সে দাঁত বের করে দেখাল। নাইমুল সহজ গলায় বলল, এই দাঁতেও চলবে।
বিকাল পর্যন্ত নাইমুলের দলের লোকজন কেউ এসে পৌঁছল না। এদের কি সমস্যা সেটাও জানার উপায় নেই। সে কি তাদের জন্যে অপেক্ষা করবে না। ফিরে যাবে তাও বুঝতে পারছে না।
দলের লোকজন কি ধরা পড়ে গেছে? ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম, তবে একেবারেই যে নেই তা না। গত মাসে শেরপুরের জহুকান্দিতে কাদের মিয়ার পুরো দল ধরা পড়েছিল। তারা ভুল যা করেছে তা হলো আয়োজন করে খাওয়াদাওয়া করতে গেছে। যে বাড়িতে তারা উঠেছিল, সেই বাড়ির কর্তা মুক্তিবাহিনী দেখে আবেগে উচ্ছসিত হয়ে ছিলেন। সন্ধ্যাবেলায় খাসি জবাই করা হয়েছে তাদের খাওয়ানোর জন্যে। পোলাও রান্না হয়েছে। খাসির মাংস রান্না হতে সময় লাগছিল। এই সময়ই কাল হলো। মিলিটারি বাড়ি ঘিরে ফেলল। ট্রেনিং ক্যাম্পে গেরিলা যুদ্ধেয় নিয়ম কানুন ব্যাখ্যা করতে করতে এক পর্যায়ে বলা হতো–আর যাই হও খাসি কাদের হয়ো না।
কাদের দুর্দান্ত সাহসী যোদ্ধা ছিল। সামান্য ভুলের জন্যে তার নাম হয়ে গেল খাসি কাদের। তার বীরত্বের কথা সবাই ভুলে গেল। শুদ্ধ কাজের জন্যে মানুষ মানুষকে মনে রাখে না। মানুষ মনে রাখে তাদের অশুদ্ধ কাজের জন্যে। কাদেরের নাম হওয়া ছিল বীর কাদের অথচ তার নাম হয়ে গেল খাসি কাদের।
কমাণ্ডার সাব?
হুঁ।
আমার কপালে একটু হাত দিয়া দেখেন।
কেন?
জ্বর আসছে। আমার কেঁথার তলে যাওন দরকার। আমার শইলের অবস্থাটা একটু বিবেচনা করেন।
নাইমুল আবারো বলল, হঁ।
রফিক বলল, উঠি কমান্ডার সাব?
নাইমুল বলল, উঠার চিন্তা বাদ দাও। তোমাকে পাঠাব ব্রিজের কাছে রাজাকারদের যে আউট পোস্ট আছে সেখানে।
লাখ টকা দিলেও আমি এর মধ্যে নাই। ভুইল্যা যান।
ভুলে যাব কেন?
ব্রিজ পাহারা দেয় কালা মিলিটারি। এরা সাক্ষাৎ যম।
কালো পোশাক পরা মিলিশিয়া?
মিলিশিয়া কি-না জানি না, এরা যে আসল যম এইটা জানি। এরার ছায়া দেখলেও মৃত্যু।
নাইমুল দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, উঠ।
কই যাব?
কালা মিলিটারির ছায়া দেখে আসি।
আসমানের দিকে চাইয়া দেখছেন আসমানের অবস্থা। দেওয়া নামতাছে।
নাইমুল আকাশের দিকে তাকাল। ঘন হয়ে মেঘ করছে। আকাশের ঘন কালো মেঘ সৌভাগ্যের লক্ষণ। মেঘ-বৃষ্টিতে মিলিটারিরা অভ্যস্ত না। তারা তখন কোঠারে ঢুকে থাকে। তাদের কাছে বজের গর্জনকে কামানের শব্দ বলে মনে হয়। মেঘ ডাকলেই তাদের কলিজা কঁপে। এমন ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে দলের লোকজন থাকলে ভালো হতো। ব্রিজের ব্যবস্থা করে ফেলা যেত। দলে নাসিম আছে। প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিডের বিষয়ে অতি এক্সপার্ট। ছোটখাটো মানুষ, মনে হয়। হাঁটতে জানে না–লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। তাকে আদর করে ডাকা হয় মিস্টার প্ৰিং।। দলে আছে সুন্নত মিয়া। তাকে সুন্নত মিয়া ডাকলে সে রাগ করে। তাকে ডাকতে হয় গৌরনদীর সুন্নত। এই বিশেষ নামে তাকে কেন ডাকতে হয়— নাইমুল এখনো জানে না। অসীম সাহসী যুবক। প্রতিটি অপারেশনের পর সে গভীর ক্ষোভের সঙ্গে বলে, শহিদ হওয়ার শখ ছিল, হইতে পারলাম না। আফসোস। দেখি পরেরবার পারি কি-না। গ্রেনেডের থলি নিয়ে সে মাটিতে শুয়ে সাপের মতো ভঙ্গিতে আগায়। ক্রলিং-এর সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। শত্রুর খুব কাছাকাছি গিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে গ্রেনেড চার্জ করে। বিড়বিড় করে বলে, যারে পক্ষী যা। জায়গা মতো যা। তার পক্ষী বেশির ভাগ সময়ই জায়গা মতো যায়। সুন্নতের হাতের জোর অসম্ভব। গ্রেনেড থ্রোয়ারে গ্রেনেড পঞ্চাশ গজ পর্যন্ত যায়। সে হাতে ছুঁড়েই চল্লিশ গজ পর্যন্ত পাঠাতে পারে।
সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খোলা নৌকায় নাইমুলের দল চলে এলো। আনন্দে দাঁত বের করে রফিক হেসে ফেলে বলল, এই তো আপনে আপনের লোক পাইছেন। আমারে বিদায় দেন। ছিরগেটে টান। দিতে দিতে বাড়িত গিয়া ঘুমাই। নাইমুল বলল, যেখানে আছ সেখানে থাক। নড়বে না। অনেক কথা বলেছি। আর কোনো কথাও না।
দলটা ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত ও অবসন্ন; নাইমুল বলল, অপারেশনের শেষে আমরা খুব আরাম করে খাওয়া-দাওয়া করব। অপারেশনের আগে কোনো খাওয়া নাই। আমি সব রেকি করে রেখেছি। একটা গাইডও আমার সঙ্গে আছে। রফিক নাম।
রফিক সঙ্গে সঙ্গে বলল, এইটা ভুইল্যা যান কমান্ডার সাব। আমি আপনারার সাথে নাই। নতুন বিবাহ করে করেছি। ঘরে আমার কাঁচা বউ।
নাইমুল বলল, কাঁচা বউ পাকা বউ যাই থাকুক, তুমি আছা সঙ্গে। এখন তোমরা সবাই আমার প্ল্যান অব অ্যাকশান শোন। আমি পুরো ব্যাপারটা অন্যরকমভাবে সাজিয়েছি। মন দিয়ে শুনতে হবে। পরিকল্পনার পরিবর্তন হবে। না। আমি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কিছু ঠিক করি না। এইসব সিদ্ধান্ত তর্কবিতর্কে ঠিক করা যায় না। ব্রিজ পাহারা দেয় ছয় থেকে সাতজন রাজাকারের একটা দল। মাঝে মধ্যে তাদের সঙ্গে দুজন মিলিশিয়া থাকে। আজ তারা নেই।
প্ৰথমে আমরা তাদের কাছে খবর পাঠাব—আজ ভোররাতে ব্রিজ উড়ানো হবে। খবরটা বিশ্বাসযোগ্য হবে কারণ খবরটা সত্যি। ব্রিজ আমরা আজ রাতেই উড়াব। খবর শোনার পর এরা যা করবে তা হচ্ছে হয় সবাই মিলে থানায় মিলিটারির কাছে খবর দিতে যাবে। অথবা একদল যাবে আরেকদল ব্রিজ পাহারা দেয়ার নামে থাকবে। যারা থাকবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের পালিয়ে যাবার কথা। যদি পালিয়ে না যায় ভায়ের চোটে ফাঁকা গুলি করতে থাকবে।
