ইরতাজউদ্দিন বললেন, আল্লাহপাক যদি এই লজ্জা আমার কপালে লিখে থাকেন তাহলে এই লজ্জা আমাকে পেতে হবে। পবিত্র কোরান শরীফের সূরা বনি ইস্রায়িলে আল্লাহপাক বলেছেন–আমি সবার ভাগ্য সবার গলায় হারের মতো ঝুলাইয়া দিয়াছি। আমার ভাগ্য আমার কপালে লেখা, একইভাবে আপনার ভাগ্যও আপনার কপালে লেখা।
আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছি?
জনাব, ভয় দেখানোর মালিক আল্লাহপাক। আমি না।
ক্যাপ্টেন বাসেত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। টেবিলে টোকা দিতেই সেপাই এবং সুবাদার মেজর ঘরে ঢুকল। ক্যাপ্টেন বাসেত বললেন, ওসিকে বলো এই গাদারকে নেংটা করে সারা গ্রামে ঘুরাতে। তোমরাও সঙ্গে থাকবে।
নীলগঞ্জের অতি শ্ৰদ্ধেয় অতি সম্মানিত মানুষ মাওলানা ইরতাজউদ্দিনকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় প্ৰদক্ষিণ করা হলো। তাঁকে প্রথম নিয়ে যাওয়া হলো নীলগঞ্জ স্কুলে। সেখান থেকে নীলগঞ্জ বাজারে। বাজারে ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটল। দরজির দোকানের এক দরজি একটা চাদর নিয়ে ছুটে এসে ইরতাজউদ্দিনকে ঢেকে দিয়ে জড়িয়ে ধরে থাকল। ঘটনা এতই দ্রুত ঘটল যে সঙ্গের মিলিটারিরা বাধা দেবার সময় পেল না।
ইরতাজউদ্দিন এবং দরজিকে মাগরেবের নামাজের পর সোহাগী নদীর পাড়ে নিয়ে গুলি করা হলো। মৃত্যুর আগে আগে ইরতাজউদ্দিন পরম নির্ভরতার সঙ্গে আল্লাহপাকের কাছে উঁচু গলায় শেষ প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহপাক, যে মানুষটা জীবনের মায়া তুচ্ছ করে আমাকে লজ্জার হাত থেকে বাচাতে চেয়েছিল তুমি তার প্রতি দয়া করো। তুমি তার প্রতি তোমার রহমতের দরজা খুলে দাও।*
————–
*নেত্রকনা অঞ্চলের এই সত্য ঘটনাটির স্বাক্ষী যে দরজি সে গুলি খাওয়ার পরেও প্ৰাণে বেঁচে যায়। আমি তার কাছ থেকেই গল্পটি শুনি।–লেখক।
বেলুচ রেজিমেন্টের সেপাই আসলাম খাঁ
নীলগঞ্জ হাই স্কুলে হেডমাস্টার মনসুর সাহেব মাথা নিচু করে তাঁর শোবার ঘরের খাটে বসে আছেন। তার সামনেই ঘোমটা দিয়ে বসে আছেন তার স্ত্রী আসিয়া। বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে আসিয়া এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তাঁর মাথায় কোনো সমস্যা নেই।
মধ্যদুপুর। প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে কাল রাত থেকে। এত প্রবল বর্ষণ নীলগঞ্জে এর আগে কখনো হয়েছে বলে মনসুর সাহেব মনে করতে পারছেন না। তিনি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আসিয়া, তুমি যদি অনুমতি দাও। তাহলে আমি একটা কাজ করতে চাই।
আসিয়া ক্ষীণ গলায় বললেন, কী কাজ?
মনসুর সাহেব বললেন, ঘোমটা সরাও। কথাগুলি আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে চাই।
আসিয়া ঘোমটা সরালেন। মনসুর সাহেব বললেন, আমার অতি প্ৰিয়জন ইরতাজউদ্দিন কাসেমপুরী সবসময় বলতেন, যে স্বামী স্ত্রীর মনে কষ্ট দিয়ে কোনো কাজ করবে। আল্লাহপাক তাকে কখনো ক্ষমা করবেন না। যে কাজটা আমি করতে যাচ্ছি, তার জন্যে তোমার অনুমতি চাই।
আসিয়া আবারো বললেন, কী কাজ?
মনসুর সাহেব বললেন, ইরতাজউদ্দিন কাসেমপুরীকে মিলিটারিরা গতকাল সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে গুলি করে মেরেছে। তারা এ অঞ্চলে কারফিউ দিয়ে রেখেছে। মৃতদেহ পড়ে আছে নদীর পাড়ে। ভয়ে কেউ সেখানে যাচ্ছে না। আমি উনার ডেডবডি নিয়ে আসতে চাই। নিয়মমতো কবর দিতে চাই।
আসিয়া বললেন, আপনি একা এই কাজ পারবেন?
কেন পারব না? পারতে হবে।
আপনি যদি বলেন, তাহলে আমি যাব আপনার সঙ্গে।
মনসুর সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি যেতে চাও?
জি যেতে চাই। মিলিটারি। যদি আপনাকে গুলি করে মারে, তাহলে আপনার সঙ্গে আমিও মরতে চাই। আমি একা বেঁচে থেকে কী করব?
নীলগঞ্জের মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে দেখল, হেডমাস্টার সাহেবের সঙ্গে ঘোমটা পর একজন মহিলা প্ৰবল বর্ষণের মধ্যে মাওলানা ইরতাজউদিনের বিশাল শরীর টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তাদের খুবই কষ্ট হচ্ছে। অনেকেই দৃশ্যটা দেখছে, কেউ এগিয়ে আসছে না।
হঠাৎ একজনকে ভিজতে ভিজতে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। সে আসিয়া বেগমের কাছে এসে উর্দুতে বলল, মাতাজি আপনি সরুন, আমি ধরছি।
মনসুর সাহেব বললেন, আপনার নাম?
আগন্তুক বলল, আমি বেলুচ রেজিমেন্টের একজন সেপাই। আমার নাম আসলাম খাঁ।*
————-
*ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরীর নামাযে জানাজা হয় দেশ স্বাধীন হবার পর। ঐদিন তার কবর হলেও জানাজা হয় নি। জানাজার জন্যে মাওলানা খুঁজে পাওয়া যায় নি।
আসমানী হতাশ চোখে
আসমানী হতাশ চোখে রুনির দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা এত অবুঝ কী করে হয়ে গেল! সকাল থেকে ঘ্যানঘান করছে, এখন দুপুর। সে সন্দেশ খাবে। সন্দেশের ব্যাপারটা মেয়ের মাথায় কী করে এসেছে আসমানী জানে না। শরণার্থী শিবিরে সে কি কাউকে দেখেছে সন্দেশ খেতে? দেখতেও পারে। এই মেয়ে এখন নিজের মনে ঘুরঘুর করতে শিখেছে। কাউকে কিছু না বলে এখানেওখানে যাচ্ছে। এই পাশে আছে, এই নেই। একদিন তো সারা দুপুর তার খোঁজ নেই। চিন্তায় অস্থির হয়ে আসমানী যখন ঠিক করল, ক্যাম্প ওয়ার্ডেনকে জানাবে–তখন মেয়েকে দেখা গেল হেলতে দুলতে আসছে। হাতে একটা বনরুটি। কে দিয়েছে বনরুটি? মেয়ে বলবে না। আসমানীর ধারণা, সে কারো কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এসেছে। মেয়েটার ভিখিরি স্বভাব হয়ে গেছে। যেখানেসেখানে হাত পাতিছে।
রুনিকে অবশ্যি দোষ দেয়া যায় না। তারা তো এখন ভিখিরি। নিজ দেশ ছেড়ে অন্য এক দেশে ভিখিরি সেজে বাস করছে। থালা হাতে খাবারের জন্যে দুবেলা লাইন ধরতে হচ্ছে। কী লজ্জা কী লজ্জা! এই লজ্জা এই অপমানের শেষ কি হবে? না-কি বাকি জীবন কেটে যাবে শরণার্থী শিবিরে? এইসব নিয়ে চিন্তা করতে এখন আর আসমানীর ভালো লাগে না। তাঁর এখন একটাই চিন্তারুনিকে আগলে রাখা। যেন হারিয়ে না যায়। হারিয়ে গেলে এই মেয়েকে তার পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।
