—দুধ বেচতে গেছে।
—তোমার মুখখানা হুকনা যে? তোমার মায় তোমারে খাইতে দেয় নাই?
—আমার মা নাই, মইরা গ্যাছে।
জয়গুন সহ্য করতে পারে না। সে তাকে কোলে তুলে নেয়। আখ খেতে দেয়ায় কাসু বশ হয়েছে। এবার সে কোলে উঠতে আপত্তি করে না। জয়গুন পরম স্নেহে তার কপালে চুম্বন করতে থাকে। তার চোখের পানি কাসুর মুখখানা সিক্ত করে দেয়।
কাসুকে কোলে নিয়ে জয়গুনের অনেক সময় কাটে। করিম বক্শ দুধের হাঁড়ি মাথায় নৌকার কাছে এসে কখন দাঁড়িয়ে আছে জয়গুনের হুঁশ নেই। করিম বকশের ডাকে তার আবেশ ভেঙে যায়। মুখ তুলে দেখে—করিম বক্শ। তার চোখ দুটো রাঙা–জ্বলছে।
জয়গুন মাথার কাপড় আরো টেনে দিয়ে দাঁড়ায়। নৌকা থেকে নেমে শিথিল বিবশ পা দুটোয় স্বাভাবিক শক্তি ফিরিয়ে আনবার আগেই করিম বকশের গম্ভীর গলা শোনা যায়—খাড়, কথা আছে।
জয়গুন দাঁড়ায়। করিম বক্শ বলে—আমারে আর সুখে-শান্তিতে থাকতে দিবি না, দেখতে আছি। মায়ে-পুতে জোট কইর্যা আমারে পাগল বানাইয়া ছাড়বি তোরা। হাসুয়া হারামজাদা কদ্দিন জালাইছে, আবার তুইও–
জয়গুন নীরব।
—আমার সুখ তোগ চউখে সয় না? সাত সাতটা বচ্ছর দুধ ভাত খাওয়াইয়া ওরে অত ডার করছি। এহন চাও তৈয়ার আণ্ডায় উম দিতে।
জয়গুনের ইচ্ছে হয় বলে—আণ্ডা তুমি পাড় নাই। আমার আণ্ডায় আমি উম দিলে তোমার এত পোড়ানি কিয়ের লেইগ্যা? ওরে দশ মাস দশ দিন পেডে রাখছি, তিন বচ্ছর বুকের দুধ খাওয়াইছি। তুমিই তৈয়ার আণ্ডায়–
কিন্তু মুখ ফুটে একটি কথাও সে বলতে পারে না।
করিম বক্শ আবার বলে—তোগ ডরে ওরে বাড়ীতে রাইখ্যা আহি না। লেজুড়ে লেজুড়ে বাইন্দা রাখি সব সময়। নাওডা চোরে লইয়া যায় এই ডরে ওরে না বহাইয়া বাজারে যাই। এদিগেও তোগ উৎপাত শুরু অইছে! আমি এহন কোথায় যাই? তোগ যন্তন্নায় মুল্লুক ছাইড়্যা বনবাসে গেলে পারি অহন।—করিম বক্শ গুমরে ওঠে।
জয়গুন চলতে আরম্ভ করে।
করিম বক্শ বলেই চলে—দোহাই খোদার। ওরে ফুসলি দিস না আর। আমার পোলারে ফুসলি দিলে আল্লার কাছে ঠেকা থাকবি। রোজ কেয়ামত তক দাবী থাকবো তোর উপরে।
জয়গুন বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেছে।
করিম বক্শ জোরে বলে—আবার যদি ফেউ-এর মতন আমার পিছু লাগস, আখেরি কথা হনাইয়া দিলাম, তয় তোরই একদিন কি আমারই একদিন।
জয়গুন কোনো দিন কাসুকে ফুসলি দেয়নি, আর দিবেও না—সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা।
১৩. মেয়ে লোকটি কে
মেয়ে লোকটি কে?
কাসুর মনে বারবার এই প্রশ্নটাই আনাগোনা করতে থাকে। তাকে কোলে নিয়ে কত আদর করলো! আখ খেতে দিলো। দরদর করে পানি পড়ছিল তার চোখ বেয়ে! কে সে?
একবার তার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু করিম বকশের মুখ-চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্নটা চাপা পড়ে যায়।
করিম বকশের রাগ তখনও থামেনি। জয়গুন সে রাগ থেকে কোন রকমে বেঁচে গিয়েছিল। একত্র ঘর-সংসার করার পুরাতন স্মৃতি করিম বকশের মেজাজকে চরমে উঠতে দেয়নি। কিন্তু তারপর লগির উপর দিয়ে তার রাগের জের চলে সমানভাবে। লগির জোর গুঁতোয় ধানখেতের মাঝ দিয়ে যেন তীরের মত ছুটছিল তার ডিঙি। ডিগির গলুইয়ে পানি উঠছিল ছলাৎ ছলাৎ! কিন্তু বাড়ীর কাছাকাছি এসে লগিটা মটাৎ করে ভেঙে দু’ভাগ হয়ে যায়। করিম বকশের রাগ কিন্তু এতক্ষণে থামে। লগি ভাঙার আফসোসে নয়, তার রাগের জয়লাভ। তার রাগ জয়ী হয়েছে লগিটা ভেঙে দিয়ে। এমনি কোনো মাশুল না পেলে তার রাগের কোনো মতেই শান্তি আসে না। লগিটা না ভাঙলে বাড়ী পর্যন্ত পৌছে আঞ্জুমনের সাথে খুব এক চোট ঝগড়া হওয়ার সম্ভাবনা হয়ত ছিল।
বাপের থমথমে মুখের দিকে চেয়ে কাসুর কথা বলার সাহস হয় না। চুপ করে সে বসেই থাকে আর ভাবে—মেয়েলোকটি কে হতে পারে?
প্রশ্নটার মীমাংসায় সেদিন থেকে সে অনেকটা সময় নিয়োজিত করেছে। কিন্তু তার কাঁচা মাথা কোন সন্তোষজনক হদিস খুঁজে বার করতে পারেনি।
হদিস শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়।
আঞ্জুমন একদিন হাশরের ময়দানের কিচ্ছা বলছিল। শুনে কাসু হঠাৎ জিজ্ঞেস করে—হাশরের ময়দানে এত মাইনষের মধ্যে মারে চিনতে পারা যাইব? আমি ত মা-রে দেহি নাই। তুমি মা-রে চিনাইয়া দিবা?
আঞ্জুমন কাসুর অভিলাষ বুঝতে পেরে ব্যথিত হয়। কাসুর প্রশ্নটা তাকে খুব পীড়া দিতে আরম্ভ করে আজ। সে ভাবে কাসুকে এমন করে মিথ্যার জালে জড়িয়ে রাখার কোন অর্থ হয় না। অন্তত তার তো কোনই লাভ নেই লোকসান ছাড়া। কাসু ওর মা-র কাছে চলে গেলেই ভালো হয় যেন। করিম বকশা ফুলিকে মোটেই আদর করে না। এমন কি বাজান বাজান বলে কেঁদে খুন হয়ে গেলেও কোলে তুলে নেয় না। আরো গলাগাল দেয়—মেকুরের বাচ্চাড়া কান্দে ক্যাঁ? এইডারে ছালা ভইরা জঙ্গলে ফ্যালাইয়া দিয়া আয়। কাসুই করিম বকশের কাছে সব। ফুলি যেন তার কেউ নয়।
ভাবতে ভাবতে তার মন বিরক্তিতে ভরে ওঠে। সে স্থির করে—আজ কাসুক ওর মা-র কথা বলে দেবে। জয়গুনের বাড়ী দেখিয়ে দেবে কাসুকে। করিম বকশের ইঙ্গিতে সে এতদিন কাসুকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখেছিল। মা-র কথা জিজ্ঞেস করলে তাকে সাজিয়ে বলতে হত অনেক কথা। কাসু একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, তার মা-র কবরের কথা। আঞ্জুমন কোন দ্বিধা না করে মেহেরনের কবরটাই দেখিয়ে বলেছিল—এই যে এইডা তোর মা-র কবর।
কাসু বিশ্বাস করেছিল, নিশ্বাস ফেলেছিল আর চেয়েছিল একদৃষ্টে কবরটার দিকে।
মা-র কথা শুনতে শুনতে সে তন্ময় হয়ে যেত। আর ভাবত আহা—মা থাকা কত সুখের! সঙ্গে সঙ্গে তার মনে জাগত সমবয়সীদের কথা। হামিদের মা হামিদকে কত স্নেহ করে। সেলিমের মা কত আদর করে সেলিমকে। কিন্তু তাকে আদর করবার কেউ নেই।
