হ, এরই নাম ভোজবাজির খেইল, আক্কেলের খেইল। দ্যাখলা তো আমার আক্কেল দিয়া ওগ কেমুন বেয়াক্কেল বানাইয়া দিছি। জঙ্গুরুল্লার চোখে-মুখে আত্মপ্রসাদের হাসি।
হ, ওরা এক্কেরে বেয়াক্কেল অইয়া গেছে।
মাঘ মাস। উত্তুরে বাতাসে ঢেউয়ের আলোড়ন তোলে ধান খেতে। জঙ্গুরুল্লা শালটার এক প্রান্ত গলায় পেঁচিয়ে নেয়। বলে, জবর শীত পড়ছে তো। ও মজিদ, বাইরে হোগলা বিছাইয়া দ্যাও। রউদে বইয়া তোমাগ লগে কথা কইমু।
চরের চারদিকটা ঘুরে ফিরে দেখে তারা এরফান মাতব্বরের তৈরি ভাওর ঘরের পুবপাশে এসে দাঁড়ায়।
মজিদ খালাসি ঝুপড়ি থেকে হোগলা ও বিছানার চাদর এনে মাটিতে বিছিয়ে দেয়। জুতো ছেড়ে জঙ্গুরুল্লা আসনসিঁড়ি হয়ে বসে।
আর লোকজন কই? জিজ্ঞেস করে জঙ্গুরুল্লা।
বেড়ে মাছ ধরতে গেছে।
বেড় দিছে! বানা পাইল কই?
মাতব্বরের কোলশরিকরা ফালাইয়া গেছে। দবির গোরাপি বলে।
আইচ্ছা! আর কি কি ফালাইয়া গেছে?
ঢাল-কাতরা, লাডি-শরকি, ক্যাথা-বালিশ, থালা-বাসন, তিনডা টচ লাইট।
ঝাঁকিজাল, টানাজাল, মইয়া জাল, ইলশা জাল। একজন কোলশরিক দবির গোরাপির অসম্পূর্ণ তালিকা পরিপূরণের উদ্দেশ্যে বলে।
আরো অনেক কিছু চাই, দোয়াইর, আটি, বইচনা, খাদইন, পারন। বলে আর একজন কোলশরিক।
এইডারে কয় বুদ্ধির খেইল, বোঝলা? আক্কেলের খেইল। জঙ্গুরুল্লা আবার তার নিজের বাহাদুরি প্রকাশ করে। দ্যাখলাতো আমার আক্কেলের ঠেলায় ওগ আক্কেল গুড়ুম।
হ, আপনের বুদ্ধির লগে কি ওরা কুলাইতে পারে? আপনের বাইয়া পায়ের বুদ্ধিও ওগ নাই। বলে মজিদ খালাসি।
পায়েরও আবার বুদ্ধি থাকে! মনে মনে খুশি হয় জঙ্গুরুল্লা। সে আড়চোখে তাকায় তার নিন্দিত পা দুটোর দিকে।
বেড়ে মাছ পাওয়া যায়? জিজ্ঞেস করে জঙ্গুরুল্লা।
আইজই বেড় পাতছে। কিছু তো পাইবই। দবির গোরাপি বলে।
ওরা চাউল-ডাউল, তেল-মরিচ ফালাইয়া গেছে না?
হ কিছু ফালাইয়া গেছে। আমাগ বেবাকের তিন-চারদিন চইল্যা যাইব।
শোন, ভাটাতো শুরু অইয়া গেছে। ওরা মাছ মাইরা আসুক। বেবাক মানুষ একখানে অইলে কথা কইমু তোমায় লগে। এক কাম করো, চাউল-ডাইল তো আছেই। বেড়ে মাছও পাওয়া যাইব। রানের আয়োজন কর। আইজ বেবাক মানুষ একখানে বইস্যা আমার লগে খাইব।
হ, আয়োজন করতে আছি। মজিদ খালাসি বলে।
শোন, বেড়ের মাছ ধরতে গিয়ে ধানেরে পাড়াইয়া-চড়াইয়া যেন বরবাদ না করে। তোমরা গিয়া হুশিয়ার কইর্যা দিয়া আসো।
হ যাই।
মজিদ খালাসি চলে যায়।
চরের পাহারায় কারা আছে?
চাকইর্যারা আছে। আর যারা বেড়ে মাছ ধরতে গেছে তারাও নজর রাখব। দবির গোরাপি বলে।
ওরা আর আইতে সাহস করব না। কি মনে অয় তোমাগ, আইব ওরা? ওরা আইব ক্যামনে? কি লইয়া আইব? ওগ বেবাক আতিয়ার তো আমাগো দখলে।
হ, আতিয়ার বানাইয়া তৈয়ার অইতে বহুত দেরি। যহন আইব, আইয়া দ্যাখব রাইস্যা গাঙ চরডারে খাবলা দিয়া লইয়া গেছে।
সবাই হেসে ওঠে।
হঠাৎ হাঁক ছাড়ে জঙ্গুরুল্লা, মাঝিমাল্লাগুলা গেল কই? হারামজাদারা এতক্ষণের মইদ্যে এক ছুলুম তামুক দিয়া গেল না। অই কেরা, অ ফেকু–
দবির গোরাপি উঠে পানসির দিকে দৌড় দেয়।
জঙ্গুরুল্লা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, থাউক তোমার যাওনের দরকার নাই। আমিই নৌকায় গিয়া বসি। বেড়ে কি মাছ পাও আমারে দ্যাখ্যাইয়া নিও।
জঙ্গুরুল্লা নৌকায় উঠে ছই-এর বাইরে পাটাতনের ওপর বসে। মাঝি কেরামত ফরসি হুঁকোয় তামাক সাজিয়ে দীর্ঘ নলটা এগিয়ে দেয় তার দিকে। সে নলে মুখ দিয়ে টানে গুড়ুক। গুড়ুক।
দবির গোরাপি, হরমুজ, জহির ও আরো কয়েকজন দাঁড়িয়েছিল পাড়ে।
ও জহির, ও হরমুজ।
জ্বী।
তোরা নৌকারতন শিকল নিয়া যা। দবিররে লইয়া চরটার মাপ-জোখ নে।
জহির নৌকা থেকে জমি মাপার শিকল নিয়ে নামে।
জঙ্গুরুল্লা আবার বলে, ওরা কেম্বায় জমি ভাগ করছিল, জানোনি দবির?
হ, চরডারে দুই ভাগ করছে পয়লা। উত্তরে একভাগ আর দক্ষিণে একভাগ। হেরপর আট আতি নল দিয়া মাইপ্যা ভাগ করছিল।
ঠিক আছে, আমরাও এই নলের মাপেই ভাগ করমু। ওরা যেই আইল বানছিল সেই আইল ভাঙ্গনের দরকার নাই। শিকল দিয়া নলের মাপ ক্যাদায় দিবা, জানোনানি?
জানি। হরমুজ বলে। আঠারো লিঙ্কে আট হাত, মানে একনল।
ঠিক আছে তোরা যা। দুফরে খাওনের পর জমি ভাগ-বাটারার কাম করণ যাইব।
পুবদিক থেকে স্টিমার আসছে। এ সময়ে খাটো চোঙার জাহাজ–দেখেই জঙ্গুরুল্লা বুঝতে পারে এটা কোন লাইনের জাহাজ। চাঁদপুর থেকে গোয়ালন্দ যাচ্ছে চাটগা মেল । আবার পশ্চিম দিক থেকেও আসছে একটা লম্বা চোঙার স্টিমার। এটা নিয়মিত কোনো যাত্রীজাহাজ নয়–জঙ্গুরুল্লা বুঝতে পারে।
কোনো একটার থেকে পানি মাপা হচ্ছে। দূর থেকে তারই ঘোষণার সুর অস্পষ্ট ভেসে আসছে কিছুক্ষণ পর পর দুই বাম মিলে-এ-এ-এ-এ–না–আ–আ—আ।
কেরা, মজবুত কইর্যা নাও বাইন্দা রাখ। জবর ঢেউ ওঠব। দুই জাহাজের ঢেউ।
কেরামত পানসিটাকে কিনারা থেকে কিছুদূর সরিয়ে দুই মাথি বরাবর লগি পুঁতে রশিতে আয় রেখে শক্ত করে বাঁধে।
স্টিমার দুটো পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসছে।
পুঁ–উ-ত। মেয়েলি মিহি আওয়াজে দীর্ঘ সিটি বাজায় লম্বা জাহাজ।
ফুঁ-উ-ত। চাটগাঁ মেল সিটির জবাব দেয় পুরুষালি মোটা বাজখাই আওয়াজে।
এই কেরা, জাহাজ দুইডা হুইসাল মারলো ক্যান্ জানস নি?
