নাইমুলের পরনে সেলাইবিহীন সবুজ রঙের লুঙ্গি। লুঙ্গির নিচে হাফপ্যান্ট আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে হাফপ্যান্ট ভালো পোশাক। তবে হাফপ্যান্ট পরে চলাচল সম্ভব না। লোকজন প্ৰথম দেখাতেই চিনে ফেলবে। সেলাইবিহীন লুঙ্গিটার প্রয়োজন এইখানেই। অপারেশনের সময় টান দিয়ে খুলে ফেলা যায়। তার গায়ে কালো রঙের হাফ হাতা গেঞ্জি। গেঞ্জির উপর ময়লা সুতি চাদর। কাধে ঝুলানো স্টেইনগান লুকিয়ে রাখার জন্য এই গরমে সুতি চাদর গায়ে রাখতে হচ্ছে। স্টেইনগান নাইমুলের পছন্দের অস্ত্র না। তার সীমা পঞ্চাশ গজ। শত্রুর পঞ্চাশ গজের ভেতরে যাওয়া গেরিলাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে উঠে না।
নাইমুল পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে বসেছে। তার পায়ের কাছে যে বসে আছে তার নাম রফিক। বসেছে ব্যাঙের মতো। দেখলেই মনে হয় লাফ দেবে। বয়স ত্ৰিশ-পয়ত্রিশ। ব্যাঙের মতোই বড় বড় চোখ; সামান্য উত্তেজিত হলেই চোখ কোটির থেকে বের হয়ে আসতে চায় এমন অবস্থা।
রফিক বিরাট গল্পবাজ। পরিচয়ের পর থেকেই সে বিরামহীন কথা বলে যাচ্ছে। নাইমুল কী বলছে না বলছে সে বিষযে তার আগ্রহ নেই। তার কথা বলাতেই আনন্দ।
স্যার, আপনে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার?
নাইমুল হাই তুলতে তুলতে বলল, হুঁ। গেরিলাদের প্রধান ট্রেনিং তাদের পরিচয় গোপন রাখা। নাইমুল সেদিক দিয়ে গেল না। প্রয়োজন মনে করল না।
শম্ভুগঞ্জের ব্রিজ উড়াইতে আসছেন? আপনের খবর আছে।
খবর আছে কী জন্যে?
আপনের আগে আরো তিন পার্টি আসছে। সব ঝাঁঝরা। মেশিনগানের গুল্লি ছুটাইয়া ঝাঁঝরা কইরা দিছে।
তুমি মেশিনগান চেন?
চিনব না কী জন্যে? মায়ের কোলের নয়া আবুও অখন মেশিনগান চিনে। মর্টার চিনে। পিকেওয়ান চিনে।
পিকে ওয়ানটা কী?
রফিক চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে। লোকটা বলছে সে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার অথচ পিকেওয়ান চেনে না! নাকি লোকটা তাকে খেলাচ্ছে? কেউ তাকে নিয়ে খেলালে রফিকের ভালো লাগে না।
স্যার, আপনের হাতিয়ার কই?
আছে, সবই আছে।
রাখছেন কই?
জেনে কী করবে? শান্তি কমিটির কাছে খবর দিবে?
এইটা কী কন?
এই অঞ্চলে শান্তি কমিটি নাই?
শান্তি কমিটি থাকব না–এইটা কেমন কথা! অবশ্যই আছে। আগের চেয়ারম্যান সাব মুক্তির হাতে মারা পড়ছে। নতুন আরেকজন হইছে চেয়ারম্যান। তারে মারবেন? বাড়ি চিনি। আপনেরে নিয়া ম্যাব?
নাইমুল বলল, চা খাওয়াতে পারবে?
রফিক বিস্মিত হয়ে বলল, এই মাঠের মধ্যে চা কই পামু? সেটাও একটা কথা। চেয়ারম্যান সাবের বাড়িতে চলেন, চা খাইয়া আসবেন। তার বাড়িতে চায়ের আয়োজন আছে। আপনে মুক্তির কমান্ডার শুনলে লুঙ্গির মধ্যে পিসাব কইরা দিবে। এমন ডরাইল্যা।
চেয়ারম্যান সাহেবের নাম কী?
হাশেম চেয়ারম্যান। বউ দুইটা। ভাটি অঞ্চল থাইক্যা এক বউ আনছে, খুবই সুন্দর। তয় চরিত্রে দোষ আছে। সবেই জানে।
নাইমুল আবার হাই তুলল। টেনশনের সময় তার ঘনঘন হাই ওঠে। এর কারণটা তার কাছে স্পষ্ট না। মানুষের হাই ওঠে অক্সিজেনের অভাব হলে। টেনশনের সময় কি তার শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়? ব্ৰেইন প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন নিয়ে নেয় বলেই কি এই ঘাটতি?
নাইমুলের টেনশনের প্রধান কারণ, তার দলের কারোরই কোনো খোঁজ নেই। গতকাল ভোরে PEK1 (Plastic Explosive) এসে পৌঁছানোর কথা। সঙ্গে থাকবে ফিউজ, কর্ডেক্স, ডিটেনেটর। প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিড খুব কম হলে পঁচিশ পাউন্ড লাগবে। পঁচিশ পাউন্ডের কমে ব্রিজের সম্প্যান ভাঙা যাবে না। এখন দুপুর। তারা আসবে নৌকায়। এই অঞ্চলে নৌকায় চলাচল এখনো নিরাপদ। মিলিটারি গানবোট বা লঞ্চ নিয়ে নদীতে নামে নি। তারা শুকনা অঞ্চলেই ঘোরাফেরা করছে। তার প্রধান কারণ পানি হয় নি। ছোট ডিঙ্গি টাইপ নৌকা বা খুন্দাই (তালগাছের নৌকা) ভরসা! মিলিটারিরা এত ছোট জলযানে উঠবে না।
দলটিা কোনো বিপদে পড়ে নি তো? এখন সময় এমনই যে হুট করে বিপদ নেমে আসে। আগে থেকে কিছুই বোঝা যায় না।
রফিক ঝুকে এসে বলল, কমান্ডার সাহেবের নাম কী?
আমার নাম নাইমুল।
সকাল থাইক্যা এই জায়গায় বসা। এর কি কোনো ঘটনা আছে?
নাইমুল আবারো হাই তুলতে তুলতে বলল, কোনো ঘটনা নাই। ছায়ায় বসছি। ছায়া মূল ঘটনা না। নৌকা এখানেই আসবে। ছাতিম গাছ দেখে তালা নৌকা ভেড়াবে। তাছাড়া এখান থেকে ডিসট্রিক্ট বোর্ডের সড়কের অনেকখানি চোখে পড়ে। এই সড়কে মিলিটারির চলাচল কী রকম সেটা দেখাও উদেশ্য।
রফিক বলল, রইদ চড়া উঠছে। কমান্ডার সাব দেন একটা ছিরগেট, টান দিয়া দেখি কী অবস্থা। আপনের আগে যে কমান্ডার সাব আসছিল, আমারে আস্তা এক প্যাকেট ছিরাগেট দিয়েছিলেন। বিরাট কইলজার মানুষ ছিলেন।
নাইমুল সিগারেট দিল। রফিক আগ্রহের সঙ্গে সিগারেট টানছে। কায়দা করে নাকে-মুখে ধোঁয়া ছাড়ছে। নাইমুলের ধারণা ব্যাঙ-টাইপ এই লোক সিগারেটের আশায় বসে ছিল। আশা পূর্ণ হয়েছে, এখন সে হেলতে দুলতে চলে যাবে। লোকজন জোগাড় করে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারের গল্প করবে। যুদ্ধের কারণে বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। লেখক হলে বাকি জীবন সে এইসব চরিত্র নিয়ে লেখালেখি করে কাটিয়ে দিতে পারত।
কমান্ডার সাব, আপনে কোন বাহিনী? মুজিববাহিনী?
নাইমুল বলল, তুমি মুজিববাহিনীও চেন?
চিনব না কেন? একেক বাহিনীর একেক কায়দা। মুজিববাহিনীর ট্রেনিং ভালো। অস্ত্ৰ-শস্ত্ৰ ভালো। অন্য বাহিনীর সাথে তারার বনে না।
