তাঁর বড় মেয়ের সামান্য কথাতেই তার চোখ ভিজে উঠে। তিনি ধরা গলায় বললেন,
কলেজ ছুটি না-কি মা?
ছুটি না— ছাত্ররা মারামারি করে সব বন্ধ-টন্ধ করে দিয়েছে। একমাত্র আমাদের মেডিকেল কলেজটাই খোলা ছিল। ঐটাও বন্ধ হল।
একা এসেছিস?
না। সব মেয়েরা একসঙ্গে এসেছি। সন্ধ্যাবেলা লঞ্চে উঠলাম, ঢাকা পৌঁছলাম রাত তিনটায়। একটু সকাল হতেই চলে এসেছি।
ভাল করেছিস মা। খুব ভাল করেছিস।
সোবাহান সাহেবের ইচ্ছা করছে চেঁচিয়ে বাড়ির সবার ঘুম ভাঙাতে, তিনি তা করলেন না। নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাসের চুলায় কেতলি বসিয়ে দিলেন। বড় মেয়ের সঙ্গে কিছু সময় একা একা থাকার আনন্দওতো কম নয়।
