আপনার কন্যা এবং স্ত্রীর কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না?
জি-না।
বাইশ তেইশ। (স্ত্রীর বয়স জানার প্রয়োজন কী শাহেদ বুঝতে পারছে না)
দেখতে কেমন? (দেখতে কেমন দিয়ে প্রয়োজন কী?)
জি, ভালো।
নাম বলেন।
আসমানী।
ভালো নাম বলেন।
নুশরাত জাহান।
ভাই পাগলা চোখ বন্ধ করলেন। মিনিট পাঁচ ছয় তিনি চোখ বন্ধ অবস্থাতেই থাকলেন। তার হাতের তসবি অতি দ্রুত ঘুরতে লাগল। তিনি এক সময় চোখ মেলে বললেন, চিন্তার কিছু নাই, সে ভালো আছে।
ভালো আছে?
হুঁ। আপনার কন্যা ও মাশাল্লাহ ভালো আছে।
তারা কোথায় আছে?
ঢাকা শহরে নাই। শহর থেকে দূরে। ঢাকা থেকে নদী পথে গিয়েছে।
শাহেদ মনে মনে বলল, চুপ কর ব্যাটা ফাজিল। ঢাকা থেকে যারা বের হয়েছে, তাদের সবাই নদী পথেই গিয়েছে। আকাশপথে কেউ যায় নাই। ব্যাটা বুজরুক।
ভাই পাগলা বললেন, তারা আছে এক দোতলা বাড়িতে। বাড়ির সামনে ফুলের বাগান। জবা ফুল।
শাহেদ মনে মনে বলল, ব্যাটা থাম।।
তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন আপনার দেখা হবে না।
তাই নাকি?
জি। আপনার স্ত্রী তো সন্তানসম্ভবা। আপনার আরেকটি কন্যাসন্তান হবে।
শুনে খুব ভালো লাগল। হুজুর, আজ তাহলে উঠি?
ভাই পাগলা তাঁর পা বাড়িয়ে দিলেন–কদমবুসির জন্য। শাহেদ কদমবুসি করল না। লোকটির বুজরুকিতে তার মাথা ধরে গেছে।
ভাই পাগলা পীর সাহেবের কাছ থেকে ফেরার পথে সে মিলিটারির হাতে ধরা পড়ল। নাটকীয়তাবিহীন একটা ঘটনা। দেওয়ান সাহেবকে বিদায় দিয়ে সে সিগারেট কেনার জন্য পান, সিগারেটের দোকানে গিয়েছে। এক প্যাকেট সিজার্স সিগারেট কিনে টাকা দিয়েছে, তখন তার পাশে এক ভদ্রলোক এসে দাড়ালেন। বাঙালি ভদ্রলোক। তিনি সহজ গলায় বললেন, আপনার নাম কী?
শাহেদ বলল, নাম দিয়ে কী করবেন?
লোকটি নিচু গলায় বলল, আপনি একটু আসুন আমার সঙ্গে।
কেন?
দরকার আছে। বিশেষ দরকার।
শাহেদ তার সঙ্গে রাস্তা পার হলো। রাস্তার ওপাশে একটা মিলিটারি জিপ দাড়িয়ে আছে তা সে লক্ষ করে নি।
শাহেদকে জিপে উঠতে হলো।
মিলিটারি জিপগুলো সাধারণ জিপের মতো না। লম্বাটে ধরনের। বসার জায়গায় গদি বিছানো না–লোহার সিট। জিপটা সম্ভবত রঙ করা হয়েছে। নতুন রঙের কড়া গন্ধ। গা গুলিয়ে উঠছে। শাহেদকে ধাক্কা দিয়ে জিপে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে–সে পিছলে পড়ে যেত। অন্ধকারে, কেউ একজন তাকে ধরলা, সিটে বসিয়ে দিল। শাহেদ মনে মনে বলল, ধন্যবাদ। ইংরেজিতে থ্যাংক যু শব্দ করে বলা যায়। বাংলা ধন্যবাদ মনে মনে বলতেই ভালো লাগে।
অন্ধকারে কিছু দেখা না গেলেও শাহেদ বুঝতে পারছে জিপ ভর্তি তার মতো সাধারণ মানুষ। মানুষগুলো ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। ভীত মানুষের গা থেকে এক ধরনের গন্ধ বের হয়। সেই গন্ধ সূক্ষ্ম হলেও কটু ও ভারি। ভয়ের গন্ধ মানুষের স্নায়ুকে অবশ করে দেয়।
জিপ চলতে শুরু করেছে। মিলিটারি গাড়ি খুব দ্রুত চলে বলে যে জনশ্রুতি তা ঠিক না। জিপটা খুব আস্তে চলছে। জিপের সাসপেনশনও খুব খারাপ। গাড়ি খুব লাফাচ্ছে। জিপের ছাদে লোহার রডে শাহেদের মাথা ঠেকে গেল! শাহেদ যার পাশে বসেছে সেই ভদ্রলোক আশ্চর্যরকম মিষ্টি গলায় বললেন, এই ডাণ্ডাটা শক্ত করে ধরে বসে থাকুন। তিনি অন্ধকারেই শাহেদের হাত ধরে ডাণ্ডা দেখিয়ে দিলেন। কিছু কণ্ঠস্বর আছে একবার শুনলেই আবার শুনতে ইচ্ছে করে। ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর সে-রকম। সেই কণ্ঠস্বর আবারো শোনার জন্য শাহেদ বলল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
ভদ্রলোক বললেন, জানি না। গাড়ি এখন মিরপুর রোডে পড়েছে।
শাহেদ বলল, আমাদের ধরেছে কেন?
ভদ্রলোক জবাব দিলেন না। জিপ আবারো বড় রকমের বাকুনি খেল। শাহেদ জিপের ডাণ্ড শক্ত করে ধরেছিল বলে ব্যথা পেল না। যে বাকুনি তাতে ছিটকে পড়ে যাবার কথা।
মিলিটারিরা রাস্তাঘাট থেকে লোকজন ধরে নিয়ে যাচ্ছে কেন? তাদের উদ্দেশ্যটা কী? শাহেদ তাকে ধরার কারণ কিছুতেই বের করতে পারছে না। সে কোনো রাজনৈতিক নেতাও না, কমী ও না। লেখক না, কবি না, গায়ক না। সামান্য একজন। নিজের পরিবারের বাইরে কেউ তাকে চেনে না। মিলিটারির লোকজন তাকে চিনল কী করে? এই কদিনের দুঃখে, কষ্টে, চিন্তায়, দুর্ভাবনায় তার চেহারা কি ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে? তাকে দেখলেই কি মনে হয় সে ভয়ঙ্কর কিছু করবে? ভয়ঙ্কর কিছু করার ক্ষমতা শাহেদের নেই। সে অতি সাধারণ একজন। সাধারণরা সাধারণ কাজ করে। পড়াশোনায় সাধারণ রেজাল্ট করে, সাধারণ একটা চাকরি যোগাড় করে, সাধারণ একটা মেয়েকে বিয়ে করে সাধারণ জীবনযাপন করে। শাহেদ তাই করছে। তার জীবনযাত্ৰা ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে বাধা। ঝামেলাহীন গণ্ডিবদ্ধ জীবন।
গাড়ি আরেকটা বড় ধরনের বাকি খেয়ে থেমে গেল। আর নড়নচড়ন নেই। কী হচ্ছে? তারা কি পৌঁছে গেল? পৌঁছে গেলে মিলিটারিরা তাদের নামাবে। নামাবার জন্যে কেউ আসছে না। শাহেদ প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট এবং দিয়াশলাই বের করেছে। ধরাচ্ছে না। সিগারেট হাতে বসে থাকার মধ্যেও শান্তি আছে। গাড়ি অন্ধকার একটা জায়গায় থেমেছে। ভেতরে আলো আসছে না বলে শাহেদ তার সহযাত্রীদের মুখ দেখতে পাচ্ছে না। মুখ দেখলেও খানিকটা ভরসা। পাওয়া যেত। ভয়াবহ দুঃসময়ে মানুষের মুখ দেখলে মনে সাহস চলে আসে। শাহেদ বিড়বিড় করে বলল, কী হচ্ছে?
শাহেদের পাশের ভদ্রলোক বললেন, আবো লোক তুলবে।
কাদেরকে তুলবো?
হাতের কাছে যাদের পায়।
