গাইটা নিষ্প্রাণ নিষ্পন্দ নকল বাছুরটার গা চাটতে থাকে শুধু শুধু।
আঞ্জুমন পিঁড়ে এনে বসতে দেয় শফির মাকে। শফির মা-র কথার উত্তর সে-ই দেয় এবার—পানি মিশাইব কোন দুখে? পানি মিশান বোধ করি ভাল আছিল। বাছুররে দুধ খাইতে না দিলে বাঁচব কেমন কইর্যা, কও? ঘাস না চিনতেই দুধের বাছুরের সামনে দিয়া রাখত ঘাস। আর সমস্ত দিন ভ্যা-ভ্যা করত বাছুর। বাছুরেরে দুধ খাইতে দিলে যে আঁড়ি উনা থাকে, বোঝলা নি বইন?
করিম বক্শ খেকিয়ে ওঠে-থাম মাগি বেজাত। কুড়ুমের কাছে বিত্তান্ত শুরু করছে। বেশী বকরবকর করলে দুধের আঁড়িডা তোর মাথার ‘পর ভাওমু, কইয়া রাখলাম।
শফির মা বলে—থাউক, বিহান বেলা কাইজ্যা কইর্য না গো তোমরা। হাশ্বাড়া কিন্তু খুব কসই অইছে। আমি তো ভাবছিলাম জিত বাছুরই। কে বানাইছে? মায়মুনের বাপ, তুমি?
অনেকদিন পরে ‘মায়মুনের বাপ’ ডাকটা শুনে চমকে ওঠে করিম বক্শ। শফির মা এই বলেই তাকে ডাকত। এ পাড়ার সবাই ডাকে ‘রহির বাপ’ বলে। আঞ্জুমনের বাপের বাড়ীতে ডাকে ‘ফুলির বাপ’। শেষের দুটোই চলছে আজকাল। আগের নামটা ঘুমিয়ে গেছে তার মনে। করিম বক্শ মাথা নাড়ে।
—হ। কারিগরিতে, তোমার মত ওস্তাদ আর নাই এই আশে-পাশে।
করিম বকশের দুধ দোহন শেষ হয়েছে। শফির মা-কে কথা বলবার অবসর না দিয়ে সে দুধের হাঁড়ি হাতে উঠে পড়ে।
শফির মা বলে—আদত কথাডা হোন এইবার। তোমার কাছে আইছি একটা কথা লইয়া।
করিম বক্শ দাঁড়ায়। বলে—কি কতা?
—মায়মুনের সম্বন্ধ ঠিক অইছে। আমি কত চেষ্টা-তদবির কইর্যা তয় ঠিক করলাম। অইলে এমুন সম্বন্ধ কপাল কুটলেও জুটত না।
—কোথায় সম্বন্ধ!
—সোলেমানের পোলা, সদাগর খার নাতি ওসমানের লগে।
–কবে বিয়া?
—এই মাসের এই কয়দিন পর। অগ্রাণ মাসের নয় তারিখ। তোমার কিন্তু যাইতে অইব।
—আমি যাইতে পারতাম না।
—এ তুমি কেমুন কথা কও! তোমার মাইয়া, তুমি না গেলে চলব কেমনে?
তোমার মাইয়া!
করিম বকশের মনের দুয়ারে ধাক্কা খেয়ে বারবার প্রতিধ্বনি করে কথা দুটি। কিন্তু উমর মনে বারিপাতের চেষ্টা বৃথা। কাসুকে ফুসলি দেয়ার ষড়যন্ত্রের কথা মনের ভেতর টেনে এনে সে নিজেকে কঠিনতর করে তোলে। এবার স্বরটা কঠিন করেই সে বলে—যেদিন থেইকা ও বিদায় দিছি, হেদিন থেইকা ওরা আমার কেউ না।
-তুমি কি কও ভাই! তোমার মাইয়া, তুমি না গেলে কেমুন দ্যাহা যায়? কাসুও যাইব তোমার লগে।
–কাসু যাইব!
—ক্যাঁ, দোষ কি? আবার তোমার লগেই লইয়া আইবা।
–বাহার কথা কইছ! কেও যাইব না। কাসু যাইব না, বাড়ীর একটা পোনাও যাইব না। কাসু এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। আঞ্জুমনের ইশারায় এবার সে চুপি চুপি সরে যায়।
—কেউ না? কফির মা আবার বলে।
–হ, হ, কেউ না। বিয়া দিয়া দ্যাও, চাই কাইট্যা গাঙ্গে ভাসাইয়া দ্যাও, হেতে আমার কি? আমি হুঁ-হাঁ কিচ্ছু কইমু না।
শফির মা আর কথা বাড়াবাড়ি করতে সাহস করে না। সে আগেই জানত, মায়মুনের বিয়েতে করিম বক্শকে পাওয়া যাবে না। তবু সে এসেছিল যাতে পরে দূষতে না পারে।
পাশ থেকে কঞ্চির লাঠিটা হাতে নিয়ে শফির মা ওঠে।
আঞ্জুমন বলে—পান খাইলা না বইন?
—নালো বইন। আমি আবার বিনে ছেঁচা মোখে দিতে পারি না। ছেঁচতে দেরী অইয়া যাইব।
শফির মা পথ নেয়। খেতের আলের ওপর কাসু দাঁড়িয়ে আছে। শফির মা যেতেই তার একখানা হাত ধরে সে বলে—আমি যাইমু, মামানি।
—আমি তোর মামানি, কে কইছে?
—আমি হুনছি।
কাসু আবার বলে—আমি যাইমু, তোমার লগে।
—কই যাবি?
কাসু কোন উত্তর দেয় না।
শফির মা বলে—নারে বাজান। তোরে নিলে আমি দোষের ভাগী অইমু। শিগগির বাড়ীতে যা। তোর বাপ মাইরা খুন কইর্যা ফ্যালাইব।
—উহুঁ, জানতে পারব না। বাজান দুধ বেচতে যাইব।
—ফুলির মা কইয়া দিব তোর বাজানের কাছে।
—ওহোঁ, কইব না। হে-ই ত আমারে চিনাইয়া দিছে ঐ তালগাইছ্যা বাড়ীডা।
শফির মা একটু চিন্তা করে বলে—আইচ্ছা চল। আবার তাড়াতাড়ি ফিরা আইতে অইব। তোর বাপ জানতে পারলে কিল এট্টাও জমিনে পড়ব না।
কাসু বলে—বাজার তন ফিরতে দেরী অইব। তার আগেই ফিরা আইমু আমি।
শফির মা-কে পেছনে ফেলে কাস এগিয়ে যায়। শফির মাও জোরে পা ফেলে। কিন্তু। কাসুর সাথে সে হেটে পারে না। সে কতদূর এগোয়, আবার পেছনে ফিরে তাকায়।
করিম বকশের বাড়ী ছাড়িয়ে অনেক দূর এসে পড়েছে তারা। এবার পেছন দিকে তাকাতেই শফির মা দেখতে পায়-করিম বক্শ উর্বশ্বাসে ছুটে আসছে এদিকে। কোণাকুণি ধানখেত মই দিয়ে যেন আসছে সে। কাসু শফির মা-কে ছাড়িয়ে নল খানেক এগিয়ে গিয়েছিল।
শফির মা ডাকে কাসু। ভয়ে তার গলা দিয়ে আর কথা বেরোয় না।
কাসু পেছন দিকে তাকিয়ে ‘থ’ হয়ে যায়।
শফির মা বলে—ভালা চাসত বাড়ীমুখি পথ দে। নইলে আড্ডি গুড়া কইর্যা ফ্যালাইব।
কাসু এসে শফির মা-কে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। তারা দু’জনেই ভয়ে কাঁপতে থাকে। শফির মা-র কাঁপুনি অনুভব করতে পেরে তার ভয় আরো বেড়ে যায়।
করিম বক্শ এসে পড়েছে। দুই হাতে কাসুকে ধরতেই সে আত-চীৎকার করে ওঠে। সে। শফির মা-র আঁচল জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু করিম বক্শ তার রাক্ষুসে থাবায় ছাড়িয়ে নেয় কাসুকে। শফির মা-কে ধাক্কা মেরে বলে—তুই মাইয়ালোক। নইলে আইজ–
রাগের অতিশয্যে করিম বকশের মুখ দিয়ে কথার শেষটা বের হয় না। এবার সে কাসকে বাম কাঁধে ফেলে ডান হাত দিয়ে এক একটা থাপ্পড় মারে আর বলে—আর এই মুখি পাও ফেলবি? দ্যাখ, কেমুন মজা।
