কয়েস আলি উদাস গলায় বলল, ঘটনা ভালো না।
ঘটনা ভালো না মানে কী?
সারেঙ লঞ্চ ফালায়ে তার হেলপার নিয়ে পালায়ে গেছে বলে মনে হয়।
এরকম মনে হবার কারণ কী?
হাবেভাবে বুঝলাম। দুই আর দুই-এ মিল করে চার বের করলাম। সহজ হিসাব, জটিল হিসাব তো না।
জটিল হিসাব না?
জি-না। আপনাকে আগেই বলেছি। সারেঙের বাড়ি চিটাগাং, এই অঞ্চলের কিছুই সে চিনে না। সে কীভাবে মেকানিক ধরে আনবে?
এটা আমাকে আগে বলো নি কেন?
একবার ভাবলাম বলি। পরে ভাবলাম মানুষরে এত সন্দেহ করা ঠিক না। সে লঞ্চ নিয়া এই অঞ্চলেই চলাফেরা করে। মেকানিকের বাড়ি চিনতেও পারে।
সারেঙ যদি সত্যি সত্যি পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আমাদের করণীয় কী?
জনাব, এই বিষয়ে আমি গভীর চিন্তায় আছি। একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনুমতি দিলে বলি।
বলো।
আমার মন বলতেছে লঞ্চের ইঞ্জিন ঠিক আছে। ব্যাটা ইচ্ছা কইরা লঞ্চ চড়ায় উঠায়ে দিয়েছে।
লঞ্চ কি চড়ায় বেধে আছে?
জি। শিকারপুরে ছোট লঞ্চ আছে। আপনি যদি আমার সঙ্গে কোনো লোক দেন। আমি নৌকাযোগে শিকারপুর যাব। সেখান থেকে লঞ্চ নিয়ে ফিরব। জায়গাটা ভালো না। রাতে এখানে লঞ্চে আটকা পড়লে বিপদ আছে। হেমায়েত বাহিনী শক্ত জিনিস।
তুমি শিকারপুর থেকে লঞ্চ নিয়ে আসতে চাও?
শিকারপুরের দুই-একজন লঞ্চ মালিকের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। তবে আপনি যদি অন্য কাউকে পাঠাইতে চান, পাঠাইতে পারেন। আমার একটাই কথা, সন্ধ্যার পর এই অঞ্চলে থাকা অতি বিপদজনক। আমি সারেঙের ঘরে আছি। কোন সিদ্ধান্ত হয় আমাকে জানাবেন। আছরের নামাজ পড়ব। আমি সব নামাজ কাজ পড়তে রাজি আছি, আছরের নামাজ কাজ পড়তে রাজি না। ক্যাপ্টেন সাহেব কি জানেন রোজকেয়ামত হবে আছরের ওয়াক্তে?
ক্যাপ্টেন জানে রসুল জবাব দিলেন না। সরু চোখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার এখন সন্দেহ হচ্ছে, লঞ্চ মাঝনদীতে এনে চড়ে আটকে ফেলার পেছনে এই লোকটার ভূমিকা আছে। বেশ বড় ভূমিকা। এই লোক কাজ করছে তার পরিকল্পনা মতো। সারেঙের সঙ্গে পরামর্শ করে লঞ্চ আটকানোর ব্যবস্থা করেছে। নদীর দুপাশে ঘন নারিকেল বন। নারিকেল বনের কভার নিয়ে হেমায়েত বাহিনী সহজ যুদ্ধ করবে। তিনি লঞ্চ নিয়ে খোলা জায়গায় আছেন, তার কোনো কভার নেই।
তোমার নাম কয়েস আলি?
জি স্যার।
বিয়ে কবেছ?
জি স্যার।
ছেলেমেয়ে আছে?
দুই ছেলে এক মেয়ে। ছেলে দুইজনকেই মাদ্রাসায় ভর্তি করায়ে দিয়েছি। হাফেজিয়া মাদ্রাসা। তালা কোরান মজিদ মুখস্থ করতেছে। ছোট ছেলের পাঁচ পারা মুখস্থ হয়েছে। বড়টার এক পাড়া। বড়টার মাথার তেজ কম।
আমার ধারণা তুমি হেমায়েত বাহিনীরই একজন। ইচ্ছা করে আমাদের এখানে এনে ফেলেছি।
আপনি যা চিন্তা করতেছেন তা ঠিক না।
আমি তোমার সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে যাব না। আমি তোমাকে এখন লঞ্চের ছাদে নিয়ে তুলব। সেখানে গুলি করে ডেডবডি নদীতে ফেলে দেব।
আপনি আপনার বিবেচনা মতো কাজ করবেন, তবে হায়াত মাউতের মালিক আল্লাহপাক। আমার মৃত্যু যেমন হতে পারে, আপনাদের সবার মৃত্যুও এখানে হতে পারে। একটা লঞ্চ এখানে আটকা পড়ে আছে আর হেমায়েত বাহিনী এই খবর জানবে না তা কি হয়? যে সারেং পালেয়ে গেছে–খবর তার মাধ্যমেই চলে গেছে।
তুমি ছাদে চল।
কয়েস আলি বলল, জি আচ্ছা। মৃত্যুর আগে একটা পান খাওয়ার সুযোগ দিয়েন জনাব। জর্দা দিয়া ভালোমতো একটা পান খাইয়া নেই।
মাথায় গুলি করলেন। গুলি করার আগমুহুর্তে কয়েস আলি পানের পিক ফেলতে ফেলতে বলল, আপনাদের আজরাইল আসতাছে। বেশি দেরি কিন্তু নাই।
সন্ধ্যার পর পরই হেমায়েত বাহিনী দক্ষিণ দিক থেকে লঞ্চ আক্রমণ করল।
তখনো কয়েস আলির মৃতদেহ লঞ্চের আশেপাশেই আছে। জোয়ারের টান শুরু হয় নি বলে মৃতদেহ ভেসে যায় নি।*
—————–
* অসীম সাহসিকতাপূর্ণ কর্মকাণ্ডের জন্যে মোঃ হেমায়েতউদ্দিনকে বাংলাদেশ সরকার বীরবিক্রম সম্মানে সম্মানিত করেন। কয়েস আলি সম্মান স্বীকৃতি কোনোটাই পান নি। সমগ্র দেশের পক্ষ থেকে আমি এই লেখার মাধ্যমে তাঁর প্রতি সম্মান জানালাম। (কয়েস আলি নামটি ঠিক না। আসল নাম আমি ভুলে গেছি। কোনো পাঠক মূল নামটি জানালে পরবর্তী সংস্করণে ঠিক করে দেব।) আরেকটি তথ্য যোগ করার লোভ সামলাতে পারছি না। স্বাধীনতা যুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা গ্রন্থে মোঃ আব্দুল হান্নান লিখছেন– যুদ্ধকালিন সময়ে মুজিবনগর সরকার মোঃ হেমায়েতউদ্দিনকে সুবেদার পদ প্রদান করেন। এবং তার ডাকনাম দেয়–হিমু।
আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের
তোমার নাম কী?
আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের।
নাম বলো।
আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের।
কেয়া নাম?
আবু তাহের।
Tell me your name.
Sir, my name is Abu Taher.
তোমার নাম কী?
আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের।
কেয়া নাম?
আবু তাহের।
Tell me your nare.
Sir, my name is Abu Taher.
মোহাম্মদ আবু তাহের সম্পূৰ্ণ নগ্ন অবস্থায় একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছে। তার মুখের উপর দুশ পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। চোখ বন্ধ করেও তীব্ৰ আলোর হাত থেকে সে বাঁচতে পারছে না। কঠিন এই আলো চোখের পাতা ভেদ করে মাথার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। মস্তিষ্কের গভীরে কোনো এক জায়গায় পিন ফুটানোর মতো যন্ত্রণা হচ্ছে। এই যন্ত্রণার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। আবু তাহের মাঝে মধ্যেই ভাবছে, শুধুমাএ বাতি জ্বলিয়ে একজন মানুষকে এত কষ্ট দেয়া যায়!
