তার হাত চেয়ারের হাতলের সঙ্গে বাধা, চেয়ারের পায়ের সঙ্গে দুটা পা বাধা। পায়ের বাঁধন এত শক্ত যে দড়ি চামড়া কেটে মাংসে ঢুকে পড়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, পায়ে কোনো ব্যথা বোধ নেই। আবু তাহেরের মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। লালা পড়া শুরু হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। তার সামনে মিলিটারি গোয়েন্দা বিভাগের দুজন বসে আছে। দুজনের চেহারাটা তার কাছে একরকম মনে হচ্ছে। গোলাকার ফর্স মুখ। নাকের নিচে হালকা গোফ। আবু তাহেরের পেছনে একজন দাঁড়িয়ে আছে। সেই একজন মাঝে-মধ্যে তার সামনে আসছে। সেই একজনের চেহারাও অন্য দুজনের মতো। তবে সে রোগা। তার মুখে বসন্তের দাগ। এরা কি যমজ ভাই? এক সঙ্গে তিনজনের জন্ম কি হতে পারে?
তোমার নাম কী?
আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের।
নাম বলো।
আবু তাহের।
কেয়া নাম?
মোহাম্মদ আবু তাহের।
Telt me your name.
Sir, my name is Abu Taher.
তোমার নাম কী?
আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের।
তারা একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে। কতদিন ধরে করছে? একদিন দুদিন নাকি কয়েক বছর হয়ে গেল? তারা কি এই প্রশ্ন করেই যাবে? একই প্রশ্ন বারবার করার পেছনের অর্থ কী? আবু তাহের কিছুক্ষণ আগে চেয়ারে প্রস্রাব করেছে। সেই প্রস্রাব গড়িয়ে গেছে সামনে বসে থাকা দুজনের দিকে। তারা তাকিয়ে দেখেছে। কিন্তু এই বিষয়ে কিছুই বলে নি। তারা কিছুক্ষণ পর পর সিগারেট ধরাচ্ছে। সেই সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ ভয়াবহ। নাড়ি পাক দিয়ে বমি আসছে।
মোহাম্মদ আবু তাহের?
জি স্যার।
ঢাকা শহরে যেসব মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা কাজ করছে।–তাদের কাউকে তুমি চেন?
জি-না স্যার।
কিন্তু তুমি তো মতিঝিলে হাটখোলা শাখার হাবীব ব্যাংক লুটের সময় জড়িত ছিলে। তোমার সঙ্গে আর কে কে ছিল?
স্যার, আমি হাবীব ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।
তুমি কী করো?
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ফিজিক্সে M.Sc. থিসিস গ্রুপ।
টিকাটুলি ওয়েল ট্যাংকার হাইজ্যাকে তুমি ছিলে না?
জি-না স্যার।
এখন আমরা তোমার ডান হাতের পাঁচটা আঙুলে পিন ঢুকিয়ে দিব। তুমি যদি অপরাধ স্বীকার করো, তবেই তা বন্ধ করা হবে।
স্যার, মুক্তিবাহিনীর কোনোকিছুর সঙ্গেই আমি জড়িত না।
তোমরা তিনভাই। বাকি দুজন কোথায়?
স্যার, বাকি দুজন কোথায় আমি জানি না।
আমরা যতদূর জানি বাকি দুজন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে।
ওদের খবর আমি জানি না। স্যার।
তুমি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দাও নাই কেন?
আমি পাকিস্তানে বিশ্বাস করি। ইন্ডিয়া আমাদের শক্র। পাকিস্তান জিন্দাবাদ। কায়দে আজম জিন্দাবাদ। লিয়াকত আলি খান জিন্দাবাদ। মহাকবি ইকবাল জিন্দাবাদ।
গোয়েন্দা বিভাগের দুজন শব্দ করে হেসে উঠল। তাদের একজন হাসতে হাসতে বলল, দাও ওর আঙুলে পিন ফুটিয়ে দাও।
আবু তাহের বিড়বিড় করে বলল, আল্লাহ আমাকে অজ্ঞান করে দাও। আল্লাহপাক আমাকে অজ্ঞান করে দাও। আমাকে অজ্ঞান করে দাও।
কী তীব্র ব্যথা! কী ভয়াবহ যন্ত্রণা! চোখের সামনে হঠাৎ করে আগুনের মতো কী যেন ঝলসে ওঠে। পিন ফুটানোর ব্যথাটা হাতের আঙুলে হয় না। অন্য কোথাও যেন হয়।
স্যার পানি খাব। স্যার পানি খাব।
তোমার নাম কী?
আমার নাম আবু তাহের, স্যার পানি খাব।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের চৌরাস্তার ট্রাফিক স্টপে মন্ত্রী মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাকের গাড়িতে গ্রেনেড ছোড়া হয়। যারা এই কাজটা করে, তুমি কি তাদের সঙ্গে ছিলে?
সার, পানি খাব।
প্রশ্নের জবাব দাও, তুমি তাদের সঙ্গে ছিলে?
ছিলাম স্যার।
হাবীব ব্যাংক লুটের সময় ছিলে?
ছিলাম স্যার। পানি খাব।
টিকাটুলি অপারেশনে ছিলে?
জি স্যার। এক গ্রাস পানি দেন। পানি খাব।
গেরিলারা কে কোথায় লুকিয়ে থাকে, তুমি জানো?
জানি স্যার।
ওদের দুইজনকে, শুধুমাত্র দুইজনকে ধরিয়ে দিতে পারলে আমরা তোমাকে ছেড়ে দিব। ধরিয়ে দেবে?
জি স্যার। একটু পানি খাব।
আবু তাহেরকে পানি খেতে দেয়া হলো। চোখের উপরের বাতি নিভিয়ে দেয়া হলো। ঘরে এখনো বাতি জ্বলছে। কিন্তু আবু তাহের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তার কাছে মনে হচ্ছে ঘর অন্ধকার। কবর কি এরকম অন্ধকার হয়?
মোহাম্মদ আবু তাহের।
জি স্যার।
নাও সিগারেট নাও।
আমি সিগারেট খাই না।
না খেলেও সিগারেটে টান দাও। এই অবস্থায় শরীর নিকোটিন পছন্দ করে।
আবু তাহের সিগারেট টানছে। সিগারেট তার বা হাতে ধরা। সে ডান হাত তুলতে পারছে না। তার ডান হাতের প্রতিটি আঙুলে পিন ফুটানো হয়েছে। মধ্যমা আঙুলের পিন ঠিকমতো ফুটে নি। অর্ধেক বের হয়ে আছে। একবার তার কাছে মনে হলো, এরকম কিছুই ঘটে নি। সে ভয়ঙ্কর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। তার বোঝায় ধরা রোগ হয়েছে। বোঝায় ধরার আগে আগে সে এরকম দুঃস্বপ্ন দেখে। ঘুম ভাঙলেই দেখা যাবে সব ঠিক আছে।
মোহাম্মদ আবু তাহের?
জি।
অনেকে শাস্তির হাত থেকে বাচার জন্যে সব অপরাধ স্বীকার করে। তাদেরকে যখন বলা হয়–মুক্তি যেখানে থাকে সেখানে নিয়ে চল— তখন তারা কোথাও নিয়ে যেতে পারে না। কাউকে ধরিয়েও দিতে পারে না। তারা আমাদের সময় নষ্ট করে। তুমি বলে আমাদের সময় নষ্ট করা কি উচিত?
জি-না।
তুমি আমাদের সময় নষ্ট করছ না তো?
জি-না।
কাউকে যদি ধরিয়ে দিতে না পোর, তাহলে আমরা তোমাকে মজার একটা শাস্তি দেব। শাস্তির ইংরেজি নাম Castration. তোমার দুটা অণ্ডকোষ কেটে ফেলে দেব। খোঁজা বানিয়ে দেব। খোঁজা কী চেন?
