তারপর থেকে সে প্রায়ই কবরটাকে দেখতে আসতো। মাঝে মাঝে করিম বকশের কাছ থেকে পয়সা চেয়ে মোমবাতি কিনে কবরে দিত।
আঞ্জুমন এবার বলে—আমি একটা কথা কইতে পারি। কেওর কাছে না কইতে পারস? কাসু মাথা নাড়ে।
—খবরদার, তোর বাজান হোনলে আমারে কাইট্যা দুই খণ্ড কইর্যা ফ্যালাইব। তয় হোন। অই কবরডা তোর সতাই মা-র! আমি যেমুন সতাই মা, তেমন।
—কে আমার মা? কাসু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তুমিই ত কইছিলা ঐডা আমার মা-র কবর।
—ওহোঁ, মিছা কথা। তোর মা অহনো বাঁইচ্যা আছে।
কাসু বিশ্বাস করতে পারে না। সে বলে ফাঁটকি দ্যাও তুমি।
—ফাঁটকি দিমু ক্যাঁ? বিশ্বাস না করলে আর কইমু না। থাউক। আঞ্জুমন চুপ করে।
কিন্তু কাসুর শোনার আগ্রহ এবার বেড়ে যায়। সে বলে, আইচ্ছা, এইবার বিশ্বাস করমু,
–কইলে কি দিবি আমারে?
—তুমি যা চাও হেইয়া দিমু।
–আমি চাই :
আসমানী বিরিক্ষর ফল,
তল নাই দীঘির জল,
যা খাইলে হয় অসুরের বল। পারবি দিতে?
কাসু বিপদে পড়ে। কোথায় পাবে সে এসব? আসমানে গাছ হয়, সেই গাছে ফল হয়। কি তার নাম? সে বুঝতেই পারে না কিছু। আর তল নাই দীঘি—সেটাই বা কেমন? হতাশায় কাসুর মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। তার ধারণা, এগুলো দিতে না পারলে তার সৎসা তাকে তার মা-র কথা বলবেই না।
আঞ্জুমন খলখলিয়ে হেসে ওঠে। কাসুর পিঠ চাপড়ায়। কাসু এবার ভরসা পায়।
অঞ্জুমন আরম্ভ করে—তোর বয়স তহন তিন বচ্ছর। তোর বাপ তোর মারে ছাইড়া দেয়। তোরে তোর ফুফুর কাছে, পাড়াইয়া দায়। তোর একটা বইন আছে, মায়মুন তার নাম।
কাসুর সন্দেহ দূর হয় না। কিন্তু সে মনোযোগ দিয়ে শোনে সব কথা।
আঞ্জুমন আবার বলে—ঈদে টুপিখান দিছিল কে? তোর মা দিছিল না? অই যে কানা বুড়ি দিয়া গেল, ঐ কানা বুড়ি তোর মামানি।
কাসুর সমস্ত সন্দেহের অবসান হয় এবার। সৎমায়ের আচরণে কাসু কোন দিনই সদিচ্ছার পরিচয় পায়নি। তার হাব-ভাব দেখলে তার ভয়ই হত। আজ সৎমায়ের মমতায় সে বিস্মিত হয়। তাকে খুব ভালো লাগে। আঁচল ধরে আবদার করতেও এখন বাধে না কাসুর।
সে বলে—যাইমু মা-র কাছে। আমারে লইয়া যাও না মা-র কাছে।
—আমি লইয়া যাইমু কোতায়? সর্বনাশ! তোর বাজান জানতে পারলে আমারে মাইরা কাহটা গাঙে ফ্যালাইয়া দিব। খবরদার। জানতে যেন না পারে।
কাসু মাথা নাড়ে।
আঞ্জুমন বলে—চল, তোরে দেহাইয়া দেই। বাড়ীর উত্তর ধারে গেলে দ্যাহা যায় বাড়ীখান।
কাসুকে নিয়ে আঞ্জুমন বাড়ীর উত্তর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
সূর্য-দীঘল বাড়ীর তালগাছটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে সে বলে—ঐ যে দুইখান বাড়ীর ফাঁক দিয়া দ্যাহা যায় একটা বড় তালগাছ। ঐ বাড়ী, অই হানেই থাকে তোর মা।
কাস পলকহীন দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার মন এই মুহূর্তে ছুটে যেতে চায়। কিন্তু নিচে মাঠের দিকে চেয়ে নিরুপায় বলে মনে হয় নিজেকে। আশ্বিনের শেষাশেষি, পানি শুকিয়ে আসছে। জমির উঁচু আল দেখা যায়। সমস্ত মাঠ কাদায় দৈ-দৈ হয়ে আছে। পায়ের পথও নয়, নায়ের পথও নয়।
করিম বখ্শ যখন বাড়ী থাকে না, তখন কাসু প্রায়ই বাড়ীর উত্তর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। নৌকার মাঝে দেখা মা-র মুখখানা চিন্তা করে।
এখান থেকে তালগাছটা স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু মাঠের কাদা আর পানি কাসুর সাথে আড়ি ধরেছে যেন। রোজ এখানে এসে এসে তার রাগ ধরে পানির ওপর। কেন পানি শুকাতে দেরী করছে এত?
দু’একটা লোককে কাদা ভেজা পথ চলতে দেখে তার মনে হয়, সে যদি একটু বড় হত, তবে সে-ও যেতে পারত অনায়াসে। মাঝে মাঝে কারো কাঁধে চড়ে যাওয়ার ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু কে এমন দরদী যে তাকে কাঁধে করে নেবে?
তালগাছটার দিকে দু’একটা পাখীকে উড়ে যেতে দেখে তারও উড়বার স্পৃহা জাগে। ঐ শাখীগুলোর মত দুটো পাখা যদি তার থাকত!
মাঠের কাদা যতই শুকিয়ে আসতে থাকে, কাসুর মনও ততই উড়-উড় করতে থাকে। কার্তিক মাসের শেষে মাঠের মাঝে পথ পড়ে। এমনি সময়ে একদিন শফির মা আসে এ বাড়ীতে। কাসুর আনন্দ আর ধরে না। এ রকমই একটা সুযোগের অপেক্ষা করছিল সে।
এক প্রহর বেলা। করিম বক্শ গোয়াল থেকে গাইটা বের করে উঠানে কাঠাল গাছের সাথে বাধে। আঞ্জুমন ঝিনুকে করে সর্ষের তেল এগিয়ে দেয়।
করিম বক্শ হুকুম করে—হাম্বাডা লইয়া আয়। বাজারের বেইল অইয়া গেছে।
—আমার ঘিন করে। তুমিই যাও।
করিম বক্শ গোয়ালের এক পাশে ঝুলানো হাম্বাটা নিয়ে আসে।
গাইটার বাছুর মরেছে অনেক দিন। দুধ-চোর গাই বাছুর না দেখলে দুধ ছাড়ে না। কোথায় লুকিয়ে রাখে। বাছুর না দেখলে বাটে হাত দেওয়াও মুস্কিল। ঠ্যাং দিয়ে লাথি মারে। এসব অসুবিধার জন্যে এই অদ্ভুত ব্যবস্থা। মরা বাছুরটার চামড়ার খোলসে খড়-বিচালি ভরে নকল বাছুর তৈরী করা হয়েছে।
করিম বক্শ হাতে সর্ষের তেল নিয়ে বাঁটে মাখিয়ে দেয়। তারপর নকল বাছুরটার মুখ বাটের কাছে নিয়ে বাছুরের অনুকরণে গুঁতো মারে। এ রকম করলে যখন বাটে দুধ নেমে আসে, তখন দুই হাঁটুর মাঝে হাঁড়ি রেখে করিম বক্শ দুইতে আরম্ভ করে।
-বাছুর কবে মরল ভাই?
করিম বক্শ চেয়ে দেখে—শফির মা। নিতান্ত অনিচ্ছার সাথেই সে উত্তর দেয়—মাস তিনেক অইল।
—অনেক দিন ত অইল। কেমুন কইর্যা মরল? দুধে পানি মিশাও বুঝিন? দুধে পানি মিশাইলে বাছুর মইরা যায়। এইডা হাচা কতা। শফির মা ঠাট্টার সুরে বলে।
জয়গুন করিম বকশের সংসারে থাকতে এ রকম ঠাট্টা-মশকরা প্রায়ই মূলত তাদের মধ্যে। বহুদিন বহু ঘটনার তিক্ততার পরেও আজ কেমন করে যে এ ঠাট্টাটুক জিভ থেকে পিছলে বেরুল, শফির মা নিজেই বুঝতে পারে না। কথাটা বলেই সে লজ্জিত হয়। করিম বক্শ আপন মনে এ-বাঁট থেকে ও-বাঁটে হাত চালিয়ে দুধ নামাতে থাকে। তার মুখেও ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায়।
