আসমানী শান্ত গলায় বলল, ও সন্দেশ খেতে চায়। আপনি কি রুনিকে একটা সন্দেশ কিনে খাওয়াতে পারবেন?
নাইমুল বলল, পারব, তবে এখন না ভাবি। আমি সন্ধ্যাবেলায় সন্দেশ নিয়ে আসব।
আসমানী তাকিয়ে আছে। মানুষটা লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে যাচ্ছে। তার চলে যাবার ভঙ্গি বলে দিচ্ছে সে ফিরবে না। এখন দুঃসময়। দুঃসময়ে কেউ কথা
রুনি কান্দছে না। সন্দেশের জন্যেও হৈচৈ করছে না।
সন্ধ্যাবেলা নাইমুলের আসার কথা, সে এলো না। আসমানীর মনে হলো কোনো কারণে হয়তো আটকা পড়ে গেছে, রাতে আসবে। রাতেও এলো না। রুনি বলল, মা, আমি কি ঘুমিয়ে পড়ব? উনি মনে হয় আসবেন না।
আসমানী বলল, ঘুমাও। আমরা যখন দেশে ফিরে যাব, যখন তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হবে, তখন যত ইচ্ছা সন্দেশ খাবে।
দেশে কবে যাব। মা?
জানি না কবে যাবে।
আসমানীর চোখ ভিজে উঠতে শুরু করছে। সে মেয়ের দিকে তাকাতে পারছে না। রুনির গালে হাতের দাগ বসে গেছে। গাল কালো হয়ে ফুলে উঠেছে। রুনি বলল, মা শোন, আমার এখন আর সন্দেশ খেতে ইচ্ছে করছে না।
তোমার যা খেতে ইচ্ছা করবে, তোমার বাবা তাই কিনে দেবে।
মার কান্না দেখেই হয়তো রুনির কান্না পেয়ে গেছে। মার শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে সে ফোঁপাতে ফেঁচাপাতে বলল, বাবার কি আমাদের কথা মনে আছে মা?
রাতে রুনির জ্বর এসে গেল। ভালো জ্বর। আসমানী সারারাত মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে বসে রইল।
নাইমুল এসে উপস্থিত হলো ভোরবেলা। লজ্জিত গলায় বলল, ভাবি, জোগাড়যন্ত্র করতে দেরি হয়ে গেল। আপনার মেয়ের জন্যে সন্দেশ আনার কথা। সেটাও ভুলে গেছি। খালিহাতে এসেছি। এখন চলুন। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিন।
আসমানী অবাক হয়ে বলল, কোথায় যাব?
বারাসাত। আমার ফুপার বাড়ি। উনি এখানে সেটল করেছেন। আমি কাল উনার সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করে এসেছি। কোনো সমস্যা হবে না। আমি ক্যাম্পে আপনাদের এইভাবে ফেলে রেখে যাব না।
আসমানী বলল, ভাই, আপনি কী বলছেন।
নাইমুল বলল, কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না তো ভাবি; আমি জিপ নিয়ে এসেছি। ক্যাম্পের লোকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমার ফুপা-ফুফু দুজনই অতি ভালো মানুষ। তাঁরা আপনাকে নিজের মেয়ের মতো যত্নে রাখবেন। আপনার শরীরের যে অবস্থা, আপনার যত্ন দরকার।
সত্যি যেতে বলছেন?
অবশ্যই। ভাবি শুনুন, আপনি আপনার মনে সামান্যতম দ্বিধা বা সংকোচ রাখবেন না। আপনার মনের সংকোচ দূর করার জন্যে ছোট্ট গল্প বলি– মন দিয়ে শুনুন। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করার সময় খুবই খারাপ অবস্থায় দিন কাটাতাম। বইপত্র কেনা দূরের কথা, ভাত খাওয়ার পয়সাও ছিল না। আমার এই অবস্থা দেখে শাহেদের বড়ভাই, মাওলানা ভাই, প্রতিমাসে মানি অর্ডারে আমাকে টাকা পাঠাতেন। আমাকে প্ৰতিজ্ঞা করিয়ে ছিলেন এই ঘটনা যেন শাহেদ না জানে। আমি শাহেদকে জানাই নি। আজ। আপনাকে বললাম! আর আমি এতই অমানুষ যে মাওলানা ভাইকে আমার বিয়ের খবরও জানাই নি। ভাবি, উনি কেমন আছেন জানেন?
ভাই, আমি জানি না। আমি কারোরই কোনো খবর জানি না।
লক্কর ধরনের জিপ রাস্তায় ধূলা উড়িয়ে ছুটে চলেছে। নাইমুল বসেছে ড্রাইভারের পাশে। রুনি বসেছে নাইমুলের কোলে। গাড়িতে উঠার পরই তার জ্বর সেরে গেছে। সে ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছে। নাইমুল খুবই মজা পাচ্ছে। রুনি একটা গল্প শেষ করে আর নাইমুল হাসতে হাসতে বলে, এই মেয়ে তো কথার রানী। শাহেদ তো কথাই বলতে পারে না, এই মেয়ে এত কথা শিখল কার কাছে?
পথে এক দোকানের পাশে নাইমুল গাড়ি থামাল। রুনিকে বলল, এসো এখন সন্দেশ খাবার বিরতি। দেখি কয়টা সন্দেশ তুমি খেতে পারো। তোমার সঙ্গে আমার কম্পিটিশন। দেখি কে বেশি খেতে পারে!
তারা বারাসাতে এসে পৌঁছল। সন্ধ্যায়। ছবির মতো সুন্দর গাছ দিয়ে ঢাকা একতলা পাকা দালান। গেটের কাছে জিপ এসে থামতেই এক বৃদ্ধা ছুটে এসে আসমানীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, এসো গো মা, এসো। সেই দুপুর থেকে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। আহা মার মুখ শুকিয়ে গেছে! খুব কষ্ট হয়েছে তাই না মা?
খড়ম পায়ে খালি গায় এক বৃদ্ধও বের হয়ে এলেন। তিনিও অতি মিষ্টি গলায় বললেন, দেখি আমাদের বাঙ্গাল মেয়ের চেহারা। ও আল্লা, এই মেয়ের গায়ের রঙ তো ময়লা। আমাদের হলো ফর্সা ঘর। ফর্সা ঘরে কালো মেয়ের স্থান নাই। এই মেয়ে আমরা রাখব না। বলেই শব্দ করে হাসতে লাগলেন।
অনেক অনেক দিন পর আসমানীর মনে হলো, সে নিজের বাড়িতেই ফিরেছে। এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধ তাঁর অতি আপনজন।
যুদ্ধ খুব অদ্ভুত জিনিস। যুদ্ধ যেমন মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়, আবার খুব কাছাকাছিও নিয়ে আসে।
রফিকের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাতেও নেই
নাইমুল বসে আছে টিবির মতো উঁচু একটা জায়গায়। উঁচু থেকে সমতল ভূমির অনেকখানি দেখা যায়। চারদিকে বা বা করছে রোদ। সে বসেছে ছায়ায়। তার মাথার উপর ছাতিম গাছের বড় বড় পাতা ছায়া ফেলে আছে। এই অঞ্চলে ছাতিম গাছের ছড়াছডি। কেউ নিশ্চয়ই হিসাব-নিকাশ করে ছাতিম গাছ লাগায় নি। আপনা-আপনি হয়েছে। গত সপ্তাহে সে যেখানে ছিল, সেখানে আবার শিমুল গাছের মেলা। একটু পরপর শিমুল গাছ। বসার জন্যে শিমুল গাছ ভালো না, গাছ ভর্তি কাটা। গাছে হেলান দিয়ে বসা যায় না। ছাতিম গাছে হেলান দেয়া যায়। তবে ছাতিম গাছ শব্দহীন বৃক্ষ। বড় বড় পাতা বলেই বাতাসে পাতা কাপার শব্দ হয় না।
