বুঝেছি।
আমি ঠিক করেছি, নিজের বাড়িতে গিয়ে থাকব। বাড়ির দখল ছেড়ে দেয়া তো ঠিক না। বুদ্ধি ভালো বের করেছি না?
হুঁ।
তুমিও চলো আমার সঙ্গে। দুই ভাই একসঙ্গে থাকল।
ঘুমাও। রাত অনেক হয়েছে।
রাত হয়েছে বলেই তো আমি ঘুমাব না। মিতা, তোমার তো জানা উচিত আমি রাতে ঘুমাই না, দিনে ঘুমাই। নিজের নাম এখন দিয়েছি–গৌরাঙ্গ প্যাচক। নাম ভালো হয়েছে না?
হুঁ।
মুসলমান হওয়ার পর নাম বদলাতে হবে। মিতা, বলে তো কী নাম দেই? তোমার নামের সঙ্গে মিল দিয়ে একটা নাম ঠিক করো।
আচ্ছা করব।
করব না, এখন করো।
বিরক্ত করো না তো! নানান যন্ত্রণায় আছি। এখন আর বিরক্তি ভালো লাগে না।
আমি তোমাকে বিরক্ত করি?
শাহেদ চুপ করে আছে। তার এখন সত্যি সত্যি বিরক্তি লাগছে। গৌরাঙ্গ গলা উচিয়ে বলল, বিরক্ত করি? জবাব দাও, বিরক্ত করি?
হ্যাঁ, করো।
আর করব না। কাল সকালে আমি চলে যাব।
কোথায় যাবে?
সেটা আমার বিষয়। তুমি কোনোদিনই আমাকে পছন্দ করো না, সেটা আমি জানি। সকাল হোক। রাস্তায় রিকশা নামলেই আমি বিদায় হবো।
তোমার শরীর ভালো না। এখন পাগলামি করার সময়ও না।
এখন কী করার সময়? বিরক্ত করার সময়। Time of annoyance? আমার নতুন নাম এখন কি গৌরাঙ্গ বিরক্ত দাস? সংক্ষেপে জি বি দাস?
প্লিজ চুপ করো।
না মিতা, আমি চুপ করব না। আমি বিরক্ত করতেই থাকব। যা বিরক্ত করার আজ রাতেই করব। সকালে আমাকে পাবে না।
পরদিন ভোরবেলা গৌরাঙ্গ সত্যি সত্যিই শাহেদের বাসা ছেড়ে চলে গেল। শাহেদকে কিছু বলে গেল না। শাহেদ তখনো ঘুমে। শাহেদের বালিশের কাছে একটা চিঠি লিখে গেল। দু লাইনের চিঠি–
মিতা, চলে গেলাম।
তুমি ভালো থেকে।
ইতি
গৌরাঙ্গ বিরক্ত দাস
শাহেদের চেহারায় পাগল পাগল ভাব
শাহেদের চেহারায় পাগল পাগল ভাব চলে এসেছে। চোখ হলুদ, চোখের নিচে গাঢ় কালি। ছয় সাত দিন হলো দাড়ি কামানো হয় নি। একটা সার্ট পরে আছে যার মাঝের একটা বোতাম নেই। জায়গাটা ফাক হয়ে আছে–মাঝে মাঝেই পেট দেখা যাচ্ছে। পাগলের এলোমেলো ভাব তার চলাফেরার মধ্যেও চলে এসেছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। আজ এপ্রিল মাসের দশ, এখনো সে আসমানীর কোনো খবর বের করতে পারে নি। তার রোজাকার রুটিন হলো, ঘুম থেকে উঠেই কলাবাগানে চলে যাওয়া। তার শাশুড়ি এসেছেন। কিনা কিংবা কেউ কোনো খবর পাঠিয়েছে কিনা সেই খোঁজ নেয়া। তারপর তার অফিসে যাওয়া। তার অফিস খুললেও সেখানে বলতে গেলে কোনো লোকজন নেই, কাজকর্মও নেই। বি হ্যাপী স্যারের কোনো খোঁজ নেই। সম্ভবত তিনি পাকিস্তান চলে গেছেন। শাহেদ অফিসে তার নিজের ঘরে বসে। কয়েক কাপ চ খেয়ে বের হয়ে পড়ে এবং বেলা দুটা পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে। তার সারাক্ষণই মনে হয় এই বুঝি রুনি চেচিয়ে ডাকবে–বাবা! বাবা!
কেউ ডাকে না। দুপুর দুটিায় কোনো একটা হোটেলে ভাত খেতে বসেতখন মনে হয়, আসমানীরা বাড়ি ফিরে এসেছে। আসমানী তার স্বভাবমতো ঝাড়মোছা শুরু করেছে। রুনি বারবার বারান্দায় আসছে। আসমানী তাকে কঠিন বকা দিচ্ছে, খবরদার বারান্দায় যাবি না। এখন সময় খারাপ। মার বকা খেয়ে রুনির ঠোঁট বেঁকে যাচ্ছে কিন্তু সে কাঁদছে না।
এই জাতীয় চিন্তা মাথায় এলে আর ভাত খেতে ইচ্ছা করে না। শাহেদ আধখাওয়া অবস্থায় হাত ধুয়ে উঠে পড়ে। দ্রুত বাসায় যেতে হবে। সে বাসায় ফিরে এবং দেখে দরজায় ঠিক আগের মতো তালা ঝুলছে। গৌরাঙ্গেরও কোনো খোঁজ নেই। সে কোথায় গিয়েছে কে জানে!
শাহেদ তার অফিসে চেয়ারে পা তুলে জবুথবু হয়ে বসে আছে। তার সামনে চায়ের কাপ। এক চুমুক দিয়ে সে কাপ নামিয়ে রেখেছে আর মুখে দিতে ইচ্ছে করছে না। অথচ চা-টা খেতে ভালো হয়েছে। গতরাতে তার এক ফোটা ঘুম হয় নি। একবার তন্দ্রার মতো এসেছিল, তখন ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখেছে। প্ৰকাণ্ড একটা ট্রাক। মিলিটারি ট্রাক। ট্রাকভর্তি একদল শিশু। সবাই চিৎকার করে কাদছে। শিশুদের মধ্যে আছে রুনি। রুনি চিৎকার করে কাদছে না, তবে ফ্রকের হাতায় ক্রমাগত চোখ মুছছে। একজন মিলিটারি মেশিনগান তাক তরে শিশুগুলির দিকে ধরে আছে। মিলিটারির মুখ হাসি হাসি। স্বপ্ন দেখে শাহেদ ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসেছে, তারপর আর ঘুম আসে নি।
এখন ঘুম ঘুম পাচ্ছে, ইচ্ছা করছে অফিসের চেয়ারেই কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিতে। অফিসের পিওন মোশতাক খবরের কাগজ এনে টেবিলে রাখল। মোশতাক বিহার প্রদেশের লোক। চমৎকার বাংলা জানে। এতদিন সে রাংলাতেই কথা বলত— এখন উর্দুতে কথা বলে! মোশতাকের গলায় নকশাদার নীল রুমাল বাঁধা। শাহেদ লক্ষ করেছে, বিহারিরা এখন কেন জানি গলায় রঙিন রুমাল বাঁধছে। হয়তো আগেও বাধত— চোখে পড়ত না। এখন চোখে পড়ছে কারণ বিহারিদের এখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। বিহারিরা আলাদা হয়ে পড়েছে। তারা যোগ দিয়েছে মিলিটারিদের সঙ্গে। বাঙালির দুর্দশায় তারা বড় তৃপ্তি পাচ্ছে। হয়তো তাদের ধারণা, মিলিটারি সব বাঙালি শেষ করে এই দেশটাকে বিহার রাজ্য বানিয়ে দিয়ে যাবে।
শাহেদের ঝিমুনি চলে এসেছিল–মোশতকের খুকধুক কাশিতে নড়েচড়ে বসিল। মোশতাক গায়ে আতর দিয়েছে। আতরের বোটিক গন্ধ আসছে। চোখে সুরমা দেয়া হয়েছে। সুবম অবশ্যি সে আগেও দিত। বিহারিদের সুরমাখ্ৰীতি আছে। শাহেদ বলল, কিছু বলবে মোশতাক?
মোশতাক দাঁত বের করে হাসল।
