কেন?
জানি না ভাই, কিছুই জানি না। আপনি সিগারেট খান–কোনো অসুবিধা নাই। আমরা এখন সুবিধা অসুবিধার অতীত।
আপনি একটা খাবেন?
আমি ধূমপান করি না।
শাহেদ সিগারেট ধরাল। দিয়াশলাই-এর আগুনে সে একবালকের জন্যে সহযাত্রীদের মুখ দেখল। শুরুতে সে প্রচণ্ড ধাক্কা খেল–সবাই একপলকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? সে কী করেছে? সে কি ভয়ঙ্কর কিছু করেছে? নাকি ভয়ঙ্কর কিছু তার জীবনে ঘটতে যাচ্ছে? সিগারেটে টান দিয়ে প্রথম শিকের ধাক্কাটা শাহেদ সামলে ফেলল। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে কেন–সেই রহস্য ভেদ হয়েছে। সে দিয়াশলাই জুলিয়েছে। সবাই তাকিয়েছে আগুনের দিকে। তার দিকে না। কাজেই তার ভীত হবার কিছু নেই। শাহেদ লক্ষ করল তাঁর ভয়টা একটু যেন কমে গেল। সিগারেটের নিকোটিন শরীরে ঢোকার কারণে কি কমল? নিকোটিন কি মানুষকে সাহসী করে? সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সে একটা ছবি দেখেছিল–নাম মনে পড়ছে না। রাশিয়ান ছবি। সেখানে রাশিয়ান একজন কর্নেলকে নাৎসি সৈন্যরা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মারে। কর্নেলকে পেছন দিকে হাত বেঁধে দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন কর্নেল মাথা ঘুরিয়ে বলেন, আমি কি একটা সিগারেট পেতে পারি? তাকে সিগারেট দেয়া হয়। যেহেতু হাত বাধা, একজন সিগারেট ধরিয়ে কর্নেলের ঠোঁটে পুরে দেয়। কর্নেল জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে নিয়েই বলেন, থ্যাংক য়্যু সোলজার। তারপর বেশ আয়েশ করে সিগারেট টানতে থাকেন। কর্নেলের ঠোঁটে সামান্য হাসির আভাস, যেন পুরো ব্যাপারটায় তিনি খুব মজা পাচ্ছেন।
ছবিতে যে-সব ঘটনা ঘটে বাস্তবে কি তাই ঘটে? মিলিটারিরা যদি শাহেদকে গুলি করে মারার জন্যে নিয়ে যায় তাহলে কি সে বলতে পারবে, আমি কি একটা সিগারেট পেতে পারি? ধরা যাক তারা তাকে একটা সিগারেট দিল। সে কি কর্নেল সাহেবের মতো ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে সিগারেট টানতে পারবে? মৃত্যুর আগে আগে বিশেষ কোনো স্মৃতি কি তার মনে পড়বে? বিশেষ কোনো স্মৃতি শাহেদের নেই– তার সব স্মৃতিই সাধারণ। অতি সাধারণ মানুষের জীবনেও কিছু নাটকীয় ঘটনা থাকে, তার তাও নেই। মিলিটারিরা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে–এটাই বোধহয় তার জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা। সে যদি এ যাত্রা বেঁচে যায়, তাহলে সে বৃদ্ধ বয়সে সে এই ঘটনা নিয়ে রুনির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গল্প করবে–বুঝলে দাদুরা, সে এক কাল রাত্রি, উনিশশো একাত্তর সনের ঘটনা। তোমাদের মার বয়স তখন ছয় বছর। সে কোথায় আছে কী করছে কিছুই জানি না। দুশ্চিন্তায় আমার মাথা খারাপের মতো হয়ে গেছে। ভাই পাগলা বলে এক পীর সাহেবের কাছে
গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে–নতুন কাউকে তোলা হয় নি। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, শাহেদের ঘুম পাচ্ছে। ঘুমে চোখ প্ৰায় বন্ধ হয়ে আসছে। বারবার ঘুমের ঘোরে পাশের ভদ্রলোকের কাধে মাথা লেগে যাচ্ছে। শাহেদের খুব লজ্জা লাগছে–তার সামনে এত বড় বিপদ আর সে এরকম ঘুমিয়ে পড়ছে কেন? তার উচিত এক মনে দোয়া দরুদ পড়া। আয়াতুল কুরসি পড়ে তিনবার বুকে ফু দিতে পারলে হতো। আয়াতুল কুরসি সূরাটা শাহেদের মুখস্থ নেই। আয়তুল কুরসি ছাড়াও তো দোয়া আছে। ইউনুস নবি মাছের পেটে বসে যে দোয়া পড়ে উদ্ধার পেলেন। দোয়া ইউনুস। লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবাহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজাজোয়ালেমিনা। এমন ঘুম পাচ্ছে–ঘুমের কারণে দোয়া এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। শাহেদ সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ল। বেশ আরামের ঘুম। সে ঘুমুল পাশের ভদ্রলোকের কাধে মাথা রেখে। তিনি কিছুই বললেন না। কাঁধ পেতে রাখলেন–যাতে ঘুমকাতুর মানুষটা আরামে ঘুমোতে পারে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল জামশেদ তার বয়স্যদের কাছে জাশ নামে পরিচিত। গোয়েন্দা বিভাগের এই অফিসার বড় মজাদার মানুষ। কথায় কথায় রসিকতা করেন। এমন রসিকতা যে নিতান্তই অরসিক মানুষও হো হো করে হেসে উঠবে। রসিকতা ছাড়াও তিনি আর যে বিদ্যা জানেন তার একটি হচ্ছে ম্যাজিক। এক প্যাকেট তাস পেলে সেই এক প্যাকেট তাস দিয়ে তিনি আধঘণ্টা দর্শকদের মন্ত্ৰমুগ্ধ করে রাখেন। পামিং-এর বিদ্যাও ভালো আয়ত্ত করেছেন। শূন্য থেকে কাঁচা টাকা বের করা, সেই কাঁচা টাকা শূন্যে মিলিয়ে দেওয়া তার কাছে কিছুই না। কর্নেল জাশ অবিবাহিত। বিয়ে না করার পেছনে তার যুক্তি হচ্ছে–তিনি ট্রেনে করে ঘুরতে পছন্দ করেন। জানালার পাশে বসে দৃশ্য দেখতে দেখতে যাওয়া। বিয়ে করলে এই সুযোগ পাওয়া যাবে না–কারণ স্ত্রীকে জানালার পাশে বসতে দিতে হবে। এই কারণেই বিয়ে করছেন না।
এই অতি মজাদার কর্নেল জাশ গোয়েন্দা বিভাগে আছেন চাকরির শুরু থেকেই। কাজটা তার খুব পছন্দের। গোয়েন্দা বিভাগের কাজের পেছনে রহস্য থাকে, মজা থাকে এবং আচমকা বিস্ময় থাকে। এইসব জিনিস একজন ম্যাজিসিয়ানের পছন্দ হবারই কথা।
সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ তাদের কর্মকাণ্ড মূলত সামরিক বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে। কর্নেল জাশ সেই সীমা বৃদ্ধি করেছেন। তিনি সিভিলিয়ানদের মধ্যেও কাজ করছেন। তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ না। ঢাকা শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে নানান ধরনের লোকজন ধরে নিয়ে আসা। তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করা। আতঙ্কে অস্থির হয়ে যাওয়া মানুষদের সঙ্গে গল্প করতেও তার ভালো লাগে। কর্নেল জাশ যে-সব হতভাগ্যকে গল্পগুজব করার জন্যে ডেকে আনেন–তাদের বেশিরভাগকেই ডেথ স্কোয়াডের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যাপারে কর্নেল জাশের বিবেক খুব পরিষ্কার। তার যুক্তি হচ্ছে—আমরা যুদ্ধাবস্থায় আছি। যুদ্ধাবস্থার প্রথমদিকে শক্রর মনে ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি করতে হয়। আতঙ্ক, হতাশা এবং অনিশ্চয়তা। এই তিনটি আবেগ একসঙ্গে তৈরি করা মানে যুদ্ধের প্রাথমিক বিজয়। শত্রুপক্ষের মরাল যাবে ভেঙে। ভাঙা মরাল নিয়ে শত্ৰু কখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
