চিনি।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটা পুরুষকে খোজা বানিয়ে দিতে পারলে হতো; একটা নতুন জাতি তৈরি হতো। নপুংসক জাতি। ভালো হতো না?
জি স্যার। ভালো হতো।
এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা তোমাকে নিয়ে বের হব। তুমি বাড়িগুলি চিনিয়ে দেবে। তোমার হাত থেকে আমরা পিন সরাব না। যে রকম আছে, সে রকমই থাকবে। ঠিক আছে?
জি স্যার।
তোমার একটা আঙুলের পিন দেখছি ঠিকমতো ঢোকানো হয় নি। ঢুকিয়ে দেই?
দিন স্যার।
আচ্ছা এখন থাক। আমরা ভ্ৰমণ শেষ করে কাজটা করব।
জি আচ্ছা স্যার।
ভ্ৰমণে যাবার আগে কিছু কি খাবে? এক পিস কেক। এক কাপ চা।
খাব স্যার।
কাজটা সেরে এসে খাই? প্ৰথমে কাজ তারপর খাদ্য। সেটা ভালো না?
জি স্যার ভালো। খুব ভালো।
গাঢ় নীল রঙের একটা টয়োটা গাড়ি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরছে। গাড়ির কাচ এমন যে, ভেতবের আরোহীদের বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু গাড়ির ভেতরের মানুষরা বাইরে কী হচ্ছে দেখতে পাচ্ছে। পেছনের সিটে আবু তাহের বসে আছে। তার শায়ে কম্বল জড়ানো। আবু তাহেরের মুখ দিয়ে এখনো লালা পড়ছে। প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। কিছুক্ষণ পরপর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। আবু তাহেবের দুপাশে দুজন। আবু তাহের বাড়ি দেখিয়ে দিচ্ছে, এই দুজন নোট নিচ্ছে। বাড়ি দেখানোর কাজটা আবু তাহের করছে কিছুই না জেনে। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তার কোনোই যোগ নেই। তারা কে কোথায় থাকে সে কিছুই জানে না।
স্যার, এই বাড়ি।
এটা তো দোতলা বাড়ি। দোতলা বাড়ির কোন তলা?
সেটা বলতে পারছি না। স্যার।
ভালো করে দেখে বলো, এই বাড়ি?
জি স্যার।
এখন কোন দিকে যাব?
পুরানা পল্টন।
পুরানা পল্টন?
জি স্যার।
পুরানা পল্টনে যে থাকে তার নাম কী?
নাম জানি না স্যার। রাতে এই বাড়িতে এসে ঘুমায়।
একা ঘুমায় নাকি আরো লোকজন থাকে?
সেটা বলতে পারছি না স্যার। আবু তাহের ঢাকা নগরের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি বাড়ি দেখিয়ে দিল। সেই রাতেই পাঁচটি বাড়ি থেকে নয়জনকে মিলিটারি ধরে নিয়ে গেল। তাদের কেউই জীবিত ফিরে এলো না। এই নয়জনের কেউই মুক্তিবাহিনীর বিষয়ে কিছুই জানত না।
এই নয়জন আরো কিছু মানুষের নাম বলল। অদ্ভুত এক চেইন রিঅ্যাকশন। তরুণ যুবকরা ধরা পড়ছে। কেন ধরা পড়ছে তারা জানে না। কোনো একজনের নাম বলে দিলে অত্যাচারের হাত থেকে বাচার সম্ভাবনা। তারা নাম বলছে। বাড়িঘর দেখিয়ে দিচ্ছে।
সেই সময় দুস্কৃতিকারী ধরার জন্যে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। পুরস্কারের লোভে যদি কেউ এগিয়ে আসে। জেলা প্রশাসকরা যে-কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে ধরিয়ে দিতে পারলে এক হাজার টাকা পুরস্কার দিতে পারতেন।*
ক. সাধারণ দুস্কৃতিকারী বিষয়ে খবর দেয়ার জন্যে ৫০০ টাকা।
খ. ভারতের ট্রেনিংপ্রাপ্ত দুস্কৃতিকারীর বিষয়ে খবর দেয়ার জন্যে ৭৫০ টাকা।
গ. আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতারের জন্যে ১,০০০ টাকা।
ঘ. দুস্কৃতিকারী দলের নেতা গ্রেফতারের জন্যে ২,০০০ টাকা।
ঙ. অন্ত্রশস্ত্রসহ দুস্কৃতি দলের নেতা গ্রেফতারের জন্যে ১০,০০০ টাকা।
————–
*সূত্র : দৈনিক পাকিস্তান
ইন্দিরা গান্ধী
জওহরলাল নেহেরুর একমাত্র কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর দেশের মানুষ শ্ৰদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে ডাকে ইন্দিরাজি।
ইন্দিরাজী কোলকাতা বিগ্রেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বক্তৃতা দেবেন। তারিখ ডিসেম্বর তিন। তাঁর আসার কথা ছিল চার তারিখে, তিনি একদিন আগেই চলে এসেছেন। এর কোনো বিশেষ তাৎপর্য কি আছে? আজই কি সেই দিন? সেই মাহেন্দ্ৰক্ষণ? আজই কি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া হবে? হিন্দুস্থান সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে সরাসরি নেমে পড়বে। স্বাধীন হবে বাংলাদেশ। এক কোটি শরণার্থ যারা অন্য এক দেশে, অচেনা পরিবেশে অবর্ণনীয় দুঃখে। জীবনযাপন করছে তারা ফিরে যাবে নিজ বাসভূমে।
বিগ্রেড প্যারেড গ্রাউন্ড লোকে লোকারণ্য। উদগ্ৰীব মানুষের সমুদ্র। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার বিশেষ ভাষণ সবাই শুনতে চায়।
ইন্দিরাজী ভাষণ শুরু করলেন। শান্ত গলায় প্রায় উত্তেজনাহীন বক্তৃতা। তিনি নতুন কিছু বললেন না। শরণার্থীদের দুঃখ-দুৰ্দশার কথা বললেন। বিদেশী শক্তিদের আবারো আহ্বান করলেন সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার জন্যে। বক্তৃতা শেষ হয়ে গেল। তবে বক্তৃতা চলাকালিন সময়ে তিনি একটা ছোট্ট চিরকুট পেলেন। চিরকুট দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্যে তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল। চোখের দৃষ্টি হলো তীব্র। তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে যেন কিছুই হয় নি এমন ভঙ্গিতে বক্তৃতা শেষ করলেন।
চিরকুটে লেখা ছিল— পাকিস্তান বিমানবাহিনী হঠাৎ করে অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্ৰীনগর, অবন্তিপুর, যোধুপুর, আম্বালা এবং আগ্ৰায় বোমা বর্ষণ করেছে। পাঞ্জাব সীমান্তে পাকিস্তান স্থলবাহিনী যুদ্ধ শুরু করেছে। তারা ভারতের ভেতরেও কিছুদূর ঢুকে পড়েছে।
ইন্দিরা গান্ধী দিল্লি ফিরে গেলেন। ডিসেম্বরের চার তারিখ মধ্যরাতে আকাশবাণী দিল্লি কেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের মানুষদের বহু প্ৰতীক্ষিত বিশেষ ঘোষণাটা দিলেন। এই ঘোষণায় বাংলাদেশের স্বীকৃতি ছিল না, কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল সেই স্বীকৃতি আসার পথ তৈরি হচ্ছে
Today the war in Bangladesh has become a war on india…
Aggression must be met and the people of india will meet it with fortitude and determination and with discipline and atmost unity.
