ভালো কারা?
সবই ভালো। মিলিটারি মারা দিয়া কথা। কী কন কমান্ডার সাব?
হুঁ।
শান্তি মারলেও লাভ আছে, তয় শান্তি দেশের মানুষ–এইটা বিবেচনায় রাখতে হয়। আপনে কী কন?
নাইমুল নিজে একটা সিগারেট ধরাল। হিসাবের সিগারেট। দ্রুত শেষ করা ঠিক হবে না। রফিকের সিগারেট খাওয়া দেখে তার খেতে ইচ্ছা করছে।
আগের শান্তি চিয়ারম্যান ক্যামনে মারা পড়ছে সেই গল্প শুনবেন?
না।
আমগাছের সাথে নিয়া যখন বানছে, তখন পেসাব পায়খানা কইরা ছেড়াবেড়া। এমন কান্দন শুরু করল যে কইলজার মধ্যে ধরে। আমি মুক্তি হইলে দিতাম। ছাইড়। বলতাম, তোর শাস্তি নিজের গু নিজে চাটা দিয়া খাবি। জানে মারনের চেয়ে এই শাস্তি ভালো, কী কন কমান্ডার সাব? গু খাওয়া সহজ ব্যাপার না। নিজের গু হইলেও না।
নাইমুল জবাব দিল না। জবাব দেবার প্রয়োজনও নেই। রফিক এই ধরনের মানুষ যে জবাবের অপেক্ষা করে না। নতুন গল্প শুরু করে। রফিক তার সিগারেটে শেষ লম্বা টান দিয়ে বলল, নতুন চিয়ারম্যান সাবের দিনও শেষ। মুক্তি যখন আইসা ঢুকে, তখন তারা আর কিছু করতে পারুক না পারুক শান্তির লোকজন মারে।
আর কিছু করে না?
নাহ্।
মিলিটারি মারতে পারে না?
সত্য কথা বলতে কী পারে না। পাক মিলিটারি তো ঘুঘু পাখি না। গুলাইল
দিয়া মারবেন। পাক মিলিটারি কঠিন জিনিস। সাক্ষাৎ আজরাইল। এরার শইল্যে ভয় ডর বইল্যা কিছু নাই।
পাক মিলিটারি দেখেছ?
দেখব না। কী জন্যে? একবার মাথাত কইরা তারার গুলির বাক্স নিয়া গেছি। খেতে কাম করতেছিলাম, ডাক দিয়া আইন্যা আমারে আর পুব পাড়ার ফজলু ভাইয়ের মাথাত তুইল্যা দিল গুলির বাক্স। আরো বাপ রে–ওজন কী! দুই দিন ছিল ঘাড়ে ব্যথা। কমান্ডার সাব আরেকটা সিগারেট দেন।
আর তো সিগারেট দেয়া যাবে না।
তাইলে উঠি। আপনের সাথে গফ কইরা মজা পাইছি।
উঠতে পারবে না। যেখানে বসেছিলে সেখানে বসে থাকো। গল্প করতে চাও গল্প করো। উঠার চিন্তা বাদ দাও।
রফিক বিস্মিত হয়ে তাকাল। মুক্তিদের হাবভাব বোঝা মুশকিল। এতক্ষণ এই কমান্ডার নরম-সরম গলায় কথা বলেছে। এখন তার গলা কঠিন। চোখের দৃষ্টিও ভালো না।
আমার একটা কাজ ছিল কমান্ডার সাব।
কাজ থাকলেও বসে থাকো; তোমাকে আমি ছেড়ে দেব। আর তুমি সারা অঞ্চলের মানুষকে বলে বেড়াবে মুক্তি ঢুকেছে, তা হবে না। তাছাড়া তোমাকে আমার দরকায়।
কী জন্যে দরকার?
শান্তিবাহিনীর চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ি চিনায়ে দিবে। আমি বাড়ি চিনি না। আরো খোঁজ খবর দিবে। শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ কি মিলিটারি পাহারা দেয়?
আমি জানব ক্যামনে? আমি কি ব্রিজের উপরে দিয়া হাটি? রেলগাড়ি চলাচলের পুল। মাইনষের হাঁটার পুল না।
রাজাকাররা থাকে কোথায়?
থানা কম্পাউন্ডে থাকে।
তারা মোট কয়জন?
আমি কি গুইন্যা দেখছি? রাজাকারের হিসাব নেওনের ঠেকা আমার নাই।
রফিক উসখুসি করছে। নাইমুল কড়া গলায় বলল, নড়াচড়া করবে না।
নড়াচড়াও করতে পারব না–এইটা কেমন কথা?
নাইমুল গায়ের চাদরটা সামান্য উঠিয়ে কাঁধে ঝুলালো চাইনিজ স্টেইনগান দেখিয়ে দিল। রফিক নড়াচড়া বন্ধ করে স্থির হয়ে গেল। তার চোখ কোটির থেকে সামান্য বের হয়ে এলো। মিলিটারিদের যেমন বিশ্বাস নাই, মুক্তিরও বিশ্বাস নাই। হুট করে কী করে বসে না বসে তার নাই ঠিক।
নাইমুল বলল, রাজাকার কমান্ডারের নাম কী?
জয়নাল।
জয়নালের বাড়ি তো তুমি চেন। চেন না?
জি চিনি।
সে বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসে না? চব্বিশ ঘণ্টা সে নিশ্চয়ই থানা কম্পাউন্ডে থাকে না।
জয়নাল ভাইরে কি গুল্লি করবেন?
জানি না করব কি-না। করতেও পারি।
জয়নাল ভাই বৈকালে ছুলুর স্টলে চা খাইতে যায়। একলা যায় না। সাথে সব সময় এক দুইজন থাকে। যন্ত্রপাতি থাকে।
থাকুক।
গুল্লি কোন খানে করবেন? চায়ের স্টলে করবেন না দূরে নিয়া করবেন?
দেখি কী করা যায়। কমান্ডার সাব, আমার বিরাট পেসাব চাপছে। পেসাব করন দরকার। ক্ষেতের আইলে বইস্যা পেস্যাব কইরা আসি।
নাইমুল হাই তুলতে তুলতে বলল, পেসাব এই খানেই করো। নিচে নামার দরকার নাই।
আপনের সামনে পেসাব করব?
উল্টা দিকে ফির। উল্টা দিকে ফিরে পিসাব করো। জায়গা থেকে নড়বে না।
কমান্ডার সাব, আমি কিন্তু জয় বাংলার লোক।
এই জন্যেই তো তোমাকে পাশে বসিয়ে রেখেছি। আমার জয় বাংলার লোকই দরকার।
এই খানে কতক্ষণ বইস্যা থাকবেন?
নাইমুল আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, জানি না।
রফিক বলল, পুরাটা শেষ কইরেন না। আমি দুইটা টান দিব। ইন্ডিয়ান ছিদ্রগেটের মজাই আলাদা।
নাইমুল তাকে আস্ত একটা সিগারেট দিল।
রফিক বলল, ফাইটিং কি আইজ রাইতেই হইব?
হুঁ।
আফনের লোকজন কই?
আমার দলে লোক কম। আমরা মোটে দুইজন।
আরেকজন কে?
আরেকজন তুমি। তোমাকে গ্রেনেড মারা শিখায় দিব। পারবে না?
রফিকের ঠোঁট থেকে জ্বলন্ত সিগারেট পড়ে গেল। সে মনে মনে বলল, ভালো পাগলের হাতে পড়ছি।
গ্রেনেড নিশ্চয়ই চেন। সব অস্ত্রপাতির নাম তুমি জান, গ্রেনেডের নাম জানবে না তা হয় না। লোহার বল।
গ্রেনেড চিনি। গ্রেনেড আছে দুই পদের। ভালটার নাম এনেগ্রা গ্রেনেড। বন্দুকের নলে লাগাইয়া মারতে হয়।
তোমাকে ঐ গ্রেনেড দেব না। তোমাকে যে গ্রেনেড দেব সেখানে একটা পিন থাকে। দাঁত দিয়ে টান দিয়ে পিন খুলতে হয়। পিন খোলার পরে ছুঁড়ে মারতে হয়।
রফিক বিড়বিড় করে বলল, ভাইজান আমার দাঁতে অসুবিধা আছে। দাঁত পোকায় খাওয়া। এই দেখেন।
