আলেফ : মিয়া, তোমার একগাছ চুলও পাকে নাই। তাই বোঝতে পার না। দারোগা যহন জিগাইত–ও মিয়া তোমার বাড়ি কই? তহন কি মিছা কথা কইতে পারতাম? ট্যাংরামারির কথা হুইন্যা এক্কেরে তক্ষণ তক্ষণ মাজায় দড়ি লাগাইত। কইত এত দূর তন কি করতে আইছ এইখানে? তোমরাই ডাকাতি করছ।
নৌকার সবাই সায় দেয় তার কথায়। ফজলকেও মেনে নিতে হয় তার যুক্তি।
শীতকালের বেলা তাড়াতাড়ি পালায় শীতের তাড়া খেয়ে। দারোগা-পুলিস চর থেকে চলে যায়। তাদের নৌকা দৃষ্টির আড়াল হতেই মান্দ্রার খাড়ি থেকে বেরোয় সবকটি নৌকা।
মেহের মুনশি বলে, আস্তে আস্তে চালাও। আন্ধার অউক।
চইল্যাতত গেছে। আবার আস্তে আস্তে ক্যান? মেঘু পালোয়ান বলে। দুফরের খাওনডা মাইর গেছে। জলদি চালাও।
হ জলদি চালাও। আলেফ সরদার বলে। প্যাটার মইদ্যে শোল মাছের পোনা কিলবিলাইতে আছে।
তবু ধীরে ধীরে চলছে নৌকা। চরের কাছে পৌঁছতে সন্ধ্যা উতরে যায়।
এই ক্যাডারে? আর আউগ্গাইস্ না, খবরদার!
খাইছেরে! সব্বনাশতো অইয়া গেছে!
হায় আল্লা, জঙ্গুরুল্লা চর দখল কইর্যা ফালাইছে।
ফজল ও তার লোকজন হতভম্ভ। তাদের নৌকা থেমে গেছে। পানিতে টুপটাপ পড়ছে কিছু। গুলেল বাঁশের গুলি বুঝতে পারে তারা। দু-একটি গুলি তাদের গায়েও এসে লেগেছে।
আকস্মিকতার ঘোর কাটিয়ে ফজল হাঁক দেয়, কারারে তোরা? ভাইগ্যা যা ভালো থাকতে। নইলে জবাই কইর্যা ফালাইমু।
আইয়া দ্যাখ কে কারে জবাই করে।
তারপর দুই দলে চলতে থাকে অশ্রাব্য গালাগাল।
ফজল ও মেহের মুনশি জিজ্ঞেস করে আলেফ ও মেঘুকে, কি মিয়ারা, পারবানি লড়তে?
লড়তে পারমু না ক্যান্। কিন্তুক এই রাইতের আন্ধারে কে দুশমন কে আপন চিনা যাইব না। আউলাপাতালি লড়াই করতে গিয়া খামাখা জান খোয়াইতে অইব।
একজন লাঠিয়াল : আমার ঢাল-শড়কি আনতে পারি নাই।
মেঘু : অনেকের কাছেই আতিয়ার নাই। আতিয়ার থুইয়া পলাইছে আহাম্মকরা।
জাবেদ লশকর : তয়তো ওগো মজাই। আমাগ শড়কি দিয়াই আমাগ পেডের ঝুলি বাইর করতে পারব।
প্রত্যেকেই কাঁথা-বালিশ, ঢাল-কাতরা, লাঠি-শড়কি, মাছ ধরার সরঞ্জাম ইত্যাদি কিছু না কিছু হারিয়ে হায়-আফসোস করতে থাকে।
মেহের মুনশি বলে, জঙ্গুরুল্লাতো জবর ফেরেববাজ। দ্যাখছনি ক্যামনে ডাকাতি মামলা দিয়া আমাগ ছাপ্পরছাড়া কইর্যা দিল!
হায় হায়রে! এত কষ্ট কইরা ধান রুইছি। লালুর বাপ বলে।
মেঘু পালোয়ান : জঙ্গুরুল্লা কি মরদের মতো কাম করছে নি? হিম্মত থাকলে আইত সামনাসামনি।
জাবেদ : আহ্-হারে কতগুলা জমির ধান। এত কষ্ট কইর্যা–
আলেফ : আর হায়-হুঁতাশ কইর্যা কি অইব? চলো, মাতবরের কাছে যাই। দেহি উনি কি করতে বুদ্ধি দ্যা।
রমিজ মিরধা: কাইল রাইত পোয়াইলে আহন লাগব। কাইল যদি ওগ তাড়াইতে না পারো তয় ধানের আশা মাডি দিয়া থোও।
ফজল : দেহি, বাজান কি করতে কয়।
নতুন পানসি এরফান মাতব্বরের বাড়ির দিকে রওনা হয়। তার পেছনে সারি বেঁধে চলে ছোট-বড় বাইশখানা ডিঙি।
১৩-১৬. খুনের চর দখল
লাঠালাঠি হাঙ্গামা ছাড়াই খুনের চর দখল হয়েছে। এত সহজে চরটা দখল করতে পারবে, ভাবতে পারেনি জঙ্গুরুল্লা। সে মনে করেছিল–বিপক্ষের কিছু লোক আর চাকরিয়ারা অন্তত থাকবে চরে। তারা মুখোমুখি হবে তার লাঠিয়ালদের, ছোটখাট মারামারি হবে। কিন্তু কিছুই হয়নি। পুলিসের ভয়ে ওদের সবাই ছুটছাট পালিয়েছিল চর খালি রেখে।
চর দখলের পরের দিন ভোরবেলা জঙ্গুরুল্লার পানসি এসে ভিড়ে খুনের চরের ঘোঁজায়। পানসি দেখে লোকজন ভিড় করে এসে দাঁড়ায় পানসির কাছে। জঙ্গুরুল্লা রুমিটুপি মাথায় দিয়ে শালটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে খাস খোপ থেকে বেরোয়। তার পেছনে বেরোয় তার দুই ছেলে হরমুজ ও জহির।
আসোলামালেকুম। এক সাথে সবাই সালাম দেয় জঙ্গুরুল্লাকে।
ওয়ালাইকুম সালাম। ফরমাশ দিয়ে তৈরি তেরো নম্বরি জুতো-জোড়া পায়ে ঢোকাতে ঢোকাতে জঙ্গুরুল্লা সালামের জবাব দেয়। জহিরের হাত থেকে রূপার মুঠিবাধানো বেতের লাঠিটা নিয়ে সে দাঁড়ায় নৌকার মাথির ওপর।
মজিদ খালাসি কই হে?
এইতো হুজুর।
আমিও আছি হুজুর। দবির গোরাপি বলে।
চলো, চরটা আগে দেইখ্যা লই।
চলেন হুজুর। মজিদ খালাসি বলে।
জঙ্গুরুল্লা চরের মাটিতে নামে। তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় মজিদ খালাসি ও দবির গোরাপি।
জঙ্গুরুল্লা থপথপ করে পা ফেলে এগিয়ে যায় বুক টান করে, মাথা উঁচু করে। তার চলনে-বলনে দিগ্বিজয়ীর দৃপ্ত ভঙ্গি।
চলতে চলতে চরটার চারদিকে চোখ বুলায় জঙ্গুরুল্লা। মাঝখানের কিছু জায়গা বাদ দিয়ে সারাটা চরেই লাগানো হয়েছে বোরো ধান। ধানগাছের গোছা পেখম ধরেছে বেশ। গাছের মাজা মুটিয়ে উঠেছে। কিছুদিনের মধ্যেই শিষ বেরুবে।
কেমুন মিয়ারা! তোমরাতো চর দখলের লেইগ্যা হামতাম শুরু করছিলা। চলতে চলতে বলে জঙ্গুরুল্লা। অত ত্বরাহুড়া করলে এমুন বাহারিয়া ধান পাইতা কই? আমি তখন কইছিলাম না, ওরা ধান-পান লাগাইয়া ঠিকঠাক করুক, আমরা তৈয়ার ফসল ঘরে উডাইমু।
হ, আল্লায় করলে তৈয়ার ফসল ঘরে উড়ান যাইব। দবির গোরাপি বলে।
খুব মজা, না? ধান বোনে হাইল্যা, প্যাট ভরে বাইল্যা। মনে মনে হাসে জঞ্জুরুল্লা।
আপনে জবর একখান ভোজবাজির খেইল দ্যাহাইছেন। বলে মজিদ খালাসি।
