জুতো চুরির চাপ ছেড়ে কার জমিতে কি রকম ধান হবে, কোন বিলের ধানে পোকা। ধরেছে, কার বছরের খোরাকি হবে, কার হবে না—এ সব আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে।
একজন বলে—পরধানের চিন্তা নাই। কম কইরাও পাচ-ছয় হাজার টাকার ধান বেচতে পারব।
গদু প্রধান চুপ করে থাকে। মজলিসের মধ্যে তার টাকার তারিফ করলে সে খুশীই হয়।
এবার দুলার বাপ সোলেমান খাঁ অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে পড়ে। সে বলে, স্বাদীন যে অইল হের কোন নমুনাই যে পাইলাম না আইজও। দিন দিন যে খারাপের দিগেই চুলল। মওসুমের সময়ই চাউলের দর এত, শেষে না জানি কি অয়!
শেষে যদি কিছু হয়, তবে গদু প্রধানের পোয়াবারো। চালের দর চড়ক—মনে মনে সে তাই কামনা করে।
একজন বলে—দ্যাখছ, কাপড় পাওয়া যায় না বাজারে। খালি জোলইরা কাপড়। তাও কুড়ি-বাইশ টাকা জোড়া। একি কিনতে পারে?
গদু প্রধান বলে—আর কিছু দিন পর এও পাইবা না। বউ-ঝিরা ঘরের বাইর অইতে পারব না।
দুলার চাচা লোকমান বলে—কত আশা-ভসসা আছিল। স্বাদীন অইলে ভাত কাপড় সাইয্য অইব। খাজনা মকুব অইব। কিন্তু কই? বেবাক ফাঁটকি, বেবাক ফাঁকি। আবার রেল গাড়ীর ভাড়াও বাইড়া গেল।
—আরো কত দ্যাখা মিয়া, মাত্র বিছমিল্লা।—মৌলবী সাহেব বলেন। তারপর গদু প্রধানের কানে কানে কি বলেন।
গদু প্রধান বলেন—দশটার মইদ্যে বিয়া পড়াইতে অইব। কই সোলেমান? শোন এদিগ। সোলেমান খাঁ এলে আস্তে আস্তে গদু প্রধান বলে—তোমার বেয়ানরে আগে তোবা করাইতে অইব।
—ক্যাঁ?
—ক্যাঁ আবার! হায়ানের মত যেইখানে হেইখানে ঘুইরা বেড়ায়, দ্যাখতে পাও না? ভাল মাইনষের মাইয়া। বিয়াও অইছিল ভালা ঘরে। ভালা জাতের মাইয়া এই রকম বেজাত বেপর্দা অইলে আমাগই বদনাম। তোবা করাইয়া দিতে অইব। পরচাতে আর যেন বাড়ীর বাইর না অয়।
—হেইডা ত ভালা কথাই।
—তুমি কথাডা মজলিশে উড়াও। জোরে কইও যেন ঘরের তন তোমার বেয়ান হোন্তে। পায়। আমি আছি তোমার পিছে।
—না, আপনেই উড়ান। আমার শরম করে।
গদু প্রধান বলে বেশ জোরের সাথেই–বিয়ার আগে বৌর মারে তোবা করাইতে অইব। তোবা না করাইলে মৌলবী সাব কলমা পড়াইব না। আর হে ছাড়া কে কলমা পড়ায় আমি দেইক্যা লইমু।
মৌলবী সাহেবের মুখের ওপর মজলিশের সমস্ত চোখ একযোগে এসে পড়ে। মৌলবী সাহেব এবার একজন বেপর্দা স্ত্রীলোক ও তার স্বামীর কেচ্ছা শুরু করেন।
জয়গুন মায়মুনের চুলের জট ছাড়াতে শুরু করেছিল। গদু প্রধানের কথা তার কানে। আসতেই সে লাফ দিয়ে ওঠে। শফির মা-র কাছে গিয়ে বলে—হোনলা নি শফির মা?
—হ, হোনলাম। তার কি করতে চাও?
—কি করতে চাই? তোবা আমি করতাম না। আমি কোন গোনা করি নাই। মৌলবী সা’ব বিয়া না পড়াইলে না পড়াউক। আমার মায়মুনের বিয়া দিমু না।
—এইডা কি কথার মতোন কতা। ট্যাকা দিছে তারা।
—ট্যাকা দিছে, পেড় ভইরা খাইয়া ট্যাকা ওসুল কইরা যাউক। আমি ত আর টাকা সিন্দুকে ভইরা থুই নাই।
—না, না। ওই হগল কথা রাখ। এমুন ঘর আর পাবি না। আর আইজ এই রহম কইর্যা ফিরাইয়া দিলে বদনামী অইব কত! তোর বাড়ীতে আর কেও থুক ফেলতেও আইব না। আবার গদু পরধান আছে এর পিছে। ওকি যেমুন তেমুন গোঁয়ার! ও যদি মনে করে, উর মাডি চুর করে।
জয়গুন চিন্তিত হয়। তার মুখে কালো ছায়া। সে ভাবে—তওবা করলে ঘরে বদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। ঘরে বন্ধ হয়ে থাকার অর্থ না খেয়ে তিলে তিলে শুকিয়ে মরা। জয়গুনের চোখ ঘৃণায় কুঞ্চিত হয়। সে তীব্র কণ্ঠে বলে—না, আমি তোবা করতাম না।
মজলিশে মৌলবী সাহেবের গলা শোনা যায়। তিনি গল্প বলছেন—ঐ লোকটা তার বেপর্দা স্ত্রীকে কিছুতেই তালাক দিল না। তখন একজনের ওপর হুকুম অইল—ওরে কতল কর। লোকটাকে কাইট্যা ফেলা অইল। আর তার লহু থেইকা পয়দা অইল কি? না, একটা হারাম জানোয়ার–খিঞ্জির—শুয়োর। এইবার আপনারা দ্যাখেন, পর্দা কি চীজ। পর্দা না মানলে চল্লিশ বছরের এবাদত কবুল হয় না খোদার দরগায়। সব বরবাদ অইয়া যায়। বেপর্দা স্ত্রীলোক আর রাস্তার কুত্তী সমান।
জয়গুন চমকে ওঠে।
শফির মা কেরামত ও জহিরুদ্দিন মোড়লকে ডেকে আনে।
জহিরুদ্দিন বলে—মৌলবী সা’ব ঠিক কথাই কইছে হাসুর মা। তোবা কইরা ফ্যাল।
কেরামত সায় দিয়ে বলে—হ চাচি, তোবা কর।
জয়গুন জ্বলে ওঠে—তোবা কইরা ঘরে বইস্যা থাকলে আমারে খাওয়াইতে পারবি?
শান্ত হয়ে আবার বলে—তোমরা ইনসাফ কইর্যা কও, তোবা করলে কে আমারে ঘরে আইন্যা খাওয়াইব? হাসু যা রোজগার করে ও দিয়া দুই পেট চলে না। মায়মুনেরে আইজ বিদায় দিলেও ওরে নাইয়র আনত অইব। ও অহনতরি শিশু। মাসের মইদ্যে দশদিন ও আমার বাড়ীতেই থাকব। এতগুলা পেট কেমন কইর্যা চালাই, তোমরাই কও।
জহিরুদ্দিন বলে—খোদায় খাওয়াইব। মোখ দিছে যে, আহার দিব সে।
জয়গুন হাসে শ্লেষের হাসি।
কেরামত বলে—আইজকার দিনডার লেইগ্যা তোবা কইর্যা নেও। তারপর–
—তোবা তো’বা-ই। একবার করলে তা আর ভাঙতে পারতাম না।
বাইরে দু প্রধানের গলা শোনা যায়—অনেক রাইত অইল। কই কেরামত? চালাক কর।
—করতাছি মিয়া সাব।
কেরামত মজলিশে যায়। মৌলবী সাহেব দোর গোড়ায় এসে তার মাথার লম্বা পাগড়িটা খুলে তার এক প্রান্ত কেরামতের হাতে তুলে দিয়ে অন্য প্রান্ত নিজের কাছে রাখেন।
কেরামত ঘরের ভেতর গিয়ে বলে—ধইর্যা থাক, চাচি। হুজুর যা যা কইবেন, খেয়াল কইর্য। দিলের মইদ্যে গাইথ্যা রাইখ্য সব।
দ্বিধার সাথে জয়গুন পাগড়ির মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরে। তার মনের মধ্যে তখনও দ্বন্দ্ব চলছে।
