একদল লোক ধরে আনা হচ্ছে, তারা উধাও হয়ে যাচ্ছে। আত্মীয়স্বজনরা তাদের কোনো খোঁজ বের করতে পারছে না। এরচেয়ে অনিশ্চয়তা তো আর কিছু হতে পারে না। এই খবর তারা চারদিকে ছড়াবে। মুখে মুখে পল্লবিত হবে ভয়ঙ্কর গল্প। যুদ্ধাবস্থায় এর প্রয়োজন আছে।
কর্নেল জাশ হালকা ঘিয়া রঙের একটা হাওয়াই শার্ট পরেছেন। তার হাতে চুরুট। তিনি চুরুট বা সিগারেট কিছুই খান না। সিগারেটের গন্ধে তার মাথা ধরে যায়। বন্দিদের জেরা করার সময় তিনি হাতে চুরুট রাখেন। চুরুট জুলিয়ে রাখা কঠিন–ক্ৰমাগত টানতে হয়। কাজটা তার খারাপ লাগে না। চুরুট নিয়ে কথা বলতে বলতে জেরা করায় আলাদা নাটকীয়তা আছে। কর্নেল জাশের ঘরটা ছোট। আসবাবপত্র বলতে ছোট্ট একটা টেবিলের পেছনে রিভলভিং
করা হবে সে-ই এই চেয়ারে বসে। একটা সিলিং ফ্যান আছে। ডিসি কারেন্টের পাখা–বাতাসের চেয়ে শব্দ বেশি হয়। কর্নেল সাহেব ইচ্ছা করলেই ফ্যানটা বদলে ভালো একটা ফ্যান নিতে পারেন। তিনি নেন না। ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দের ভয় ধরানো এফেক্টটা তার ভালো লাগে। তার রিভলভিং চেয়ার যখন ঘুরে তখনো কটকট ধরনের শব্দ হয়। সেই শব্দও তার ভালো লাগে। মৃত্যুভয়ে অস্থির একটা মানুষ তার সামনে বসে আছে। তিনি নিভে যাওয়া চুরুট ধরাতে ধরাতে হঠাৎ চেয়ার ঘুরিয়ে তাকালেন–কটকট শব্দে সামনে বসে থাকা লোকটা আতঙ্কে নীল হয়ে গেল। এই দৃশ্য মজার দৃশ্য।
শাহেদ কর্নেল জাশের সামনের চেয়ারে জবুথবু হয়ে বসে আছে। প্রথম সে তার দুটা হাত চেয়ারের হাতলে রেখেছিল। হঠাৎ মনে হলো এতে বেয়াদবি প্ৰকাশ পেতে পারে। এখন তার হাত কোলের উপর রাখা। তার প্রচণ্ড প্ৰসাবের বেগ হয়েছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি ব্লাডার ফেটে যাবে।
কর্ণেল সাহেব চেয়ার ঘুরিয়ে শাহেদের দিকে তাকালেন। হালকা গলায় বললেন, আপ কা তারিফ?
শাহেদ প্রশ্নটার মানে বুঝতে পারল না। তারিফ শব্দটার মানে কী? উর্দুটা মোটামুটি জানা থাকলে সহজে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যেত। উর্দু জানাটা উচিত ছিল। ক্লাস সিক্সে এরাবিক না নিয়ে উর্দু নেওয়া উচিত ছিল। এরাবিক নিয়েছিল নাম্বার বেশি পাওয়া যায় বলে। তাতে লাভ হয় নি। ক্লাস এইট থেকে নাইনে উঠার পরীক্ষায় সব বিষয়ে পাসমার্ক থাকলেও এরাবিকে পেয়েছিল বত্ৰিশ।
কর্নেল সাহেব একটু ঝুকে এসে বললেন, স্যার, আপ কা নাম?
শাহেদ একটু কেঁপে উঠল। মানুষটা তাকে স্যার বলছে কেন? রসিকতা করে বলছে? মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে না রসিকতা। মনে হচ্ছে, সম্মান দেখাচ্ছে।
মাই নেম ইজ শাহেদ।
আপকা উর্দু নেহি আতা?
জি-না স্যার।
কর্নেল সাহেব টেবিল থেকে তাসের প্যাকেট হাতে নিলেন। এটা তার *একটা খেলা। নাম জিজ্ঞেস করে তিনি কিছুক্ষণ তাস সাফল করে একটা তাস টেনে নেবেন। লাল রঙের তাস উঠে এলে মৃত্যুদণ্ড। কালো তাস হলে লোকটাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। চান্স ফিফটি ফিফটি। ভাগ্য পরীক্ষা। তিনি এই ভাগ্য পরীক্ষার খেলাটা যখন খেলেন, তখন নিজেকে ঈশ্বরের কাছাকাছি মনে হয়। কর্নেল সাহেব তাস টানলেন–লাল রঙের তাস উঠে এলো। ফোর অব ডায়মন্ডস। লোকটার ভাগ্য খারাপ।
আর ইউ ম্যারেড?
ইয়েস স্যার।
লোকটা যেহেতু বিবাহিত, তাকে আরেকটা সুযোগ দেয়া যেতে পারে। কর্নেল সাহেব আরেকবার তাস টানলেন। এবারো লাল রঙের তাস। হাটের দুই। আশ্চর্য! এর ভাগ্য তো খাঁ বাপ। খুবই খারাপ।
ডু ইউ হ্যাভ চিলড্রেন?
ইয়েস স্যার। ওয়ান ডটার।
আচ্ছা ঠিক আছে; মেয়েটার খাতিরে আরেকটা সুযোগ। তবে এই দফায় লাল উঠলে খেল খতম। কর্নেল জাশ আরেকবার তাস সাফল করলেন। কালো তাস উঠার প্রবাবিলিটি খুব বেশি। পরপর তিনবার লাল উঠার কোনো কারণ নেই।
তৃতীয়বারও লাল কার্ড উঠল। ডায়মন্ডের কুইন। কর্নেল জাশ হাসিমুখে বললেন, ওকে স্যার। ইউ ক্যান লিভ।
শাহেদ ঘর থেকে প্রায় টলতে টলতে বের হলো। কর্নেল জাশ শাহেদের নামের পাশে লাল ক্রস দিলেন।
কোনোরকম কারণ ছাড়া মানুষ মেরে ফেলা যায়? মৃত্যু এত তুচ্ছ, এত সহজ? শাহেদ ভয়ে অস্থির হলো না, বিস্ময়ে অভিভূত হলো। সামান্য গাছের পাতাও তো মানুষ অকারণে ছিঁড়তে পারে না। বর্ষায় পিপড়ার লম্বা সারি দেখা যায়। মানুষ সেই পিপড়ার সারিও ডিঙিয়ে যায়। মানুষ চায় না পিপড়ার মতো তুচ্ছ প্রাণীও তার পায়ের চাপে মারা পড়ুক। এরা কেন অকারণে এতগুলি মানুষ মেরে ফেলবে? কোথাও কি ভুল হচ্ছে? ভুলটা কে করছে? সে করছে না তো? হয়তো এমনিতেই তাদের এনে মাঠে লাইন করে দাঁড়িয়েছে। নাম ঠিকানা লিখে ছেড়ে দেবে। না ছাড়লেও কোনো শাস্তি-টাস্তি দেবে। মেরে ফেলার প্রশ্ন আসছে কেন?
লম্বা দাড়িওয়ালা জোব্বা-জাব্বা ধরনের পোশাক পরা এক লোক এসে বলল, কলেমা পড়ে। কলেমা।
এ কি মিলিটারিদের মাওলানা? মৃত্যুর আগে কলেমা পড়াচ্ছে? শাহেদরা মোট নজন দাঁড়িয়ে আছে। শাহেদ আছে মাঝামাঝি জায়গায়। এরা কি একজন একজন করে নিয়ে গুলি করবে, না। সবাইকে একসঙ্গে গুলি করবে? গুলি করার হুকুম কে দেবে? অল্পবয়স্ক অফিসারটা? কাঁধের ব্যাজে তিনটা তারাক্যাপ্টেন। অফিসারটিকে তো বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে। তার চেহারা দেখে তো মনে হয় না কিছুক্ষণের মধ্যে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে।
ইজ পজিশনে আছে। মাটির ঢিবিটাই মনে হয় বধ্যভূমি। আশেপাশে কোনো গর্ত বা খানাখন্দ নেই। এরা ডেডবিডি ফেলবে কোথায়? আশেপাশে নদী থাকলে নদীতে নিয়ে ফেলত। নদী নেই, এরা কোনো গর্তও খোড়ে নি। পুরো ব্যাপারটা ওদের কোনো রসিকতা না তো? ভয় দেখিয়ে মজা করছে। মানুষকে ভয় দেখিয়ে আধমরা করে ফেলার ভেতর মজা আছে। দারুণ মজা।
