ক্ষমা চাইবার সময় তার চোখে পানি চলে এলো। তিনি অনেকক্ষণ কাদলেন। নামাজের সময় তার চোখে পানি আসে না। অনেকদিন পর চোখে পানি এলো। তিনি মোনাজাত শেষ করে জায়নামাজে বসে রইলেন। গায়ের পোশাক বদলালেন না। কারণ তিনি জানেন ক্যাপ্টেন সাহেব তাকে ডেকে পাঠাবেন। জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তিনি ক্যাপ্টেন সাহেবকে যা যা বলবেন তা মোটামুটি ঠিক করা আছে। এইসব কথা ক্যাপ্টেন সাহেবের পছন্দ হবে না। যদি পছন্দ না হয় তাহলে নদীর পাড়ে তাকেও যেতে হতে পারে।
মৃত্যু নিয়ে তিনি ভীত না। কে কখন কীভাবে মারা যাবে তা আল্লাহপাক নির্ধারিত করে রেখেছেন। লাওহে মাহফুজে এইসব দলিল রাখা আছে। যে মৃত্যু আল্লাহপাক কর্তৃক নির্ধারিত— সেই মৃত্যুকে ভয় পাবার কিছুই নেই।
ওসি সাহেবের স্ত্রী কমলা এসে কয়েকবার ঘুরে গেছে। ইরতাজউদ্দিন জয়নামাজে চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন বলে কিছু বলতে সাহস পায় নি। এইবার সে সাহস করে বলল, চাচাজি, কী হয়েছে?
তিনি বললেন, মনটা সামান্য অস্থির হয়ে আছে। আর কিছু না।
ভাত খাবেন না চাচাজি?
না, এখন খাব না। মা, আমি এখন কী বলব। মন দিয়ে শোন। যদি আমার ভালোমন্দ কিছু হয় তুমি হেডমাস্টার সাহেবের কাছে চলে যাবে। উনি অতি শুদ্ধ মানুষ। উনি যা করার অবশ্যই করবেন। কমলা ভীত গলায় বলল, এইসব কথা কেন বলতেছেন?
ইরতাজউদ্দিন বললেন, আমার মন অস্থির হয়ে আছে বলেই বলতেছি। অস্থির মানুষ অনেক কথা বলে।
চাচাজি, এক কাপ চা কি বানায়ে দেব?
না গো মা, কিছুই খাব না। তবে এক গ্রাস পানি খাব। এই পৃথিবীর যাবতীয় খাদ্যের মধ্যে পানি হলো শ্ৰেষ্ঠ খাদ্য এবং আল্লাহপাকের দেয়া অতি পবিত্র নেয়ামত। যতবার পানির গ্লাসে চুমুক দিবে ততবারই মনে মনে আল্লাহপাকের শুকুর গুজার করবা, তোমার প্রতি এই আমার একমাত্র উপদেশ। আছরাওয়াক্তের আগে আগে ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেত ইরতাজউদ্দিনকে ডেকে পাঠালেন। তাকে থানা কম্পাউন্ডে নিয়ে যাবার জন্যে থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি দুজন কনষ্টেবল নিয়ে এসেছেন। ওসি সাহেব একবারও ইরতাজউদিনের দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে যে-কোনো কারণেই হোক এই মানুষটির দিকে চোখ তুলে তাকানোর মতো অবস্থা তার না।
ইরতাজউদ্দিন থানার দিকে রওনা হবার আগে অজু করলেন। কমলার ছেলেটিকে কোলে নিয়ে আদর করলেন। নবি-এ-করিম শিশুদের পছন্দ করতেন। তাদের বলতেন, বেহেশতের ফুল। শিশুদের প্রতি স্নেহ ও মমতা দেখানো সুন্নত। সেই মমতা ইরতাজউদ্দিন কেন জানি দেখাতে পারেন না। শাহেদের মেয়ে রুনি ছাড়া কোনো শিশুই তাকে আকর্ষণ করে না। এটা অবশ্যই তাঁর চরিত্রের বড় একটা দুর্বলতা। তবে কমলার এই ছেলেটার প্রতি তাঁর মায়া পড়ে, গেছে। এই ছেলেকে কোলে নিলেই সে খপ করে তার দাড়ি ধরে ফেলে। তার হাত ছুটানো তখন সমস্যা হয়ে যায়। হাত ছাড়িয়ে নিতে গেলে কাঁদতে শুরু করে।
ক্যাপ্টেন বাসেতের সামনে কফির কাপ। চিনি-দুধাবিহীন কালো কফি। তিনি একেকবার কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কড়া কফির তিক্ত স্বাদে মুখ বিকৃত করছেন। ইরতাজউদ্দিন তার সামনে চেয়ারে বসে আছেন। তাকেও কফি দেয়া হয়েছে। তিনি কফিতে চুমুক দেন নি।
ক্যাপ্টেন বাসেত সিগারেট ধরালেন। লম্বা করে ধোঁয়া ছেড়ে হাত ইশারা করলেন। ঘরে দুজন সিপাই এবং একজন হাবিলদার মেজর ছিল, তারা ঘর ছেড়ে বারান্দায় দাঁড়াল। তাদের দৃষ্টি ঘরের ভেতর। ক্যাপ্টেন বাসেত খানিকটা বুকে এসে বললেন, আমি খবর পেয়েছি আপনি জুম্মার নামাজ পড়াবেন না, কারণ আমি জুম্মার নামাজ পড়তে যাই। আমার মতো খারাপ মানুষকে পেছনে নিয়ে নামাজ হয় না–এই জাতীয় বক্তৃতাও না-কি দিয়েছেন।
ইরতাজউদ্দিন শান্ত গলায় ব্যাখ্যা করলেন কেন তিনি জুম্মার নামাজ পড়াচ্ছেন না। ব্যাখ্যা শুনে ক্যাপ্টেন বাসেতের মুখ কঠিন হয়ে গেল।
আপনি বলতে চাচ্ছেন পরাধীন দেশে জুম্মার নামাজের প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ আপনি বলতে চাচ্ছেন পূর্বপাকিস্তান পরাধীন?
জি জনাব।
আপনি কি বুঝতে পারছেন। আপনি কী বলছেন?
বুঝতে পারছি।
আপনার এই কথার জন্যে আপনাকে কী শাস্তি দেয়া হবে তা কি জানেন?
জি-না জনাব।
দেশের যে শত্রু তার শাস্তি একটাই। আপনি মুক্তিদের একজন। আপনি মুক্তির হয়ে কাজ করছেন।
আমি যা করেছি নিজের বিচার ও বিবেকে কাজ করেছি।
আপনি চান না পাকিস্তান থাকুক? আপনি হিন্দুস্তানের পা-চাটা কুকুর হতে চান?
জনাব, আমি নিজেকে খাঁটি মুসলমান মনে করি। একজন খাঁটি মুসলমানের দায়িত্ব জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।
ক্যাপ্টেন বাসেত হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে নতুন সিগারেট ধরালেন। কঠিন গলায় বললেন, মাওলানা সাহেব, আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
ইরতাজউদ্দিন চুপ করে রইলেন। ক্যাপ্টেন বাসেত ঠাণ্ডা কফির কাপে চুমুক দিয়ে মুখ বিকৃত করে বললেন, খারাপ মাথা ঠিক করার কৌশল আমি জানি। এমনভাবে মাথা ঠিক করব যে বাকি জীবন আপনি তসবি টানবেন আর বলবেন, পাকিস্তান পাকিস্তান।
ইরতাজউদ্দিন ছোট্ট কবে নিঃশ্বাস ফেললেন।
মাওলানা, চুপ করে থাকবেন না, কথা বলেন।
ইরতাজউদ্দিন বললেন, জনাব, আমার যা বলার ছিল আমি বলে ফেলেছি।
আর কিছু বলার নাই?
জি-না।
আমি আপনাকে কী শাস্তি দেব জানেন? আপনাকে উলঙ্গ করে। সারা গ্রামে ঘুরানো হবে। আমি রসিকতা করছি না। আমি বিশ্বাসঘাতককে কঠিন শাস্তি দেই।
