শুনে খুশী হলাম মামা।
খুব খুশী হবার কোন কারণ নেই। বুদ্ধি কম মানুষরাই সাধারণত ভাল হয়। আমার ধারণা যত দিন যাচ্ছে তোর বুদ্ধি তত কমে যাচ্ছে।
বিলু খিলখিল করে হেসে উঠল। এমন গাঢ় আনন্দে অনেক দিন সে হাসে নি। এই মানুষটাকে তার বড় ভাল লাগে।
সোবাহান সাহেব তাঁর মনের মত একটা প্ৰবন্ধ পেয়েছেন। প্ৰবন্ধের নাম থাইল্যান্ডে মাগুর মাছের চাষী। এই মাছের চাষে বিশাল পুকুর কাটার দরকার নেই–ট্যাংক বা চৌবাচ্চা জাতীয় জলাধার থাকলেই হল। মাছের খাবারের জন্যেও আলাদা ভাবে কিছু ভাবতে হবে না। সঙ্গে হাঁস-মুরগির চাষ করতে হবে। মাছের খাবার হবে. সোবাহান সাহেব থমকে গেলেন। মাছের খাবার হিসেবে যে সব জিনিসের উল্লেখ করা হয়েছে তা তার পছন্দ হচ্ছে না।
স্লামালিকুম স্যার।
সোবাহান সাহেব পত্রিকা থেকে মুখ তুলে দেখলেন, আনিস দাঁড়িয়ে আছে। বিব্রত মুখ ভঙ্গি।
কিছু বলবে?
জ্বি।
বল।
এই মাসের বাড়ি ভাড়াটা স্যার দিতে পারছি না।
বাড়ি ভাড়া কি তোমার কাছে চাওয়া হয়েছে?
জ্বি না।
তাহলে বিরক্ত করছ, কেন? পড়ার মাঝখানে একবার বাধা পড়লে কনসানট্রেসন কেটে যায়।
সরি স্যার। কি পড়ছেন?
থাইল্যান্ডের মাগুর চাষ।
আপনি তাহলে মাছের ব্যাপারটা নিয়ে সত্যি খুব ভাবছেন।
হ্যাঁ ভাবছি।
আপনি বাংলাদেশ মাছে মাছে ছয়লাপ করে দিতে চান তাই না স্যার?
হ্যাঁ চাই।
এখন আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন তাহলে আমি একটা মজার কথা বলতে চাই— শায়েস্তা খাঁর আমলে বাংলাদেশ খুব সস্তা গন্ডার দেশ ছিল। প্রচুর খাদ্য ছিল, মাছ মাংস ছিল। মূল্য ছিল নাম মাত্র। অথচ তখনো এ দেশের প্রচুর লোক ছিল অনাহারে। নাম মাত্র মূল্যেও খাদ্য কেনার মত অর্থ তাদের ছিল না। যদি আপনিও সত্যি সত্যি এই দেশ একদিন মাছে মাছে ছয়লাপ করে দেন। তাতেও লাভ হবে না। যারা এখন মাছ খেতে পারছে না। তারা তখনো খেতে পারবে না। তাদের টাকা নেই। মূল সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
কোথায়?
আরেকদিন আপনাকে বলব। আজ আমার একটু কাজ আছে। হে মাছ ছবির অন লোকেসন রিহার্সেল হবে। আপনি হয়ত জানেন না। ঐ ছবিতে আমার একটা রোল আছে। স্যার যাই স্নামালিকুম।
আনিস চলে গেল। দীর্ঘ সময় সোবাহান সাহেব মূর্তির মত রইলেন। তাঁর মন আনিসের কথায় সায় দিচ্ছে। তিনি আসল সমস্যা ধরতে পারেন নি। নকল সমস্যা নিয়ে মাতামাতি করছেন। দেশের লোক যদি খেতেই না পারে তাহলে কি হবে মাছের চাষ বাড়িয়ে?
হে মাছ ছবির অন লোকেসন রিহার্সেল শুরু হয়েছে। জায়গাটা হচ্ছে বুড়িগঙ্গার পার। বেশ নিরিবিলি। সঙ্গে ক্যামেরা নেই বলে লোকজন জড়ো হয়নি।
ফরিদের মাথায় ক্রিকেট আম্পায়ারদের টুপীর মত সাদা একটা টুপী। সত্যজিৎ রায় না কি এরকম একটা টুপী পরে সুটিং করেন। ফরিদের হাতে কালো একটা চোঙ। এই চোঙের মাধ্যমে নৌকায় বসা ডাক্তার এবং কাদেরের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। ডাঙায় আছে মিলি, বিলু এবং আনিস। আনিসের বাচ্চা দুটিও আছে। এরা মনের আনন্দে ছুটাছুটি করছে।
নৌকায় ডাক্তারকে খুব নার্ভাস দেখাচ্ছে। তার হাতে একটা জাল। গোল করে জাল ফেলার প্র্যাকটিস সে ভালই করছে। জাল এখন সে ফেলতে পারে। তবে নৌকা দুলছে, দুলুনির মধ্যে জাল ঠিক মতো ফেলতে পারবে কিনা। এই নিয়ে সে চিন্তিত। ডাক্তারের পরনে জেলের পোশাক তবে চুল এখনো ছাটা হয়নি। কাদের বৈঠা নিয়ে বসে আছে। তাকে উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। ফরিদের নির্দেশে তারা নৌকা ছেড়ে দিল। নৌক মাঝ নদীতে যাবার পর অভিনয় হবে। ডাক্তার ভীত গলায় বলল, কাদের ভয় লাগছে।
কাদের বলল, ভয়ের কি আছে ডাক্তার সাব? উপরে আল্লাহ নিচে মাডি।
মাটি কোথায়? নিচে তো পানি।
একই হইল। আল্লাহর কাছে মাডি যা, পানিও তা। আল্লাহর চোউখ্যে সব সমান।
সাঁতার জানি না যে কাদের। সাঁতার আমিও জানি না ডাক্তার সাব। মরণতো একদিন হইবই। অত চিন্তা করলে চলবে না। পানিতে ড়ুইব্যা মরার মজা আছে।
ডাক্তার বিস্মিত হয়ে বলল, মরার মধ্যে আবার কি মজা?
শহীদের দরজা পাওয়া যায়। হাদিস কোরানের কথা।
শহীদের দরজার আমার দরকার নেই কাদের। নৌকা এত দুলছে কেন?
ডাঙ্গা থেকে চোঙ মারফত ফিরিদের নির্দেশ ভেসে এল–ডাক্তার স্টার্ট করে দাও-রেডি ওয়ান-টু-এ্যাকসান।
এ্যাকসানে যাবার আগেই দৃশ্য কাট হয়ে গেল। ফরিদ বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠল— কাট, কাট, এই হারামজাদা কাদের চশমা পরেছিস কেন? খোল চশমা।
কাদের চশমা খুলল। সে খুব শখ করে চশমা পরেছিল।
এ্যাকসান। ডাক্তার তুমি বিষণ্ণ চোখে আকাশের দিকে তাকাও। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেল। আবার তাকাও আকাশের দিকে। গুড। কাদের তুই কানের ফাঁকে রাখা বিড়ি ধরা। গুড। পানিতে থুথু ফেল। পুরো ব্যাপারটা ন্যাচারেল হতে হবে। ডাক্তার তুমি জলকে তিনবার সালাম কর। গুড। ভাল হচ্ছে। এই বার জাল ফেলা।
ডাক্তার জাল ফেলল। আশ্চর্য কাণ্ড পানিতে শুধু জাল পড়ল না,জালের সঙ্গে খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ডাক্তারও পড়ে গেল। জাল এবং ডাক্তার দুই-ই মুহুর্তের মধ্যে অদৃশ্য, ব্যাপারটা ঘটল চোখের পলকে।
কাদের বিড় বিড় করে বলল, বিষয় কিছুই বুঝলাম না।
ফরিদ হতভম্ব।
মিলি বলল, মামা ডাক্তার তো ড়ুবে গেছে।
ফরিদ থমথমে গলায় বলল, তাইতো দেখছি। এই গাধা কি সাঁতারও জানে না? গরু গাধা নিয়ে ছবি করতে এসে দেখি বিপদে পড়লাম।
ডাক্তারের মাথা ভূস করে ভেসে উঠল। কি যেন বলে আবার ড়ুবে গেল। আবার ভাসল, আবার ড়ুবল। ফরিদ বলল, ছেলেটাতো বডড যন্ত্রণা করছে।
