কাসু কাঁধের ওপর থেকেই হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করতে থাকে।
করিম বকশের ধাক্কা খেয়ে শফির মা বসে পড়েছিল মাটির ওপর। সে অবস্থায়ই সে জিরিয়ে নেয় আর চেয়ে দেখে করিম বকশের কাণ্ড।
কিছু দূর যাওয়ার পর আর করিম বকশকে দেখা যায় না। পানি খেতের আড়ালে পড়ে গেছে সে এখন। সোজা হয়ে দাঁড়ালে করিম বক্শের কীর্তি দেখা যেত। কিন্তু শফির মা তখনও বসে হাঁপাচ্ছে।
১৪. আজ মায়মুনের বিয়ে
৯ই অগ্রহায়ণ। আজ মায়মুনের বিয়ে। লতিফ মিয়ার বাড়ী গিয়ে এই শুভ দিনটি জেনে এসেছিল শফির মা।
লতিফ মিয়া তার পকেট পঞ্জিকা বের করে। একটা পাতার ওপর নজর দিয়ে সে আপন মনেই বলে—চন্দ্র রাজ্জা বুধ মন্ত্রী। তারপর শুভকার্যের নির্ঘণ্ট দেখে বলে দেয়—অগ্রাণ মাসের ১ তারিখে একটা শুভদিন আছে। আর একটা আছে শেষাশেষি-২৭ তারিখ। এছাড়া অগ্রাণ মাসে আর দিন নেই।
লতিফ মিয়া তার পঞ্জিকা বন্ধ করে। পঞ্জিকার ওপরের রাশিচক্র অঙ্কিত মলাটের দিকে তাকিয়ে লতিফ মিয়ার গণনায় শফির মার মনে একটু সন্দেহ জাগে না। সে ভাবে—এমন বই-এর গণনা কখনও ভুল হতে পারে না। লতিফ মিয়াকে দাওয়াত করে শফির মা বিদায় হয়। পথে আসতে আসতে সে শুভদিনটি মনে মনে ইয়াদ করে।
গণনা নির্ভুল সন্দেহ নেই। কারণ, এই তারিখে আশেপাশে আরো অনেক বাড়ীতে বিয়ের ধুম লেগেছে। গায়ের জমিদার বাড়াতেও আজ বিয়ে। বাজারে দুধ কিনতে গিয়ে তা টের পাওয়া যায়। দুধের সর ছয় আনা থেকে বেড়ে এক টাকা হয়। মাছের দর চড়ে হয় দ্বিগুণ। বাজারের অর্ধেক দুধ, ঝাকায় ঝাকায় বাছা-বাছা রুই কাতলা মাছ যায় জমিদার বাড়ী।
হাসু ও শফি আসে বিয়ের বাজার করতে। চার সের দুধ, দুটো শোল মাছ, দুটো লাউ আর চাল-ডাল এবং আরো কিছু সওদা নিয়ে তারা বাড়ী আসে।
বাজার-ফেরত তিন টাকা ও কয়েক আনা হাসু মা-র কাছে ফেরত দেয়।
জয়গুন বলে বারো টাকা যে খতম করলি, আরো ত অনেক খরচ আছে।
শফির মা বলে—থুইয়া দ্যাও। অতহত দরকার নাই। পনেরো টাকা দিছে মোট্টে। ওয়াগ ট্যাকা দিয়া ওয়াগ খাওয়াই। আমরা খরচ করতে যাইমু কোন্ দুক্খে?
—গোশত অইলে ভালা অইত।
থুইয়া দে, আবার গোশত। আরো পাঁচখান ট্যাকা দিবার কইছিলাম, হেইয়া দিল না, কিরপিন।
—দিছে পনেরো টাকা। আইব ত ভেড়ার পালের একপাল।
—আহনের কত দশ জনের। কয়জন আহে, আল্লা মালুম।
-তাইত আমি আগেই কইছিলাম, মায়মুনের বিয়াতে টাকা নিমু না। পান-শরবত খাওয়াইয়া বিদায় করমু।
—হেইডা ভালা আছিল।
—কিন্তু কেও হোনলা না আমার কথা। অহন ট্যাকা নিয়া বদনামের ভাগী অই।
—তুমি কিছু চিন্তা কইর না, হাসুর মা। শইল মাছ আর কদু দিয়া একটা ঘণ্ড, ডাইল। আর দুধ-বাতাসা, ব্যস! আবার কি! এ খাইয়া তোর বেয়াই সোলেমান খাঁ তার বউর কাছে, গল্প ছাড়বো! তারিফ করবো তোর রান্দার।
জয়গুলোর হাসি পায়।
নওশা আসবে সন্ধ্যার পরে। বিকেল বেলায় হাসু ও শফি পাড়ার থেকে হোগলা যোগাড় করে এনে পেতে দেয় অতিথিদের বসবার জন্যে। উঠানের এক পাশে পা ধোয়ার জন্যে পানি ভরা কলসী ও বদনা রেখে দেয়। তার পাশে রাখে জলচৌকি ও খড়ম।
সময়টা ভালো। বৃষ্টি-বাদলের ভয় নেই।
সন্ধ্যার পর বরযাত্রীরা আসে। দুলাও আর সকলের মত পায়ে হেঁটেই আসে। গরীবের বিয়েতে পাল্কীর কথা কেউ কল্পনা করতেও পারে না। পাল্কীর ভাড়ায় একটা পুরোদস্তুর বিয়ে স্বচ্ছন্দে হয়ে যেতে পারে।
বেড়ার ফাঁক দিয়ে জয়গুন জামাই দেখে নেয়। গোলাপী মাদ্রাজী লুঙ্গি পরনে, গায়ে বেগুনী রঙের পাঞ্জাবী আর মাথায় লাল টুপি। তার মুখের বসন্তের কালো কালো দাগ আর ছাগলে দাড়ি কয়গাছা জয়গুনের কাছে বিশ্রী ঠেকে। বয়স পঁচিশের ওপরে হবে, জয়গুন অনুমান করে। মেয়েকে নদীতেই ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে। তা ছাড়া আর কি!
দুলা এবং আর যে দু’এক জনের পায়ে জুতো আছে, তারা উঠে গিয়ে বিছানায় বসে। বাকী সবাই এক এক করে জলচৌকির ওপর বসে পা ধোয়। তারপর বিছানার পাশে আর একজনকে খড়ম ছেড়ে দিয়ে মজলিশে এসে বসে।
সকলের শেষে জুতো পায়ে থপথপ শব্দ করতে করতে আসে গদু প্রধান। বেঢপ চটি জোড়া বিছানার পাশে রাখতে ভরসা হয় না তার। শফিকে কাছে পেয়ে জিজ্ঞেস করে—এই হানে রাখলে থাকবো ত? না চুরি যাইব?
মজলিশের মাঝ থেকে একজন বলে—গেলই বা চুরি। পুরান গেলে নতুন আনবেন।
—তোমরা এহনও নাবালক। জানো, পুরান জোতা আর পুরান চাদরের মর্ম? পুরান জোতা আর পুরান চাদরের সর্মান বেশী।
জুতো জোড়া হাতে করে যেতে যেতে আবার বলে—নতুন জোত পায়ে দিয়ে মজলিশে গেলে মাইনষে কি মনে করে, জানো? মনে করে, নতুন হিখছে জোতা পায় দিতে।
মৃদু হাসির গুঞ্জন শোনা যায়।
গদু প্রধান মসজিদের মৌলবী সাহেবের পাশে জায়গা বেছে নেয়। বসবার আগে জুতো জোড়া পেছনে হোগলার নিচে রেখে দেয়।
গদু প্রধান এসে জুতো চুরির যে প্রসঙ্গ তুলে দেয়, তা আর থামতে চায় না। কার বিয়েতে কার জুতো চুরি গিয়েছিল, কার চামড়ার জুতো কার রবারের জুতোর সঙ্গে বদল হয়েছিল—এসব গল্প।
সবাই যখন গল্পে মেতে আছে, তখন হাসু এক ফাঁকে লোক গুণে যায়। জয়গুনকে গিয়ে বলে বেবাকে তেইশ জন, মা।
জয়গুন মাথায় হাত দেয়। সব শুদ্ধ পনেরো জনের আয়োজন করা হয়েছে। এখন কি উপায় করা যায় সে ভেবে উঠতে পারে না।
শফির মা-কে ডেকে বলে—তুমি সামলাও। আমি আর পারি না, বইন।
—কোন চিন্তা নাই। এক কাম কর। চাইর সের চাউলের ভাত চাপাইয়া দে। আমি ডাইলে দুই বদনা আর দুধে এক বদনা পানি মিশাইয়া দেই। যেমুন মাছ, তেমুন বড়ি না অইলে কি দুইন্যাই চলে? পালবরাদ্দে আইছে যেমুন, খাইব তেমুন ঝড়া পানি।
