নানা হাতবদল হয়ে একসময় রুনির জায়গা হবে খারাপ পাড়ায়। রুনি ভুলেই যাবে এক সময় তার অতি সুখের সংসার ছিল।
কী দ্রুতই না মেয়েটা বদলাচ্ছে! একদিন আসমানী শুনল রুনি কাকে যেন কুৎসিত সব গালি দিচ্ছে–তোর হোগায় লাখি। আসমানী ছুটে বের হয়ে মেয়ের হাত ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, এইসব কী বলছি মা? রুনি ঘাড় শক্ত করে বলল, ও তো আমাকে আগে বলেছে।
ও বললেই তুমি বলবে?
হ্যাঁ, বলব।
তুমি জানো না। এইসব খুব খারাপ গালি?
আমি এরচেয়েও খারাপ গালি জানি।
আসমানী কী করবে, মেয়েকে কীভাবে সামলে রাখবে ভেবে পায় না। কী ভয়ঙ্কর পরিবেশ চারপাশে! শরণার্থী শিবিরে চুরি হচ্ছে, এক শরণার্থী অন্যজনের কাপড় চুরি করছে। ধরা পড়ছে। মারামারি হচ্ছে। ওয়ার্ডেনরা ছুটে আসছে। তাদের মুখেও গালি–তোমরা জান বাঁচাইতে আসছি না চুরি করতে আসছ? কাজ তো জানো মোটে তিনটা–হাগা, মুতা আর চুরি।
মাঝে-মাঝে বাংলাদেশ সরকারের লোকজন আসেন। তারা মুখের ভাব এমন করে রাখেন যে শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশায় তাদের হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। কী সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা–আমরা বাঙালি। আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। কিন্তু মাথা নোয়াবো না। আপনারা ধৈর্য ধরুন। আমাদের বীর মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করে যাচ্ছে। বিজয় এলো বলে।
তারা নানান ধরনের পরিকল্পনা নিয়েও আসেন। শরণার্থী শিশুদের জন্যে স্কুল হবে। পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়। শরণার্থীদের দিয়ে নাটক করানো হবে। নাটকের বিষয়বস্তু দেশপ্রেম। বাইরের পৃথিবী যেন দেখে এর মধ্যেও আমরা জীবনের আলোয় উদ্ভাসিত।
প্রায়ই বিদেশীরা আসে ছবি তুলতে। কেউ আসে মুভি ক্যামেরা নিয়ে। তাদের সঙ্গে বিরাট লটবহর। সেই সময় যদি শরণার্থীদের কেউ মারা যায়, তবেই তাদের আনন্দ। কত কায়দা করেই না ডেডবডির ছবি তোলা হয়! যারা শোকে অস্থির হয়ে কাঁদছে, তাদের ছবি তোলা হয়।
বিদেশীরা প্রায়ই এটা-সেটা উপহার হিসেবে নিয়ে আসে। গায়ে মাখা সাবান, বাচ্চাদের জন্য লজেন্স, চকলেট। তখন ভয়ঙ্কর অবস্থা হয়! সবাই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই ঝাপিয়ে পড়ার দলে রুনিও আছে। ব্যাপাঝাপি করে একবার সে গায়ে মাখা একটা সাবান এনে মাকে দিল। সেদিন তাকে দেখে মনে হয়েছিল, সে বিরাট এক যুদ্ধ জয় করে ফিরেছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বড় বড় কর্মকর্তারাও আসেন। একদিন এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল। তিনি খুবই সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে হাতজোড় করে বলেছিলেন–আমরা আপনাদের শুধু আশ্রয় দিতে পেরেছি। আর কিছু দিতে পারছি না। সাধ আছে, সাধ্য নেই। আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
কিছুদিন পর পরই খবর আসে–ইন্দিরা গান্ধীর আসার সম্ভাবনা আছে। তখন সাজ সাজ পড়ে যায়। ব্যাটন হাতে ওয়ার্ডেনরা তাঁবুতে ঢুকে অকারণেই চিৎকার চেচামেচি করে–বিছানা পরিষ্কার, বিছানা পরিষ্কার। খবরদার কেউ ঘরে হাগা-মুতা করবেন না।
রেডক্রস সাইন লাগানো একটা ডিসপেনসারি প্রতিদিনই খোলা থাকে। সেখানে দুজন ডাক্তার বসেন। তারা যত্ন নিয়েই রোগী দেখেন। ব্যবস্থাপত্ৰ লিখে দেন। কিন্তু ওষুধ দিতে পারেন না। ডিসপেনসারিতে ওষুধ নেই। মাঝেমাঝে দান হিসেবে ওষুধ পাওয়া যায়! সেই ওষুধ নিমিষেই শেষ হয়ে যায়।
গৰ্ভবতী মাদের একটা তালিকা রেডক্রস করেছে। সেখানে আসমানীর নাম আছে। তালিকায় নাম উঠার কারণে আসমানী সপ্তাহে এক টিন প্রোটিন বিসকিট পায়। সেই বিস্বাদ বিসকিট রুনি একা কুটকুট করে খায়। মাকে টিন ধরতে দেয় না। মেয়েটার জন্যে আসমানীর এত মায়া লাগে! তার বাড়ন্ত শরীর। এই শরীর খাদ্য চায়। সেই বাড়তি খাবার জোগাড়ের সামর্থ্য আসমানীর নেই।
সকাল থেকে মেয়েটা সন্দেশ সন্দেশ করছে। কোথেকে আসমানী সন্দেশ দেবে! গতকালই তার হাত পুরোপুরি খালি হয়ে গেছে। এখন হাতে একটা টাকাও নেই। মেয়েটার জন্যে আসমানীর এতই খারাপ লাগছে যে হাতে একটা টাকা পাকলেও সে সন্দেশ কিনে দিত।
মা, সন্দেশ কিনে দেবে না?
আসমানী বললেন, দেব।
কখন দেবে? এখন দিতে হবে। এই এখন।
কান্দবে না। রুনি।
রুনি কঠিন মুখ করে বলল, আমি কাঁদব। আমি চিৎকার করব। আমি তোমাকে খামচি দেব।
এসো বাইরে যাই। চিৎকার চোঁচামেচি খামচা-খামচি ক্যাম্পের বাইরে করে। ভেতরে না।
না, আমি এইখানে চিৎকার করব। আমি বাইরে যাব না।
আসমানী মেয়েকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে টিনশেডের বাইরে এনে প্রচণ্ড শব্দে মেয়ের গালে চড় বসাল। রুনি হতভম্ব হয়ে মার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এর আগে কখনো মায়ের কাছ থেকে এমন ব্যবহার পায় নি।
রুনি বলল, মা, তুমি আমাকে মারছ?
আসমানী বলল, আজ মেরে আমি তোমার হাডিড গুড়া করে দেব! বলতে বলতেই আসমানী মেয়ের গালে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে আবার চড় বসাল।
ভাবি, স্নামালিকুম।
আসমানী ঘুরে তাকাল। মুখভর্তি দাড়িগোঁফের জঙ্গল নিয়ে অচেনা একজন দাঁড়িয়ে আছে। রোদে ঝলসে যাওয়া তামাটে চেহারা। মাথাভর্তি উড়ুকু চুল।
ভাবি, আপনি আমাকে চিনতে পারছেন? চেনার অবশ্যি কথা না। আমি নিজেই এখন নিজেকে চিনি না। ভাবি, শাহেদ কি ক্যাম্পে আছে?
না, ও ক্যাম্পে নেই। ক্যাম্পে আমি মেয়েকে নিয়ে আছি।
শাহেদ কোথায়?
ও কোথায় আমি জানি না। বেঁচে আছে কি-না তাও জানি না। আপনার নাম কি নাইমুল?
ভাবি, আপনি দশে এগারো পেয়েছেন। আমি নাইমুল।
আপনি কি মুক্তিযোদ্ধা?
জি ভাবি। মেয়ের নাম রুনি না? রুনি মার খাচ্ছে কেন?
