দেশের খবরাখবর কী বলো?
বহুত আচ্ছা জনাব। বহুত খুব।
মিলিটারি সব ঠাণ্ডা করে দিয়েছে?
গাদার সব খতম হো গিয়া। আল্লাহ কা মেহেরবানি।
পুরানা গাদ্দার হয়তো খতম হয়েছে–নতুন গাদ্দার তৈরি হয় কি-না কে জানে।
আউর কুছ নেহি হোগা। ইন্ডিয়া খামোস রাহোগা— কিউকে চায়না। হ্যায় হামালোগাকো সাথ।
শাহেদ হাই তুলতে তুলতে বলল, এখন যাও তো মোশতাক–আমি ঘুমোব।
তবিয়ত আচ্ছা নেহি?
শাহেদ জবাব দিল না। সস্তা আতরের গন্ধে তার গা গুলাচ্ছে। এইসব আতর তৈরি হয়েছে ডেডবডির গায়ে ঢালার জন্যে। জীবিত মানুষদের জন্য না।
মোশতাক চলে গেল। দেশের সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে গল্পগুজব করার তার বোধহয় ইচ্ছা ছিল। বিহারিরা বাঙালিদের মতোই আডিডাবাজ।
শাহেদ খবরের কাগজ হাতে নিল। দুই পাতার দৈনিক পাকিস্তান বের হচ্ছে। খবর বলতে কিছুই নেই। অভ্যাসবশে চোখ বুলিয়ে যাওয়া—
দেশের পাঁচজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সেনাবাহিনীর কার্যক্রমকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। অখণ্ড পাকিস্তানে যারা বিশ্বাসী নয়। তাদের ব্যাপারে জনগণকে তাঁরা সদা প্ৰস্তুত থাকতে আহবান জানাচ্ছেন।…
খোলাবাজারে চালের দাম স্থিতিশীল
সচিত্র প্রতিবেদন। এক বেপারির হাসিমুখের ছবিও ছাপা হয়েছে। বেপারি দাড়িপাল্লায় চাল ওজন করছে। তার হাসিমুখ দেখে মনে হচ্ছে চালের ব্যবসা করে এত আনন্দ সে কোনোদিন পায় নি।
সুইজারল্যান্ডে বাস খাদে পড়ে চারজন নিহত
বিশাল রিপোর্ট। ক্রেন দিয়ে বাস তোলার ছবিও আছে।
শাহেদের মুখ বিকৃত হয়ে গেল। যে দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কুৎসিতভাবে মারা যাচ্ছে, সে দেশের একটি পত্রিকায় কী করে সুইজারল্যান্ডে বাস খাদে পড়ার ছবি ছাপায়? চারজন কেন, চারশ জন মারা গেলেও তো সেই ছবি ছাপা উচিত না। পত্রিকাটা কি সে দলামচা করে ডাস্টবিনে ফেলবে? কী হবে তাতে।
শাহেদ ভাই আছেন না-কি?
দরজা ঠেলে দেওয়ান সাহেব ঢুকলেন। দেওয়ান সাহেবের মুখভর্তি পান। হাতে সিগারেট। মনে হয় তিনি খুব আয়েশ করে সিগারেট টানছেন। তার মুখ হাসি হাসি।
শরীর খারাপ না-কি শাহেদ?
জি-না।
দাড়ি-গোঁফ গজিয়ে একেবারে দেখি সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। ভাবির কোনো খবর পেয়েছেন?
জি-না।
দেশের বাড়িতে খবর নিয়েছেন?
জি-না।
ঢাকা থেকে যারা পালিয়েছে, তাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনোভাবে দেশের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে। আপনার শ্বশুরবাড়ি কোথায়?
ময়মনসিংহের ভাটি অঞ্চলে। অনেক দূরের দেশ। এত দূরে একা একা আসমানী যাবে না।
ক্ষিধে পেলে বাঘ ধান খায়। ভয় পেলে বাঙালি একা একা অনেক দূর যায়।
ও আমাকে ফেলে রেখে কোথাও যাবে না। আমার ধারণা, সে ঢাকা কিংবা ঢাকার আশপাশেই আছে।
দেওয়ান সাহেব চেয়ার টেনে বসলেন। শাহেদ অবাক হয়ে লক্ষ করল, ভদ্রলোক আনন্দিত ভঙ্গিতে পা নাচাচ্ছেন।
শাহেদ ভাই!
জি।
তখন যদি আমার কথা শুনতেন, তাহলে আজ আর এই সমস্যা হতো না।
আপনার কী কথা?
ভুলে গেছেন? শেখ সাহেবের ৭ই মার্চের ভাষণের পরদিন আপনাকে বললাম না? ফ্যামিলি দেশে পাঠিয়ে দেন–সিচুয়েশন ভেরি গ্রেভ।
বলেছিলেন নাকি?
অবশ্যই বলেছিলাম। অফিসের এমন লোক নেই–যাকে আমি এই সাজেশন দেই নি। গরিবের কথা বাসি হলে ফলে। আমার কথা বাসি হয়েছে তো–তাই ফলেছে। টাটকা অবস্থায় ফলে নি। বললে বিশ্বাস করবেন নাআপনার ভাবি কিছুতেই দেশে যাবে না। ঝগড়া, চিৎকার, কান্নাকাটি। বলতে গেলে জোর করে তাকে লঞ্চে তুলে দিয়েছি। তুলে দিয়েছি বলে আজ ঝাড়া হাত-পা। যদি সেদিন লঞ্চে না তুলতাম–আজ আমার অবস্থাও আপনার মতো হতো। শাহেদ ভাই!
জি।
আজ আমার সঙ্গে চলেন এক জায়গায়।
কোথায়?
খুব কামেল একজন মানুষ আছেন–সবাই ভাই পাগলা ডাকে। অলি টাইপের মানুষ। তার কাছে আপনাকে নিয়ে যাব।
তাঁর কাছে গেলে কী হবে?
ওলি টাইপ মানুষ। তাদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রচুর। চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারবেন। ভাবি এখন কোথায়?
শাহেদ চুপ করে রইল। দেওয়ান সাহেব আগ্রহের সঙ্গে বললেন, হুজ্বরের কাছে খুব ভিড়। নিরিবিলি কথা বলাই মুশকিল। আমার কানেকশন আছে—ব্যবস্থা করব। যাবেন?
জি-না।
ক্ষতি তো কিছু হচ্ছে না–এরা কামেল আল্লাহওয়ালা আদমি।
শাহেদ বিরক্ত মুখে বলল, আমি পীর ফকিরের কাছে যাব না।
বিপদে পড়লে মানুষ গু পর্যন্ত খায়, আর আপনি যাবেন। একজন কামেল মানুষের কাছে। উনার কাছে পাকিস্তানি মিলিটারিরাও যায়। হাইলেভেলের অফিসারদের আনাগোনা আছে।
একবার তো বলেছি। যাব না। কেন বিরক্ত করছেন?
যাবে না বলার পরও শাহেদ ভাই পাগলা পীর সাহেবের কাছে এসেছে। দেওয়ান সাহেব তার কথা রেখেছেন। পীর সাহেবের সঙ্গে নিরিবিল কথা বলার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। পীর সাহেব বসে আছেন তার খাস, কামরায়। ছোট্ট ঘরের মাঝখানে কার্পেটের উপর হাঁটুমুড়ে তিনি বসে। তাঁর সামনে পানের বাটা ভর্তি পান।
পীর সাহেব পান চিবুচ্ছেন। পানের রস ফেলার জন্য পিকদান আছে। পিকদানটা মনে হচ্ছে রুপার। ঝকমক করছে। একটু পর পরই পিকদানে পিক ফেলছেন। তাঁর ডানহাতে বড় বড় দানার এক তসবি। সেই তসবি দ্রুত ঘুরছে। পীর সাহেব যখন কথা বলছেন তখনো তসবি ঘুরছে। সম্ভবত কথা বলা এবং আল্লাহর নাম নেয়ার দুটো কাজই তিনি এক সঙ্গে করতে পারেন। ভাই পাগলা পীর সাহেবের বয়স অল্প। তার মুখভর্তি ফিনফিনে দাড়ি। সেই দাড়ি সামান্য বাতাসেই কাঁপছে। পীর সাহেবের গলার স্বর অতিমধুর।
